১১ লাখ তথ্য মুছে খেলাপি ঋণ আড়াল, এনআরবিসি ব্যাংকে ভয়াবহ জালিয়াতির তথ্য
নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রকাশ: ১৭ জুন ২০২৬, ১০:২২ এএম
অর্থ লুটপাটের তথ্য গোপন করতে এনআরবিসি (নন-রেসিডেনসিয়াল বাংলাদেশি কমার্শিয়াল) ব্যাংকে ভয়াবহ জালিয়াতির ঘটনা ঘটেছে। ব্যাংকটির কোর ব্যাংকিং সিস্টেম থেকে প্রায় ১১ লাখ গুরুত্বপূর্ণ তথ্য মুছে ফেলার প্রমাণ পেয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক নিযুক্ত ফরেনসিক অডিট টিম। এর মাধ্যমে প্রকৃত খেলাপি ঋণ, হাজার কোটি টাকার প্রভিশন ঘাটতি এবং শেয়ারবাজার সংশ্লিষ্ট বিতর্কিত বিনিয়োগের তথ্য আড়াল করার চেষ্টা করা হয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
ফরেনসিক অডিটে সাবেক চেয়ারম্যান এসএম পারভেজ তমাল, সাবেক নির্বাহী কমিটির চেয়ারম্যান আদনান ইমাম, সাবেক ব্যবস্থাপনা পরিচালক মুজিবুর রহমানসহ ব্যাংকের একাধিক সাবেক কর্মকর্তা ও পরিচালকের সংশ্লিষ্টতার তথ্য উঠে এসেছে। প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, ২০১৩ সাল থেকে ২০২৫ সালের মে পর্যন্ত বিভিন্ন সময়ে এসব অনিয়ম সংঘটিত হয়েছে। ফলে রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পরও ব্যাংকটিতে অনিয়ম অব্যাহত ছিল বলে ধারণা করা হচ্ছে।
ঘোষণার চেয়ে অনেক বেশি খেলাপি ঋণ
২০২৫ সালের জুন শেষে এনআরবিসি ব্যাংক নিজস্ব প্রতিবেদনে খেলাপি ঋণের হার ২৪ দশমিক ৩৩ শতাংশ দেখালেও ফরেনসিক অডিটে তা ৩৪ দশমিক ৮৩ শতাংশ পাওয়া গেছে। অর্থাৎ প্রকৃত খেলাপি ঋণ ঘোষিত হিসাবের তুলনায় ১০ দশমিক ৫ শতাংশ বেশি। বহু খেলাপি ঋণ হিসাবকে নিয়মিত বা ‘স্ট্যান্ডার্ড’ হিসেবে দেখানো হয়েছে বলেও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
একই সঙ্গে আকিজ সিমেন্ট, বাংলাদেশ বিল্ডিং সিস্টেমস, ইক্সোরা অ্যাপারেলস, ইনসাইড নিট কম্পোজিট ও স্টাইলিশ গার্মেন্টসসহ একাধিক প্রতিষ্ঠানের ঋণ অনুমোদন ও পুনঃতফসিলে গুরুতর অনিয়মের তথ্য পাওয়া গেছে।
প্রভিশন ঘাটতি ২ হাজার ৬০৩ কোটি টাকা
অডিটে দেখা গেছে, ২০২৫ সালের জুন পর্যন্ত ব্যাংকটির মোট প্রভিশন ঘাটতি দাঁড়িয়েছে ২ হাজার ৬০৩ কোটি টাকা। ৩ হাজার ৪৮৭টি ঋণ হিসাবের বিপরীতে কোনো প্রভিশনই রাখা হয়নি। এছাড়া ভুল তথ্য ও অতিরঞ্জিত জামানত মূল্য দেখিয়ে আরও শত শত কোটি টাকার দায় গোপন করা হয়েছে।
সিস্টেম থেকে মুছে ফেলা হয়েছে ১১ লাখ তথ্য
তথ্যপ্রযুক্তি খাতের অনুসন্ধানে দেখা গেছে, ২০২১ সালের জানুয়ারি থেকে ২০২৫ সালের মে পর্যন্ত ছয়জন ব্যবহারকারী ব্যাংকের কোর ব্যাংকিং সিস্টেম থেকে ১০ লাখ ৭০ হাজারের বেশি তথ্য মুছে ফেলেছেন। এসব তথ্যের মধ্যে ঋণ, গ্রাহক এবং ট্রেড ফাইন্যান্সসংক্রান্ত গুরুত্বপূর্ণ রেকর্ড ছিল। অডিটররা এসব তথ্য মুছে ফেলার কোনো অনুমোদিত নথি খুঁজে পাননি।
এছাড়া বাধ্যতামূলক ‘কেওয়াইসি’ নথি ছাড়া ১২ হাজার ১৮৭টি হিসাব খোলার তথ্যও পাওয়া গেছে। অডিটরদের ধারণা, অর্থ পাচার ও অনিয়মের তথ্য গোপনের উদ্দেশ্যেই এসব কাজ করা হয়েছে।
