রংপুর অঞ্চলে আগাম জাতের আমন ধান কাটা শুরু
রংপুর প্রতিনিধি
প্রকাশ: ০৬ অক্টোবর ২০২৬, ১২:১৬ পিএম
রংপুর অঞ্চলে আগাম জাতের আমন ধান কাটা শুরু হয়েছে। এই ধান কাটার পর কৃষকেরা জমিতে আগাম শীতকালীন ফসল চাষ করেন। কৃষকেরা জানান, সাধারন আমন ধান কাটার উৎসব শুরু হয় নভেম্বরের শুরুতে। একমাস আগে আগাম জাতের আমন ধান কাটা শুরু হয়।
বোরো ধান কাটার কিছু দিনের মধ্যেই জুন মাসের মাঝামাঝি সময়ে আগাম জাতের আমন ধান চাষ করা হয়।
এই জাতের ধান কাটার পর জমিতে আগাম জাতের শীতকালীন শাক-সবজি চাষ করা হয়। শীতকালীন সবজি ঘরে তোলার পর কৃষকেরা জমিতে আবার বোরো ধানের চাষ করেন।
কৃষকেরা জানান, আগাম জাতের আমন ধানের ফলন আগের মতোই রয়েছে। তবে গত বছরের তুলনায় এ বছর বিঘাপ্রতি ১ হাজার ৮০০ থেকে ২ হাজার টাকা উৎপাদন খরচ বেড়েছে। সার, ডিজেল ও কীটনাশকের দাম বৃদ্ধি এবং শ্রমিক খরচ বেড়ে যাওয়ায় উৎপাদন খরচ বেড়েছে।
রংপুরের পাগলাপীর এলাকার কৃষক সুরেশ চন্দ্র বর্মণ (৬৫) জানান, সাধারণ উঁচু জমিতে আগাম জাতের আমন চাষ করা হয়। এসব জমিতে কখনই পানি জমে থাকে না। তিনি ৫ বিঘা জমিতে আমনচাষ করেছেন। তিন বিঘা জমি থেকে ধান পেয়েছেন ৪৯ মণ। অবশিষ্ঠ দুই বিঘা জমির ধান এক সপ্তাহ পরে কাটা হবে।
তিনি জানান, আগাম জাতের আমন ধানের ফলন বিঘা প্রতি ২-৩ মণ কম হয়। প্রতি বিঘা জমিতে ধানের উৎপাদন হয় ১৬ থেকে ১৮ মণ। এ বছর প্রতি বিঘা জমিতে ধানের উৎপাদন খরচ হয়েছে ১৪ হাজার টাকা। কিন্তু আগের বছর খরচ হয়েছিল ১২ হাজার টাকা।
‘আগাম জাতের আমন ধান কাটার পর আমি জমিতে আগাম জাতের শীতকালীন সবজি ফুলকপি, গাজর, বেগুন ও ধনেপাতা চাষের প্রস্তুতি নিচ্ছি। শীতকালীন সবজি তোলার পর খেতে বোরো ধানের চাষ করব,’ তিনি বলেন।
লালমনিরহাট সদর উপজেলার কুলাঘাট গ্রামের কৃষক আদিলুর রহমান (৫৫) জানান, আগাম জাতের আমন ধানের ফলন কিছুটা কম হলেও ধান কাটার পর তারা জমিতে আগাম জাতের শীতকালীন শাক-সবজি চাষ করতে পারেন। এতে তারা লাভবান হন। তিনি ৬ বিঘা জমিতে আগাম আমন ধানের চাষ করে ফলন পেয়েছেন ১০১ মণ।
তিনি জানান, বছর ৬ বিঘা জমিতে আগাম ধানচাষ করতে খরচ করেছেন ৮৭ হাজার টাকা। তবে গেল বছর একই জমিতে খরচ করেছিলেন ৭১ হাজার টাকা।
‘আমাদের এলাকায় অক্টোবরের দ্বিতীয় সপ্তাহ পযর্ন্ত আগাম জাতের আমন ধান কাটা চলে। এবার ধানের ফলন ভালো হয়েছে। তবে উৎপাদন খরচ বেড়ে যাওয়ায় কিছুটা হতাশা আছে,’ বলেন তিনি।
কুড়িগ্রামের ফুলবাড়ী উপজেলার নাওডাঙ্গা গ্রামের কৃষক দেলোয়ার হোসেন (৬০) বলেন, তাদের এলাকায় এক সপ্তাহ আগে থেকে আগাম জাতের আমন কাটা শুরু হয়েছে। অনেক কৃষকই ধান কাটা পর জমিতে আগাম জাতের শীতকালীন ফসল চাষ করেছেন।
‘এবছর আগাম জাতের আমন ধানে তেমন রোগবালাই দেখা দেয়নি। ফলন পেয়েছি আশানুরূপ। উৎপাদন খরচ বেড়ে যাওয়ায় আমন ধান চাষে লাভের অঙ্ক কমেছে। আমি ৪ বিঘা জমি থেকে ৬৯ মণ ধান পেয়েছি। এখন জমিতে আগাম জাতের ফুলকপি লাগাচ্ছি,’ তিনি বলেন।
কুড়িগ্রাম সদর উপজেলার ব্রহ্মপুত্রের বুকে চর যাত্রাপুরের কৃষক রইছ আলী মণ্ডল (৬০) বলেন, ‘এ বছর ব্রহ্মপুত্রপাড়ে কোনো বন্যা হয়নি। তাই আগাম জাতের আমনের ক্ষতি হয়নি। আমরা সাধারণত আগাম জাতের ধান লাগাই, যাতে ধান কাটার পর শীতকালীন ফসল আগাম চাষ করতে পারি। আমার চার বিঘা জমির ধান পেকে গেছে। দুই-তিন দিনের মধ্যে কাটা শুরু করব।’
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, চলতি বছর রংপুর অঞ্চলের ৫ জেলা কুড়িগ্রাম, লালমনিরহাট, রংপুর, গাইবান্ধা ও নীলফামারীতে আমন ধানের চাষ হয়েছে ৬ লাখ ২১ হাজার ৫৫০ হেক্টর জমিতে। উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ২০ লাখ ১ হাজার ৩৯১ টন চাল। আগাম জাতের আমন ধান চাষ হয়েছে ৩৩ হাজার হেক্টর জমিতে।
রংপুর আঞ্চলিক কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের অতিরিক্ত পরিচালক আবু বকর সাইফুল ইসলাম বলেন, ‘উঁচু জমিতে লাগানো আগাম জাতের আমন ধান কাটা শুরু হয়েছে। অক্টোবরের মাঝামাঝি পযর্ন্ত আগাম জাতের আমন কাটা চলে। তবে নভেম্বরের শুরুতেই শুরু হবে মৌসুমের আমন ধান কাটা। এ বছর বন্যার প্রভাব কম থাকায় আগাম জাতের আমনের উৎপাদন আশানুরূপ হয়েছে।’
তিনি আরও বলেন, ‘কৃষকেরা আগাম জাতের আমন ধান কাটার পর তারা ভুট্টা, আলুসহ নানা ধরনের শীতকালীন সবজি চাষ করেন।’



