এডিপি বাস্তবায়নে ধীরগতি: সরকারের ব্যাংক ঋণ কমছে
নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রকাশ: ০২ অক্টোবর ২০২৬, ০৯:৫৫ এএম
চলতি অর্থবছরের প্রথম দিকে সরকার ব্যাংক ব্যবস্থা থেকে দেদার ঋণ নিলেও এখন তা কমছে; সরকারের উন্নয়ন কাজের মন্থরগতিকেই এর কারণ হিসেবে দেখছেন বিশ্লেষকরা।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, অর্থবছরের প্রথম দুই মাস জুলাই-অগাস্টে সরকার বাণিজ্যিক ব্যাংক থেকে মোট ১৬ হাজার ৬০১ কোটি টাকা ঋণ নিয়েছে। একই সময়ে কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে আগে নেওয়া ৩ হাজার ৭২৮ কোটি টাকা পরিশোধ করা হয়েছে।
ফলে দুই মাসে ব্যাংক ব্যবস্থা থেকে সরকারের নিট ঋণ দাঁড়িয়েছে ১২ হাজার ৮৭২ কোটি টাকা। এর মধ্যে জুলাইয়ে নিট ঋণ ছিল ৭ হাজার ৪৬৯ কোটি টাকা। অগাস্টে তা কমে ৪ হাজার ৪০৩ কোটি টাকায় দাঁড়ায়।
অর্থাৎ, অর্থবছরের প্রথম মাসের তুলনায় দ্বিতীয় মাসে সরকারের নিট ব্যাংক ঋণ নেওয়ার পরিমাণ প্রায় ৪১ শতাংশ কমেছে।
অথচ অর্থবছরের প্রথম ১৩ দিনেই ব্যাংক ব্যবস্থা থেকে সরকার ৯ হাজার ২০৯ কোটি টাকা নিট ঋণ নিয়েছিল। এর মধ্যে বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে নেওয়া হয়েছিল ৫ হাজার ৪১৪ কোটি টাকা এবং বাণিজ্যিক ব্যাংক থেকে ৩ হাজার ৭৯৫ কোটি টাকা।
অর্থনীতির পরিভাষায়, সরকার কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে ঋণ নিয়ে অর্থনীতিতে নতুন টাকা বাড়ালে সামগ্রিক চাহিদা বাড়ে। তাতে মূল্যস্ফীতির ওপর চাপ তৈরি হয়। কারণ বাজারে টাকার পরিমাণ বাড়লেও পণ্য ও সেবার সরবরাহ একই থাকলে দাম বাড়ার প্রবণতা তৈরি হয়।
মূল্যস্ফীতি নিম্নমুখী হলেও এখনও ৮ শতাংশের উপরে অবস্থান করছে; যাকে উচ্চ মূল্যস্ফীতি বলা হয়। এরই মধ্যে এক লাফে সব ধরনের জ্বালানি তেলের দাম লিটারে ২০ টাকা বাড়ানো হয়েছে। এর ফলে পরিবহন খরচসহ সব ধরনের পণ্যের দাম বেড়ে গেছে। এছাড়া নতুন বেতন স্কেলে সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন-ভাতা বেড়ে দ্বিগুণ হয়েছে।
এ দুই কারণে মূল্যস্ফীতি আবার ঊর্ধ্বমুখী হতে পারে—এ আশঙ্কা থেকেই সরকার এখন বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে ঋণ না নিয়ে উল্টো পরিশোধ করছে বলে জানিয়েছেন কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কর্মকর্তারা।
বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র ও নির্বাহী পরিচালক আরিফ হোসেন খান বলেন, “প্রতিবারই অর্থবছরের শুরুতে সরকারের ব্যাংক ঋণ বাড়ে। রাজস্ব আদায় কম হয়। প্রয়োজনীয় খরচ মেটাতে বেশি ঋণ নিতে হয়। এবারও তাই হয়েছিল; এখন কিন্তু কমে আসছে। আবার বাড়তে পারে।”