স্বার্থসংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানে শত কোটি টাকার ঋণ
ফরেনসিক অডিটে ব্যাংকের পরিচালকদের স্বার্থসংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানে নিয়মবহির্ভূত ঋণ বিতরণের তথ্যও উঠে এসেছে। এনআরবিসি ব্যাংক সিকিউরিটিজের স্পন্সর পরিচালক মো. শহিদুল আহসানের দুটি প্রতিষ্ঠানের কাছে মোট ২১৭ কোটি টাকার ঋণ বকেয়া রয়েছে। এসব ঋণ অনুমোদনের ক্ষেত্রে পর্যাপ্ত জামানত ও নিয়ন্ত্রক নির্দেশনা অনুসরণ করা হয়নি বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
শেয়ারবাজারে বিতর্কিত বিনিয়োগে বড় ক্ষতি
বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের চিহ্নিত শেয়ার কারসাজি সংশ্লিষ্ট কয়েকটি প্রতিষ্ঠানে ব্যাংকের বিনিয়োগের কারণে বড় ধরনের আর্থিক ক্ষতির তথ্য পাওয়া গেছে। ফরচুন সুজ ও সোনালী পেপারসহ কয়েকটি প্রতিষ্ঠানে বিনিয়োগের ফলে ব্যাংকের কোটি কোটি টাকার ক্ষতি হয়েছে এবং বিপুল পরিমাণ অতিরিক্ত প্রভিশন রাখতে হয়েছে।
ভূতুড়ে ঠিকাদার ও অনুমোদনহীন ব্যয়
অডিটে টিএসএন ট্রেড অ্যান্ড ইনফ্রাস্ট্রাকচারকে ‘ঘোস্ট ভেন্ডর’ বা ভূতুড়ে ঠিকাদার হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। ২০২১ থেকে ২০২৩ সালের মধ্যে প্রতিষ্ঠানটিকে ২৯ কোটি টাকার বেশি কাজ দেওয়া হলেও তারা নিজেরা কোনো কাজ করেনি। একইভাবে দরপত্র ছাড়াই বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের অনুকূলে কোটি কোটি টাকার কাজ ও পরামর্শ ফি প্রদানের তথ্যও পাওয়া গেছে।
ক্রেডিট কার্ড ও আইটি ব্যবস্থায় ব্যাপক দুর্বলতা
পরীক্ষা করা ৬৭টি ক্রেডিট কার্ড ফাইলের মধ্যে অধিকাংশ ক্ষেত্রেই আবেদনপত্র ও কেওয়াইসি নথি অনুপস্থিত পাওয়া গেছে। একজন কর্মকর্তার মাধ্যমে ৮৮৯টি ক্রেডিট কার্ড ইস্যুর তথ্যও উঠে এসেছে। এছাড়া তথ্যপ্রযুক্তি ব্যবস্থায় ৮৬টি ঝুঁকি শনাক্ত হয়েছে, যার মধ্যে ৪৯টিকেই উচ্চ ঝুঁকি হিসেবে চিহ্নিত করেছেন অডিটররা।
ব্যবস্থা নেওয়ার আশ্বাস
বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক ও মুখপাত্র আরিফ হোসেন খান বলেছেন, অডিটে চিহ্নিত অপরাধ ও অনিয়মের ধরন অনুযায়ী সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। অন্যদিকে এনআরবিসি ব্যাংকের বর্তমান চেয়ারম্যান মো. আলী হোসেন প্রধানিয়া জানিয়েছেন, অডিটে চিহ্নিত বিষয়গুলো বাংলাদেশ ব্যাংককে অবহিত করা হয়েছে এবং প্রশাসনিক ব্যবস্থা গ্রহণের প্রক্রিয়া চলছে।
অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক আবু আহমেদ বলেন, দেশের ব্যাংকিং খাতে সংঘটিত অনিয়ম ও লুটপাটের মাত্রা নজিরবিহীন। তার মতে, ব্যাংক, লিজিং, বিমা ও শেয়ারবাজারসহ পুরো আর্থিক খাতে জবাবদিহির অভাবের কারণে এ ধরনের পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে।



