নতুন শিক্ষাবর্ষে বই সংকট
এক মাস পেরোলেও আটকে আছে ৩০ লাখের বেশি পাঠ্যবই
নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রকাশ: ২৬ জানুয়ারি ২০২৬, ১১:২৩ এএম
নতুন শিক্ষাবর্ষ শুরু হওয়ার প্রায় এক মাস পার হলেও এখনো শিক্ষার্থীদের হাতে পৌঁছায়নি ৩০ লাখের বেশি পাঠ্যবই। পহেলা জানুয়ারির বই উৎসবের পর ১৫ জানুয়ারির মধ্যে শতভাগ বই বিতরণের যে প্রতিশ্রুতি জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ড (এনসিটিবি) দিয়েছিল, ২৫ জানুয়ারি পেরিয়ে গেলেও তা বাস্তবায়ন হয়নি। প্রাক-প্রাথমিক ও প্রাথমিক স্তরে বই বিতরণ শেষ হলেও মাধ্যমিক স্তরে, বিশেষ করে ষষ্ঠ থেকে অষ্টম শ্রেণিতে, সবচেয়ে বেশি ঘাটতি রয়ে গেছে।
এনসিটিবি সূত্র জানায়, বই ছাপা ও বিতরণ কার্যক্রম এখনো চলমান। এই পরিস্থিতিতে সময়মতো বই বিতরণে ব্যর্থতার দায় কার— সে প্রশ্ন উঠেছে। যদিও সংস্থাটির দাবি, চলতি মাসের মধ্যেই শতভাগ পাঠ্যবই শিক্ষার্থীদের হাতে পৌঁছে যাবে।
এনসিটিবির তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছর প্রাথমিক ও মাধ্যমিক মিলিয়ে ১০৫টি প্রেসের মাধ্যমে মোট ৩০ কোটি ২৩ লাখ ৬৫ হাজার ৬৫৩ কপি পাঠ্যবই ছাপার পরিকল্পনা ছিল। এর মধ্যে ২৯ কোটি ৯১ লাখ ১৮ হাজার ৩৫৪ কপি বইয়ের মুদ্রণ সম্পন্ন হয়েছে, যা ৯৯ দশমিক ৭৮ শতাংশ। তবে ২৪ জানুয়ারি রাত ৮টা পর্যন্ত উপজেলা পর্যায়ে পৌঁছেছে ২৯ কোটি ৭১ লাখ ৮০ হাজার ৮৫৯ কপি। ফলে এখনো বিতরণ বাকি রয়েছে ৩০ লাখ ৫৮ হাজার ৭৯৪ কপি বই, যা মোট নির্ধারিত বইয়ের ১ দশমিক ২ শতাংশ।
স্বস্তির বিষয় হলো, প্রাক-প্রাথমিক ও প্রাথমিক (সাধারণ) স্তরে বই বিতরণ পুরোপুরি শেষ হয়েছে। এনসিটিবির তথ্য বলছে, প্রাক-প্রাথমিক স্তরে নির্ধারিত ৮ কোটি ৫৯ লাখ ২৫ হাজার ৩৭৯ কপি এবং প্রাথমিক স্তরে ৩১ কোটি ১০ লাখ ৯ হাজার ৩৪৭ কপি বইয়ের মুদ্রণ, পিডিআই ও বিতরণ শতভাগ সম্পন্ন হয়েছে।
সংকট পুরোপুরি কেন্দ্রীভূত হয়েছে মাধ্যমিক স্তরে। ষষ্ঠ থেকে নবম শ্রেণি পর্যন্ত মোট নির্ধারিত ১৮ কোটি ৩২ লাখ ৪ হাজার ৯২৭ কপি বইয়ের মধ্যে মুদ্রণ প্রায় শেষ হলেও বিতরণ নেমে এসেছে ৯৮ দশমিক ৩৩ শতাংশে। ফলে এই স্তরেই আটকে আছে ৩০ লাখ ৫৮ হাজারের বেশি বই।
শ্রেণিভিত্তিক হিসাবে দেখা যায়, সপ্তম শ্রেণিতে ঘাটতি সবচেয়ে বেশি। এ শ্রেণিতে এখনো ১০ লাখ ৭৬ হাজার ৩২২ কপি বই বিতরণ হয়নি, যা মোটের ২ দশমিক ৫৩ শতাংশ। ষষ্ঠ শ্রেণিতে অবশিষ্ট রয়েছে ১ লাখ ১২ হাজার ৬৪৩ কপি, অষ্টম শ্রেণিতে ১ লাখ ৩৪ হাজার ৬৬৫ কপি এবং নবম শ্রেণিতে ২ লাখ ৫৮ হাজার ৪৪৯ কপি বই।
সংশ্লিষ্টরা জানান, চলতি বছর পাঠ্যবই ছাপার কাজ রিটেন্ডারের মধ্যে পড়ায় আগেভাগে প্রস্তুতি নেওয়া হলেও নির্ধারিত সময়ের মধ্যে কাজ শেষ করা সম্ভব হয়নি। দরপত্র প্রক্রিয়া পুনরায় শুরু হওয়ায় প্রেস নির্বাচন, কাগজ সংগ্রহ, মুদ্রণ সূচি ও সরবরাহ ব্যবস্থাপনায় বিলম্ব হয়। এর প্রভাব পড়ে উপজেলা পর্যায়ের বিতরণ ব্যবস্থায়।
এদিকে রিটেন্ডার ঘিরে অনিয়ম ও সিন্ডিকেটের অভিযোগও রয়েছে। অভিযোগ ওঠার পর সরকারি ক্রয়সংক্রান্ত পারচেজ কমিটি ষষ্ঠ থেকে অষ্টম শ্রেণির পাঠ্যবই ছাপার ৬০৩ কোটি টাকার দরপত্র বাতিল করে দেয়। এতে কার্যাদেশ পেতে দেরি হওয়ায় অনেক প্রেস সময়মতো পূর্ণ সক্ষমতায় কাজ শুরু করতে পারেনি।
এনসিটিবির বিতরণ নিয়ন্ত্রক মোহাম্মদ মতিউর রহমান খান পাঠান বলেন, মুদ্রণ প্রক্রিয়ায় ‘শর্ট বই’ একটি স্বাভাবিক সমস্যা। কাগজ নষ্ট হওয়া বা মুদ্রণ ত্রুটির কারণে কিছু ঘাটতি তৈরি হয়। সব মিলিয়ে এই কারণেই সামান্য এক শতাংশ বই নির্ধারিত সময়ের মধ্যে বিতরণ করা সম্ভব হয়নি। তিনি আশা প্রকাশ করেন, আগামী ২৮ জানুয়ারির মধ্যে শতভাগ বই বিতরণ সম্পন্ন হবে।
অন্যদিকে, এনসিটিবির চেয়ারম্যান (অতিরিক্ত দায়িত্ব) মো. মাহবুবুল হক পাটওয়ারী বলেন, প্রতিবছরের মতো এবারও পহেলা জানুয়ারিতে বই পৌঁছানোর লক্ষ্য ছিল। তবে বাস্তবতায় সব ক্ষেত্রে নির্ধারিত সময় ধরে রাখা যায়নি। ভবিষ্যতে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে বই বিতরণ নিশ্চিত করতে আরও বাস্তবসম্মত পরিকল্পনা, আগাম প্রস্তুতি ও সমন্বিত কাজের ওপর জোর দেন তিনি।



