রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে অস্তিত্ব সংকটে ঐতিহ্যবাহী রাজবাড়ী
ঈশ্বরগঞ্জ (ময়মনসিংহ) প্রতিনিধি
প্রকাশ: ৩০ আগস্ট ২০২৬, ১১:০২ পিএম
রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে অস্তিত্ব সংকটে ঐতিহ্যবাহী রাজবাড়ী
প্রায় আড়াইশ বছরের পুরনো ঐতিহ্যের সাক্ষী ময়মনসিংহের ঈশ্বরগঞ্জ উপজেলার আঠারবাড়ী জমিদার বাড়ি। উপজেলা সদর থেকে প্রায় ১৫ কিলোমিটার পূর্বে অবস্থিত এই রাজবাড়ী একসময় ছিল জাঁকজমক ও ঐশ্বর্যের প্রতীক। কিন্তু আজ তা চরম অবহেলা ও পরিচর্যার অভাবে ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে উপনীত হয়েছে।
ইতিহাস থেকে জানা যায়, ১৭৯৩ খ্রিষ্টাব্দ পর্যন্ত হোসেন শাহী পরগনা রাজশাহী কালেক্টরের অধীনে ছিল। পরবর্তীতে ১৮২২ খ্রিষ্টাব্দে এক নিলামে ৪ জন ব্যক্তি এই জমিদারি ক্রয় করেন। তাদের মধ্যে "বিবি এজিনা"র অংশটি ক্রয় করেন আঠারবাড়ীর জমিদার শম্ভুরায় চৌধুরী। এরপর অন্য অংশীদারদের জমিদারিও কিনে নেন শম্ভুরায় চৌধুরীর পুত্র মহিম চন্দ্র রায়। এই মহিম চন্দ্র রায়ের নামেই পরবর্তীতে ঐতিহাসিক আঠারবাড়ী মহিম চন্দ্র উচ্চ বিদ্যালয় (এম.সি উচ্চ বিদ্যালয়) প্রতিষ্ঠিত হয়।
অনুসন্ধানে জানা যায়, শম্ভুরায় চৌধুরীর পিতা দীপরায় চৌধুরী ছিলেন যশোর জেলার একটি পরগনার জমিদার। পরবর্তীতে তিনি পুত্র শম্ভুরায়কে নিয়ে আঠারবাড়ীতে চলে আসেন এবং পুত্রের নামে জমিদারি ক্রয় করেন। পূর্বে এই জমিদার বাড়ির নাম ছিল শিবগঞ্জ বা গোবিন্দ বাজার। দীপরায় চৌধুরী জমিদারি দেখাশোনার সুবিধার্থে যশোর থেকে ১৮টি হিন্দু পরিবারকে এখানে নিয়ে আসেন এবং তাদের বসবাসের জন্য রাজবাড়ী নির্মাণ করে দেন। সেই থেকেই স্থানটির নামকরণ হয় "আঠারবাড়ী" অর্থাৎ আঠারোটি পরিবারের ঘর।
এই জমিদার বাড়ির রয়েছে এক গৌরবোজ্জ্বল ইতিহাস। তৎকালীন জমিদার প্রমোদ চন্দ্র রায় চৌধুরীর আমন্ত্রণে ১৯২৬ সালের ১৯ ফেব্রুয়ারি এই জমিদার বাড়িতে এসেছিলেন বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। এছাড়া এই জমিদার বাড়িকে ঘিরেই ১৯৬৮ সালে প্রতিষ্ঠিত হয় আঠারবাড়ী ডিগ্রি কলেজ। দৃষ্টিনন্দন এই ঐতিহ্যবাহী জমিদার বাড়ির চারপাশে একসময় ছিল সবুজে ঘেরা প্রকৃতি, অন্দরমহল, টিনের গম্বুজ, সারি সারি গাছ এবং রানীর পুকুর। কিন্তু আজ সবই কেবলই স্মৃতি।
আজ রবিবার (৩০ আগস্ট) সরেজমিনে জমিদার বাড়িটি পরিদর্শন করে দেখা যায় এক বুক ফাটানো করুণ চিত্র। ঐতিহ্যবাহী এই রাজবাড়ীর প্রতিটি দেয়াল আজ পরিত্যক্ত। পরিচর্যা ও সংস্কারের অভাবে কংক্রিটের প্রাচীন প্রাচীরগুলো ধসে পড়ছে। চারপাশ ছেয়ে গেছে বড় বড় ঝোপঝাড়ে। একসময়ের রাজকীয় অন্দরমহল ও রাজবাড়ীর ভেতরে এখন রাজত্ব করছে শেয়াল-কুকুর। আড়াইশ বছরের এই অমূল্য প্রতœতাত্ত্বিক নিদর্শনটি চোখের সামনে কালের গর্ভে হারিয়ে যাচ্ছে।
স্থানীয় বাসিন্দারা গভীর ক্ষোভ ও উদ্বেগ প্রকাশ করে জানান, আঠারবাড়ী জমিদার বাড়িটি আমাদের এলাকার একটি ঐতিহাসিক গৌরব। কিন্তু এটি যেভাবে ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে তা মেনে নেওয়া যায় না। অবিলম্বে সরকারি উদ্যোগে এই ঐতিহাসিক নিদর্শনটি দ্রুত সংস্কার ও সংরক্ষণের ব্যবস্থা না করলে, আড়াইশ বছরের এই ঐতিহ্য একদিন মানচিত্র থেকে সম্পূর্ণভাবে বিলীন হয়ে যাবে।