তিনি বলেন, “উন্নত রাষ্ট্র গড়ার লক্ষ্যে সরকারকে বিভিন্ন উন্নয়ন কর্মকাণ্ড পরিচালনা করতে হয়। এ কারণে বাজেট ঘাটতি পূরণে ব্যাংকিং খাত কিংবা সাধারণ মানুষের কাছ থেকে ঋণ নেওয়া একটি স্বাভাবিক প্রক্রিয়া।”
তিনি বলেন, সরকারের চাহিদা অনুযায়ী ট্রেজারি বিল-বন্ডের মাধ্যমে সরকারকে ঋণের জোগান দেওয়া কেন্দ্রীয় ব্যাংকের দায়িত্ব।
“আমরা কেবল সে দায়িত্ব পালন করছি। এ ঋণ কীভাবে পরিশোধ হবে, সেটি সরকারকেই ভাবতে হবে। সরকার প্রত্যাশা অনুযায়ী রাজস্ব আদায় করতে না পারলে ঋণ নিয়ে দেশ চালাতে হবে, এটাই স্বাভাবিক।”
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, গত ৩১ অগাস্ট পর্যন্ত বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোতে সরকারের নেওয়া ঋণের স্থিতি ছিল ৬ লাখ ৮ হাজার ২৫ কোটি টাকা, যা গত জুনের শেষে ছিল ৫ লাখ ৯১ হাজার ৪২৪ কোটি টাকা।
অন্যদিকে অগাস্টে কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে সরকারের নেওয়া ঋণের স্থিতি কমে হয়েছে ৯০ হাজার ৩২২ কোটি টাকা, যা গত জুনে ছিল ৯৪ হাজার ৫১ কোটি টাকা।
পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের বাস্তবায়ন পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন বিভাগের (আইএমইডি) উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নের হালনাগাদ প্রতিবেদনে দেখা যায়, চলতি অর্থবছরের প্রথম দুই মাসে সরকারের বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচির (এডিপি) ২ শতাংশেরও কম বাস্তবায়ন হয়েছে।
এই দুই মাসে ৫ হাজার ৭০৯ কোটি ৭০ লাখ টাকা খরচ করেছে সরকারের বিভিন্ন মন্ত্রণালয় বিভাগ। যা মোট এডিপির মাত্র ১ দশমিক ৮৫ শতাংশ। বাংলাদেশের ইতিহাসে এর আগে কখনোই সরকারের উন্নয়ন কর্মকাণ্ডে শতাংশের হিসাবে দুই মাসে এত কম ব্যয় হয়নি।
চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরে সরকার ব্যাংক ব্যবস্থা থেকে মোট ১ লাখ ১২ হাজার কোটি টাকা ঋণ নেওয়ার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছে। সে হিসাবে অর্থবছরের প্রথম দুই মাসে পুরো অর্থবছরের লক্ষ্যমাত্রার ১১ দশমিক ৪৯ শতাংশ ঋণ নিয়ে ফেলেছে সরকার।
প্রতিবছর বাজেটে ঘাটতি মেটাতে ব্যাংক খাত থেকে ঋণ নেওয়ার লক্ষ্য ঘোষণা করে সরকার। গত ২০২৫-২৬ অর্থবছরে ব্যাংক খাত থেকে ১ লাখ ৪ হাজার কোটি টাকা ঋণ নেওয়ার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছিল। কিন্তু অর্থবছর শেষে সংশোধিত বাজেটে এ লক্ষ্য বাড়িয়ে ১ লাখ ১৮ হাজার কোটি টাকা করা হয়।
তবে শেষ পর্যন্ত তার চেয়েও বেশি ১ লাখ ৩১ হাজার ৭১২ কোটি ৭০ লাখ টাকা ঋণ নিয়েছে সরকার।
