সমুদ্রে বিশ্ব ভ্রমনের স্বপ্নভঙ্গ নিউজিল্যান্ডের পরিবারের স্বদেশ ফেরা
কক্সবাজার প্রতিবেদক
প্রকাশ: ০৯ অক্টোবর ২০২৬, ০৭:৩০ পিএম
সমুদ্রপথে বিশ্ব ভ্রমনের স্বপ্ন নিয়ে নিউজিল্যান্ডের জন এডওয়ার্ড-এর পরিবারের ৪ সদস্য ২০২৪ সালে টুরিস্ট ভিসা নিয়ে এসেছিলেন বাংলাদেশে আসেন। নিজস্ব পরিকল্পনার অংশ হিসেবে তারা কক্সবাজারের উপকূলে বাঁকখালীর নদীর তীরে তৈরি করেছিলেন অভিজাত-সৌখিন নৌ-যান ‘আইল্যান্ড গার্ল’। আর সেই নৌ-যানে সমুদ্রপথে বিশ্ব ভ্রমণ করে দেশে ফেরার কথা ছিল তাদের।
কিন্তু না সেই স্বপ্ন পূরণ হয়নি। গত ২৫ আগস্ট কক্সবাজার শহরের বাঁকখালী নদীর মোহনা সংলগ্ন নাজিরারটেক এলাকাবর্তী সাগরে ‘আইল্যান্ড গার্ল’ নামের জোড়া বোট ডুবি যায়। ওই সময় নিউজিল্যান্ডের ওই পরিবারের ৩ জনকে জীবিত উদ্ধার করা হলেও কিশোর আলবার্ট নিখোঁজ ছিলো। যার মৃতদেহ উদ্ধার হয়েছে পরের দিন।
স্বপ্নভঙ্গের দেড় মাস পেরিয়ে নানা আইনী প্রক্রিয়া, পার্সপোর্ট-ভিসার মেয়াদ শেষ হওয়া জটিলতা দূর করে সেই পরিবারের ৩ সদস্য দেশে ফিরছে শুক্রবার মধ্যরাতেই আকাশ পথে। যে ৩ জন হলেন, জন এডওয়ার্ড, তাঁর স্ত্রী বেলা (৩৬) ও ছেলে রালফ (১৩)।
তবে বাঁকখালী নদীর তীরে পড়ে আছে সমুদ্রপথে বিশ্বভ্রমনের জন্য কোটি টাকা ব্যয়ে তৈরির পর বিধ্বস্ত হওয়া স্বপ্নের নৌ-যান ‘আইল্যান্ড গার্ল’। নদীর খুব নিকেটের একটি শ্মশানে রেখে যাচ্ছেন কিশোর সন্তান আলবার্ট (১৬) দেহাবশেষ।
গত ২৫ আগস্ট বোট ডুবির ঘটনার পর জীবিত ৩ জনই ছিলেন কক্সবাজার জেলা প্রশাসনের তত্ত্বাবধানে। দেড় মাস ধরে বাংলাদেশ পর্যটন করপোরেশনের মোটেল শৈবালে অবস্থান নিয়েছিলেন তারা। তাদের নিরাপত্তার জন্য সেখানে পুলিশও মোতায়েন করা ছিল।
কক্সবাজার জেলা প্রশাসনের পর্যটন সেলের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট মাহমুদুর রহমান জানান, পরিবারের তিন সদস্যের দেশে ফেরার প্রয়োজনীয় প্রক্রিয়া শেষ হয়েছে। সবকিছু ঠিক থাকলে শুক্রবার মধ্যরাতে তারা নিউজিল্যান্ডের উদ্দেশে রওনা হবেন।
তিনি জানান, নৌকাডুবির সময় পরিবারের সদস্যদের পাসপোর্টসহ প্রয়োজনীয় কিছু নথি হারিয়ে যায়। ফলে দেশে ফেরার ব্যবস্থা করাও সহজ ছিল না। বাংলাদেশে নিউজিল্যান্ডের কোনো দূতাবাস না থাকায় শ্রীলঙ্কায় অবস্থিত নিউজিল্যান্ডের দূতাবাসের সঙ্গে অনলাইন ও ভার্চ্যুয়াল যোগাযোগের মাধ্যমে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হয়।
নিউজিল্যান্ডের পরিবারটি সম্পর্কে যা জানা গেছে
সংশ্লিষ্টসূত্রে প্রাপ্ত তথ্য মতে, নিউজিল্যান্ডের নাগরিক জন এডওয়ার্ড তার পরিবারের ৪ সদস্যসহ বিশ্বভ্রমণের উদ্দেশ্যে ২০২৪ সালে টুরিস্ট ভিসায় বাংলাদেশে আসেন। নিজস্ব পরিকল্পনার অংশ হিসেবে তারা একটি কাঠের বোট বা ট্রলারের মাধ্যমে সমুদ্রপথে বিশ্বভ্রমণের উদ্যোগ নেয়।
এই উদ্যোগের অংশ হিসেবে নিউজিল্যান্ডের নাগরিক পরিবারটির চার সদস্য গত আড়াই বছর ধরে কক্সবাজারের উপকুলের কাছা-কাছি ছিলেন। আর কক্সবাজার শহরের এসএম পাড়া উপকুলে তৈরি করা হয়েছিল এই জোড়া বোটটি। যার নাম ‘আইল্যান্ড গার্ল’। এটি ছিল আধুনিক নকশার একটি নৌযান। এটি নির্মাণে এক কোটি টাকার বেশি ব্যয় হয়েছিল বলে ধারণা করা হচ্ছে।
