জুয়ায় হেরে ব্যাংকের টাকা ছিনতাইয়ের নাটক, গ্রেপ্তার ৬
নওগাঁ প্রতিনিধি
প্রকাশ: ১০ অক্টোবর ২০২৬, ১০:৩৭ এএম
নওগাঁর রানীনগরে ইসলামী ব্যাংকের এজেন্ট ব্যাংকিংয়ের ৩৪ লাখ টাকা ছিনতাইয়ের ঘটনায় ব্যাংকের তিন কর্মীর যোগসাজশের অভিযোগ উঠেছে। অনলাইন জুয়ায় ৭ থেকে ৮ লাখ টাকা হারানোর পর গ্রাহকদের টাকা আত্মসাৎ এবং ছিনতাইয়ের নাটক সাজানোর পরিকল্পনা করেন তারা। এ ঘটনায় ব্যাংকের দুই কর্মকর্তা ও এক অফিস সহায়কসহ ছয়জনকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ।
এ সময় তাদের কাছ থেকে ছিনতাই হওয়া ১ লাখ ৪২ হাজার টাকা, একটি মোটরসাইকেল ও সাতটি মুঠোফোন উদ্ধার করা হয়েছে।
শুক্রবার (৯ অক্টোবর) নওগাঁর পুলিশ সুপারের কার্যালয়ের সভাকক্ষে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে এসব তথ্য জানান পুলিশ সুপার মোহাম্মদ তারিকুল ইসলাম।
গ্রেপ্তার ব্যক্তিরা হলেন রানীনগর উপজেলার বিশিয়া গ্রামের আব্দুল জব্বারের ছেলে স্বপন (২৮) ও ওয়াজেদের ছেলে হাসান আলী (২৫), অলংকারদিঘি গ্রামের ইদ্রিস আলীর ছেলে সুজন (২৭), সিমলাদার গ্রামের আব্দুল ওহাবের ছেলে আবু তালেব (২২), অলংকারদিঘি গ্রামের আব্দুল মজিদের ছেলে রাসেল বাবু (২২) এবং মোটরসাইকেলের মালিক রাব্বি আলী।
পুলিশ সুপার জানান, গত ৬ অক্টোবর দুপুরে ইসলামী ব্যাংকের এজেন্ট ব্যাংকিংয়ের দুই কর্মী ক্যাশিয়ার নাজমুল ও অফিস সহায়ক রাসেল বাবু আদমদিঘী রেলগেট থেকে ৩৪ লাখ টাকা নিয়ে মোটরসাইকেলে করে আবাদপুকুর বাজার শাখার উদ্দেশে রওনা হন। বেলা ১টার দিকে রানীনগর থানার পারইল বাজার পার হয়ে বাংলালিংক টাওয়ারের সামনে পৌঁছালে পেছন থেকে একটি মোটরসাইকেলে আসা কয়েকজন তাদের পথরোধ করেন। পরে লোহার রড দিয়ে মারধর করে ৩৪ লাখ টাকা নিয়ে পালিয়ে যান তারা।
ঘটনার পরপরই জেলা গোয়েন্দা পুলিশের একাধিক দল তদন্তে নামে। তথ্যপ্রযুক্তি ও বিভিন্ন তথ্য-উপাত্ত বিশ্লেষণ করে ঘটনার প্রাথমিক সূত্র উদ্ঘাটন করা হয়। ওই দিন রাতেই অভিযান চালিয়ে ছিনতাইয়ে ব্যবহৃত নিবন্ধনহীন মোটরসাইকেলটি জব্দ এবং এর মালিক রাব্বি আলীকে গ্রেপ্তার করা হয়।
পুলিশ সুপার আরও জানান, ৭ অক্টোবর তার তত্ত্বাবধানে জেলা গোয়েন্দা পুলিশের একটি বিশেষ দল জয়পুরহাটের আক্কেলপুর ও দিনাজপুরে অভিযান চালায়। পরে দিনাজপুরের নবাবগঞ্জ থানা এলাকায় অভিযান চালিয়ে স্বপন ও হাসান আলীকে গ্রেপ্তার করা হয়। তাদের কাছ থেকে ছিনতাই হওয়া ১ লাখ ৪২ হাজার টাকা উদ্ধার করা হয়। তাদের দেয়া তথ্যের ভিত্তিতে ৮ অক্টোবর রানীনগরের বিভিন্ন স্থানে অভিযান চালিয়ে এজেন্ট ব্যাংকিংয়ের দুই কর্মকর্তা সুজন ও আবু তালেব এবং অফিস সহায়ক রাসেল বাবুকে গ্রেপ্তার করা হয়।
পুলিশ সুপার বলেন, প্রাথমিক তদন্ত ও জিজ্ঞাসাবাদে জানা গেছে, এজেন্ট ব্যাংকিংয়ের অফিস সহায়ক রাসেল বাবু, কর্মকর্তা সুজন ও আবু তালেব কয়েক মাস ধরে অনলাইন জুয়া খেলছিলেন। এতে তারা প্রায় ৭ থেকে ৮ লাখ টাকা হারান। পরে বিভিন্ন গ্রাহকের টাকা ব্যাংকে জমা না দিয়ে জুয়ায় ব্যবহার করেন এবং সেই টাকাও হারিয়ে ফেলেন।
এরপর তারা এজেন্ট ব্যাংকিংয়ের মালিক ফিরোজ হোসেনের টাকা ছিনতাইয়ের পরিকল্পনা করেন। এ কাজে স্বপন, হাসানসহ আরও কয়েকজনকে যুক্ত করা হয়। প্রায় এক মাস ধরে তারা এ পরিকল্পনা করেন বলে জানিয়েছে পুলিশ।
পুলিশ জানায়, ঘটনার দিন রাসেল বাবু ক্যাশিয়ার নাজমুলকে সঙ্গে নিয়ে টাকা আনতে যান। ফেরার পথে রাসেল বাবু ছিনতাইকারীদের কাছে তাদের অবস্থান জানাতে থাকেন। নির্ধারিত স্থানে পৌঁছানোর পর স্বপন, হাসানসহ পলাতক কয়েকজন তাদের পথরোধ করে মারধর করেন এবং টাকা নিয়ে পালিয়ে যান।
পুলিশ সুপার বলেন, ক্যাশিয়ার নাজমুল প্রকৃত ভুক্তভোগী। তাকে লোহার পাইপ দিয়ে মারধর করা হয়। অন্যদিকে, টাকা বহনকারী অফিস সহায়ক রাসেল বাবু ছিনতাইয়ের ঘটনায় নিজেকে ভুক্তভোগী হিসেবে উপস্থাপন করলেও তদন্তে তার যোগসাজশের তথ্য পাওয়া গেছে।
পুলিশের দাবি, ছিনতাই হওয়া ৩৪ লাখ টাকার মধ্যে এজেন্ট ব্যাংকিংয়ের ওই তিন কর্মীর ১০ লাখ টাকা পাওয়ার কথা ছিল। বাকি টাকা অন্য ছিনতাইকারীদের মধ্যে ভাগ করে নওয়ার পরিকল্পনা ছিল। এরই মধ্যে স্বপন ও হাসানকে প্রাথমিকভাবে দেড় লাখ টাকা দেয়া হয় এবং নওগাঁ ছেড়ে পালিয়ে যেতে বলা হয়। পরে তারা জয়পুরহাট হয়ে দিনাজপুরে পালিয়ে যান।
পুলিশ সুপার জানান, এ ঘটনায় সংশ্লিষ্ট সবার বিরুদ্ধে মামলা করা হয়েছে। তাদের আদালতের মাধ্যমে কারাগারে পাঠানো হবে।
সংবাদ সম্মেলনে অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মনিরুল ইসলাম, জিন্নাহ আল মামুন, জেলা গোয়েন্দা শাখার পরিদর্শক হাসিবুল্লাহ হাসিবসহ পুলিশের বিভিন্ন ইউনিটের কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।



