নতুন সরকারের সামনে শিক্ষা খাত পুনর্গঠনের চ্যালেঞ্জ
নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রকাশ: ২২ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ১২:৪১ পিএম
শিক্ষায় শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনা, শিক্ষাক্রম যুগোপযোগী করা এবং তার কার্যকর বাস্তবায়ন নিশ্চিত করাই নতুন সরকারের প্রধান অগ্রাধিকার হওয়া উচিত বলে মত দিয়েছেন শিক্ষাবিদেরা। তাঁদের মতে, দীর্ঘদিনের চিহ্নিত সংকটগুলো সমাধানে কার্যকর পদক্ষেপ নিলেই শিক্ষায় কাঙ্ক্ষিত গুণগত পরিবর্তন সম্ভব। বাস্তবে নতুন সরকারের কাঁধে এখন পুরো শিক্ষাব্যবস্থা পুনর্গঠনের বড় দায়িত্ব।
১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বড় জয় পেয়ে সরকার গঠন করেছে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)। দেড় বছর অন্তর্বর্তী সরকারের শাসনের পর নিয়মিত নির্বাচিত সরকার দায়িত্ব নেয়। শিক্ষা এবং প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পেয়েছেন আ ন ম এহসানুল হক মিলন। শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে পূর্ব অভিজ্ঞতা থাকা এ মন্ত্রী একসময় পরীক্ষায় নকলবিরোধী কঠোর পদক্ষেপের জন্য আলোচিত ছিলেন। ফলে শিক্ষাবিদদের প্রত্যাশা, এবার শিক্ষা খাতে দৃশ্যমান ইতিবাচক পরিবর্তন আসবে।
ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর অন্তর্বর্তী সরকার নতুন শিক্ষাক্রম বাতিল করে ২০১২ সালের শিক্ষাক্রমে ফিরে যায়। তবে শিক্ষাবিদদের মতে, সেই শিক্ষাক্রমও পুরোপুরি সময়োপযোগী নয়। গত দেড় বছরে শিক্ষা খাতে শৃঙ্খলার ঘাটতি স্পষ্ট হয়েছে। এইচএসসি ও সমমানের স্থগিত পরীক্ষা বাতিল এবং ‘ভিন্ন পদ্ধতিতে’ ফল প্রকাশের সিদ্ধান্ত শিক্ষাব্যবস্থার স্থিতিশীলতা নিয়ে প্রশ্ন তোলে। ঢাকার সাতটি বড় সরকারি কলেজ একীভূতকরণ প্রক্রিয়া নিয়েও দীর্ঘদিন অস্থিরতা ছিল।
টানা দুই শিক্ষাবর্ষে বছরের শুরুতে সব শিক্ষার্থীর হাতে বিনা মূল্যের পাঠ্যবই পৌঁছায়নি। বাজেট ঘাটতি, শিক্ষক সংকট, উচ্চ ঝরে পড়ার হার, কারিগরি শিক্ষার দুরবস্থা এবং উচ্চশিক্ষায় মানগত সমস্যা পুরোনো সংকট হিসেবেই রয়ে গেছে।
শিক্ষা নিয়ে নতুন সরকারের কাছে প্রত্যাশা প্রসঙ্গে সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা ও শিক্ষাবিদ রাশেদা কে চৌধূরী বলেন, শিক্ষাক্ষেত্রে চলমান অস্থিরতা দূর করে শিক্ষার্থী ও শিক্ষকদের শ্রেণিকক্ষে ফিরিয়ে এনে শৃঙ্খলা পুনঃপ্রতিষ্ঠা করাই এখন প্রধান দায়িত্ব। তিনি শিক্ষায় বরাদ্দ বাড়ানোর ওপর জোর দিয়ে বলেন, দুর্নীতি রোধ করা গেলে জিডিপির উল্লেখযোগ্য অংশ শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতে বিনিয়োগ করা সম্ভব।
তরুণদের বেকারত্ব কমাতে কর্মসংস্থানমুখী ও কারিগরি শিক্ষায় গুরুত্ব দেওয়ার তাগিদ দেন তিনি। তাঁর মতে, দক্ষতাভিত্তিক শিক্ষার বিকল্প নেই।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়-এর শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক এস এম হাফিজুর রহমান মনে করেন, বিদ্যমান শিক্ষানীতি ও শিক্ষাক্রম অনেকাংশে পুরোনো হয়ে গেছে। শিক্ষা কমিশন গঠন করে সামগ্রিক পর্যালোচনার মাধ্যমে যুগোপযোগী সংস্কার আনা জরুরি। তিনি শিক্ষায় সুশাসন প্রতিষ্ঠা, প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা পুনরুদ্ধার এবং অনিয়ম-দুর্নীতি রোধের ওপর জোর দেন।
ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়-এর ইমেরিটাস অধ্যাপক মনজুর আহমেদ বলেন, শিক্ষা খাতে সমন্বিত খাত পরিকল্পনার অভাব রয়েছে। আগামী পাঁচ বছরে শিক্ষা খাতকে কোথায় নেওয়া হবে, তার সুস্পষ্ট রূপরেখা প্রয়োজন। মাধ্যমিক শিক্ষা সর্বজনীন করা, শিক্ষকদের দক্ষতা বৃদ্ধি এবং কাজের পরিবেশ উন্নয়নে মধ্যমেয়াদি ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা নেওয়ার তাগিদ দেন তিনি। তাঁর মতে, নতুন শিক্ষাক্রম তৈরির চেয়ে বিদ্যমান শিক্ষাক্রম যুগোপযোগী করে কার্যকর বাস্তবায়নই বেশি জরুরি।
মন্ত্রী আ ন ম এহসানুল হক মিলন দায়িত্ব নেওয়ার পর শিক্ষার্থীদের শ্রেণিকক্ষে ফিরিয়ে আনা, জাতীয় কারিকুলাম পর্যালোচনা এবং কারিগরি শিক্ষার আধুনিকায়ন—এই তিন বিষয়কে অগ্রাধিকার ঘোষণা করেছেন। এক সংবাদ সম্মেলনে তিনি শিক্ষায় শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনতে কঠোর অবস্থানের কথা জানিয়ে বলেন, ‘মব সংস্কৃতি বা অটোপাসের মতো চর্চায় আর ফিরে যাবে না দেশ।’
এখন দেখার বিষয়, প্রতিশ্রুতি কত দ্রুত রূপ নেয় কার্যকর সংস্কারে। শিক্ষাবিদদের মতে, পরিকল্পিত, স্তরভিত্তিক ও সুশাসনভিত্তিক উদ্যোগ ছাড়া শিক্ষার বহুমুখী সংকট কাটানো সম্ভব নয়।