কুতুবদিয়ার পাড়ার স্থাণীয় বিএনপি নেতা দিদারুল ইসলাম রুবেল জানান, নৌযানটিতে শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত কক্ষ, ফ্রিজ, রান্নাঘরসহ বিভিন্ন সুবিধা ছিল। ব্যক্তিগত অ্যাডভেঞ্চার ও সমুদ্র ভ্রমণের জন্য বিশেষভাবে তৈরি নৌযানটি নির্মাণে প্রায় দুই বছর সময় লেগেছিল বলে জানান রুবেল।
নিউজিল্যান্ডের ওই পরিবারের চার সদস্য এই নৌযানেই বসবাস করছিলেন। দীর্ঘদিন ধরে নৌযানটি কক্সবাজারের বাঁকখালী নদীতে, নুনিয়াছড়া বিআইডব্লিউটিএ জেটির বিপরীত পাশে নোঙর করে রাখা ছিল। যেটি ২৫ আগস্ট ডুবে ৩ জনকে উদ্ধার করা হয় এবং একজনের মরদেহ মিলেছে একদিন পর।
এর আগেও চলতি বছরের গত ৮ এপ্রিল রাতে কক্সবাজারের মহেশখালীর সোনাদিয়া চরে নিউজিল্যান্ডের এই পর্যটক পরিবারটি ডাকাতের কবলে পড়েছিলেন।
পরের দিনে বৃহস্পতিবার (৯ এপ্রিল) সন্ধ্যায় কোস্টগার্ড মিডিয়া কর্মকর্তা লেফটেন্যান্ট কমান্ডার সাব্বির আলম সুজনের পাঠানো এ বার্তায় এটি স্বীকার করা হয়েছিল।
ওইদিন বার্তায় বলা হয়েছিল, নিউজিল্যান্ডের নাগরিক জন এডওয়ার্ড তার পরিবারের ৪ সদস্যসহ বিশ্বভ্রমণের উদ্দেশ্যে ২০২৪ সালে টুরিস্ট ভিসায় বাংলাদেশে আসেন। নিজস্ব পরিকল্পনার অংশ হিসেবে তারা একটি কাঠের বোট বা ট্রলারের মাধ্যমে সমুদ্রপথে বিশ্বভ্রমণের উদ্যোগ নেয়। বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ ও বাংলাদেশ কোস্টগার্ড নিরাপত্তাজনিত ঝুঁকি পর্যালোচনা করে তাদের এই ধরনের সমুদ্রযাত্রা থেকে নিরুৎসাহিত করে এবং চলতি বছরের গত ১ মার্চ প্রয়োজনীয় নিরাপত্তা নির্দেশনা দেয়। ওই সময় তাদের পাসপোর্ট পর্যালোচনায় দেখা যায় যে, ১৬ জানুয়ারি ২০২৬ ওনাদের পাসপোর্টের মেয়াদ উত্তীর্ণ হয়েছে। তবে কর্তৃপক্ষের নির্দেশনা উপেক্ষা করে তারা কক্সবাজারের মহেশখালীর সোনাদিয়া চরে বোটসহ অবস্থান করছিলেন। এ অবস্থায় গত বুধবার রাতে একদল দুষ্কৃতিকারী তাদের ওপর অতর্কিত হামলা চালায়। খবর পেয়ে বাংলাদেশ কোস্টগার্ডের একাধিক আভিযানিক দল দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছে অভিযান চালায়। অভিযানকারিরা দক্ষতার সঙ্গে পর্যটকদের জীবিত উদ্ধার করে।
বাঁকখালী নদীর তীরে পড়ে আছে বিধ্বস্ত স্বপ্নের ‘আইল্যান্ড গার্ল’ আর নিকটের শ্মশানে এক কিশোর সন্তানের দেহাবশেষ
সমুদ্রে বিশ্ব ভ্রমনের স্বপ্নভঙ্গ নিউজিল্যান্ডের পরিবারের ৩ সদস্য অবশেষে আকাশপথে স্বদেশ ফিরে যাচ্ছেন। কিন্তু তার শেষ স্মৃতি হয়ে বাঁকখালী নদীতে পড়েছে বিধ্বস্ত ‘আইল্যান্ড গার্ল’।
নৌযানটির নির্মাণপদ্ধতি সম্পর্কে স্থানীয় জেলে আবদুর রহমান বলেন, দুটি কাঠের নৌযান জোড়া দিয়ে ‘আইল্যান্ড গার্ল’ তৈরি করা হয়েছিল। বড় ঢেউয়ের ধাক্কায় সংযোগস্থল বিচ্ছিন্ন হয়ে একটি অংশ দ্রুত ডুবে যায়। কয়েক মিনিটের মধ্যে অন্য অংশটিও তলিয়ে যায়। নুনিয়াছড়ার বিআইডব্লিউটিএ জেটির বিপরীতে বাঁকখালী নদীতে এখনো ডুবন্ত অবস্থায় পড়ে আছে ‘আইল্যান্ড গার্ল’।
আর তাদের এক সন্তানের দেহাবাশেষ রয়েছে নদী নিকেটের শ্মশানে।
কক্সবাজার সদর মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা শেখ মোহাম্মদ আলী জানান, ওই কিশোরের মরদেহ উদ্ধারের পর আইনগত প্রক্রিয়া ও ময়নাতদন্ত সম্পন্ন করা হয়। পরে পুলিশের উপস্থিতিতে কক্সবাজার বাঁকখালীর তীরের শ্মশানে আলবার্টের শেষকৃত্য সম্পন্ন হয়। এক্ষেত্রে নিউজিল্যান্ডের দূতাবাস ও পরিবারের অনুমতি নেওয়া হয়েছিল।