এর আগের ২০২৪-২৫ অর্থবছরে লক্ষ্যমাত্রা ছিল ১ লাখ ১৭ হাজার কোটি টাকা, বিপরীতে সরকার ঋণ নেয় ১ লাখ ১৯ হাজার ৩৬৫ কোটি টাকা।
প্রতি মাসে সরকার কী পরিমাণ রাজস্ব আহরণ করছে, সে তথ্য প্রকাশ করে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর)। প্রতি মাসের প্রথম সপ্তাহে বা মাঝামাঝি সময়ে এই তথ্য প্রকাশ করা হত। কিন্তু চলতি অর্থবছরের তিন মাস পার হয়ে গেলেও (জুলাই-সেপ্টেম্বর) এখন পর্যন্ত এক মাসের তথ্যও প্রকাশ করা হয়নি।
এনবিআরের কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, কাঙ্ক্ষিত রাজস্ব আদায় না হওয়ায় তথ্য প্রকাশ করা হচ্ছে না।
বিশ্ব ব্যাংকের ঢাকা অফিসের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ জাহিদ হোসেন বলেন, “এটা ভালো যে, সরকার কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে ঋণ না নিয়ে উল্টো পরিশোধ করছে। এতে মূল্যস্ফীতিতে হয়ত চাপ কমবে। কিন্তু জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধি ও সরকারের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতনভাতা বাড়ানোর কারণে কিন্তু সরকারের খরচ বাড়বে; মূল্যস্ফীতিও বাড়বে। রাজস্ব আদায় বাড়ানোর তেমন পদক্ষেপ নেই। ফলে সামনে সরকারের ব্যয় আরও বাড়বে, ঋণও বাড়বে।”
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) সবশেষ তথ্যে দেখা যায়, অগাস্টে পয়েন্ট টু পয়েন্ট ভিত্তিতে (মাসভিত্তিক বা মাসওয়ারি) দেশে সার্বিক মূল্যস্ফীতি হয়েছে ৮ দশমিক ২৬ শতাংশ; আগের মাস জুলাইয়ে হয়েছিল ৮ দশমিক ৩২ শতাংশ।
বুধবার অক্টোবর-ডিসেম্বর সময়ের মুদ্রানীতি ঘোষণার সময় বাংলাদেশ ব্যাংকের ডেপুটি গভর্নর হাবিবুর রহমান বলেন, “অর্থনীতিতে একাধিক ঝুঁকি রয়েছে। জ্বালানি তেলের মূল্য বৃদ্ধির ফলে পরিবহন ও উৎপাদন ব্যয় বাড়তে পারে। সরকারি চাকুরেদের বেতন কাঠামোর বাস্তবায়নও মূল্যস্ফীতির ওপর চাপ সৃষ্টি করতে পারে।”
তিনি বলেন, “সাম্প্রতিককালে সামগ্রিক মূল্যস্ফীতির হ্রাস টেকসই মূল্যহ্রাসের পর্যাপ্ত প্রমাণ দেয় না। কেননা মূল্যস্ফীতি এখনও সরবরাহ ও ব্যয়ের চাপের কারণে ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় রয়েছে।
“বিশেষ করে বৈশ্বিক বাজারে জ্বালা মূল্য বৃদ্ধি, হরমুজ প্রণালির অচলাবস্থা, নিয়ন্ত্রিত জ্বালানি মূল্যের সাম্প্রতিক উর্ধ্বমুখী সমন্বয় এবং জাতীয় বেতন কাঠামো বাস্তবায়নের সম্ভাব্য প্রভাব এর অন্যতম কারণ। যথাযথ সময়ের আগে মুদ্রানীতি শিথিল করলে মূল্যস্ফীতির প্রত্যাশা বাড়তে পারে এবং মূল্যস্ফীতির লক্ষ্যমাত্রায় ফিরে আসা বিলম্বিত হতে পারে।”
সূত্র: বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম



