চট্টগ্রামে খালাস হচ্ছে জাহাজ
সাড়ে ৬ হাজার কোটি টাকার ড্রেজিংয়ের পরও নাব্যতা সংকটে পায়রা বন্দর
চট্টগ্রাম প্রতিনিধি
প্রকাশ: ১৫ জানুয়ারি ২০২৬, ১২:১৯ পিএম
পটুয়াখালীর পায়রা বন্দরে সাড়ে ৬ হাজার কোটি টাকা ব্যয়ে ড্রেজিং করা হলেও নাব্যতা সংকট কাটেনি। ফলে বন্দরের জেটিতে বড় জাহাজ ভিড়তে না পেরে পায়রাগামী জাহাজগুলোকে চট্টগ্রাম সমুদ্রবন্দরে খালাস করতে হচ্ছে। এতে সময় ও ব্যয় উভয়ই বেড়েছে, পাশাপাশি কমছে সরকারের রাজস্ব আয়।
পায়রা বন্দর কর্তৃপক্ষ জানায়, পায়রা তাপবিদ্যুৎকেন্দ্র এবং আরপিসিএল-নরিনকো ইন্টারন্যাশনাল পাওয়ার লিমিটেড (আরএনপিএল) বিদ্যুৎকেন্দ্রের জন্য আমদানি করা কয়লাবাহী বড় মাদার ভেসেলগুলো বর্তমানে চট্টগ্রাম বন্দরের বহির্নোঙরে খালাস করা হচ্ছে। সেখান থেকে লাইটার জাহাজে করে কয়লা পায়রা বন্দরে পাঠানো হচ্ছে। এই প্রক্রিয়ায় পরিবহন ব্যয় যেমন বাড়ছে, তেমনি সময়ও লাগছে বেশি।
সূত্র জানায়, নাব্যতা সংকটের কারণে গত এক বছরে পায়রা বন্দরে বিদেশি মাদার ভেসেল ভেড়ার সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গেছে। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে (৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত) বন্দরে ভিড়েছে মাত্র ১৭টি বিদেশি জাহাজ, যা আগের বছরের তুলনায় অনেক কম। এর ফলে সরকারি রাজস্ব আয়েও বড় ধরনের ঘাটতি দেখা দিয়েছে। পরিস্থিতি মোকাবিলায় পায়রা বন্দর কর্তৃপক্ষ নাব্যতা সংকটের স্থায়ী সমাধানের জন্য পায়রা তাপবিদ্যুৎকেন্দ্র ও আরএনপিএলের কাছে বছরে ৭০০ কোটি টাকা লেভি আদায়ের প্রস্তাব দিয়েছে।
২০১৩ সালের ১৯ নভেম্বর পটুয়াখালীর কলাপাড়া উপজেলার ইটবাড়িয়া ইউনিয়নে পায়রা বন্দরের যাত্রা শুরু হয়। ২০১৬ সালের ১৩ আগস্ট থেকে বন্দরটির বাণিজ্যিক কার্যক্রম চালু হয়। বন্দর কর্তৃপক্ষের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত মোট ৫ হাজার ৩৩৮টি জাহাজ এখানে পণ্য খালাস করেছে, যার মধ্যে ৫৪৪টি ছিল বিদেশি জাহাজ। এসব কার্যক্রম থেকে সরকারের রাজস্ব আয় হয়েছে প্রায় ১ হাজার ৮৬১ কোটি ৮২ লাখ টাকা।
শুরুর দিকে বিদেশি জাহাজের সংখ্যা কম থাকলেও সময়ের সঙ্গে সঙ্গে বন্দরটির কার্যক্রম বাড়ে। ২০২২-২৩ অর্থবছরে ১১১টি এবং ২০২৩-২৪ অর্থবছরে ১২৩টি বিদেশি জাহাজ পায়রা বন্দরে ভেড়ে। তবে এরপর থেকে এই সংখ্যা কমতে থাকে। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে বিদেশি জাহাজ নোঙর করে ৮৫টি এবং ২০২৫-২৬ অর্থবছরে (৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত) তা নেমে আসে মাত্র ১৭টিতে। একই সময়ে পণ্য আমদানি কমেছে প্রায় ১২ লাখ ৭৭ হাজার টন এবং রাজস্ব আয় কমে দাঁড়িয়েছে প্রায় ৮ কোটি ৬০ লাখ টাকায়।
পায়রা বন্দর কর্তৃপক্ষ জানায়, বন্দরের প্রধান ব্যবহারকারীদের মধ্যে রয়েছে ১ হাজার ৩২০ মেগাওয়াট ক্ষমতাসম্পন্ন পায়রা তাপবিদ্যুৎকেন্দ্র এবং আরএনপিএল। এই দুটি বিদ্যুৎকেন্দ্রের দৈনিক প্রায় ১২ হাজার টন কয়লার প্রয়োজন হয় এবং বছরে মোট কয়লা আমদানির পরিমাণ প্রায় এক কোটি টন।
বন্দর কর্তৃপক্ষের মতে, এই সংকটের মূল কারণ ৫৫ কিলোমিটার দীর্ঘ রাবনাবাদ চ্যানেলের নাব্যতা দ্রুত কমে যাওয়া। ২০২১ সালে চ্যানেলের গভীরতা ১০ দশমিক ৫ মিটার পর্যন্ত বাড়াতে বেলজিয়ামের প্রতিষ্ঠান জ্যান ডে নুলকে দিয়ে ৬ হাজার ৫০০ কোটি টাকা ব্যয়ে মূল ড্রেজিং করা হয়। উদ্দেশ্য ছিল বড় জাহাজ সরাসরি বন্দরের জেটিতে ভেড়ানো। তবে ২০২৪ সালের এপ্রিলে খননকৃত চ্যানেল হস্তান্তরের মাত্র ছয় মাসের মধ্যেই পলিমাটি জমে গভীরতা আবার কমে যায়।
পায়রা বন্দরের সদস্য (হারবার অ্যান্ড মেরিন) কমডোর জামাল উদ্দিন চৌধুরী নাব্যতা সংকটের বিষয়টি স্বীকার করে বলেন, ড্রেজিংয়ের কাজ শেষ হওয়ার পর আবার পলি জমে গেছে। ফলে এখন বড় মাদার ভেসেল পায়রা বন্দরে ভিড়তে পারছে না। বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর জন্য আনা কয়লা চট্টগ্রাম বন্দরের বহির্নোঙরে খালাস করে লাইটারিংয়ের মাধ্যমে পায়রায় আনতে হচ্ছে।
তিনি আরও বলেন, এই সমস্যা সমাধানে প্রতিবছর রাবনাবাদ চ্যানেলে ক্যাপিটাল ও মেইনটেন্যান্স ড্রেজিং করতে হবে। এ লক্ষ্যে একটি প্রকল্প নেওয়া হয়েছে, যার আওতায় নিয়মিত খনন কার্যক্রম পরিচালনার জন্য দুটি ড্রেজার কেনা হবে। পাশাপাশি চ্যানেলের মেইনটেন্যান্স ড্রেজিংয়ের ব্যয় নির্বাহে দুই বিদ্যুৎকেন্দ্রের কাছ থেকে লেভি আদায়ের বিষয়টি আলোচনা পর্যায়ে রয়েছে।



