জমি নিয়ে বিরোধে হিন্দু পরিবারের ঘর ভাঙচুর, প্রশাসনের দ্বারস্থ ভুক্তভোগী
কিশোরগঞ্জ প্রতিনিধি
প্রকাশ: ২৯ আগস্ট ২০২৬, ১০:৪৫ পিএম
কিশোরগঞ্জের কটিয়াদীতে পৈতৃক সম্পত্তি নিয়ে বিরোধের জেরে হিন্দু সম্প্রদায়ের এক পরিবারের বাড়িঘরে হামলা, ভাঙচুর ও প্রাণনাশের হুমকি দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে স্থানীয় কয়েকজনের বিরুদ্ধে।
এ ঘটনায় প্রশাসনের দপ্তর ও থানায় লিখিত অভিযোগ করেছেন ভুক্তভোগী বিশম্ভর চন্দ্র বর্মন (৬৪)। বিশম্ভর চন্দ্র বর্মন উপজেলার মুমুরদিয়া ইউনিয়নের জোয়ারিয়া গ্রামের মৃত কৃষ্ণ চন্দ্র বর্মনের ছেলে। তিনি কিশোরগঞ্জ জেলা পুলিশ সুপার, উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) ও কটিয়াদী মডেল থানায় তিনজনের নাম উল্লেখ করে অজ্ঞাতনামা আরও ৬-৭ জনের বিরুদ্ধে অভিযোগ দিয়েছেন।
অভিযুক্তরা হলেন—মুমুরদিয়া ইউনিয়নের কুড়িখাই গ্রামের মৃত হাজী কালাচান শাহের ছেলে শাহ ওমর ফারুক ভান্ডারী (৪৩), তাড়াইল উপজেলার দামিহা ইউনিয়নের দামিহা গ্রামের মৃত সুনীল চন্দ্র বর্মনের ছেলে জীবন চন্দ্র বর্মন (৩৮) ও তাঁর স্ত্রী গীতা রানী বর্মন (৫৫)।
উপজেলার মুমুরদিয়া ইউনিয়নের জোয়ারিয়া গ্রামে সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, ভুক্তভোগী পরিবারের একটি স্থাপনা ভাঙচুর করা অবস্থায় পড়ে আছে। ঘরের ভাঙা ইট, কাঠ ও নির্মাণসামগ্রী ছড়িয়ে-ছিটিয়ে রয়েছে। কোথাও দেয়ালের অংশ ভেঙে পড়েছে, আবার কোথাও টিনের বেড়া ও কাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত অবস্থায় দেখা গেছে। স্থাপনাটির বিভিন্ন অংশে ভাঙচুরের চিহ্নও স্পষ্ট।
লিখিত অভিযোগ সূত্রে জানা যায়, জোয়ারিয়া মৌজার একটি দাগে ক্রয়সূত্রে নামজারি করা জমি দীর্ঘদিন ধরে ভোগদখল করে আসছেন বিশম্ভর চন্দ্র বর্মন। ২০২০ সালের ১৯ জানুয়ারি তিনি ওই জমিতে পাকা ভিটা ও সিমেন্টের খুঁটি স্থাপন করে টিনের ঘর নির্মাণের কাজ শুরু করেন।
বিশম্ভরের অভিযোগ, ঘর নির্মাণের সময় শাহ ওমর ফারুক ভান্ডারীসহ কয়েকজন সেখানে গিয়ে নির্মাণকাজে বাধা দেন। এ সময় তাঁকে অশালীন ও সাম্প্রদায়িক গালিগালাজ করা হয়। জমির বৈধ কাগজপত্র দেখানোর কথা বললে শাহ ওমর ফারুক তাঁকে গলা টিপে হত্যার চেষ্টা করেন বলেও অভিযোগ করেন তিনি। তার চিৎকার শুনে ছেলে ও ছেলের স্ত্রী এগিয়ে এলে তাঁদেরও মারধর ও শ্লীলতাহানির চেষ্টা করা হয় বলে অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে।
পরে অভিযুক্তরা ওই জমি নিজেদের দাবি করে দ্বিতীয় ও তৃতীয় অভিযুক্তের অনুকূলে দানপত্র দলিল করে দেওয়ার কথা বলেন এবং বিশম্ভর ও তাঁর পরিবারের সদস্যদের ভয়ভীতি দেখান। প্রতিবাদ করলে প্রাণনাশের হুমকি দেওয়া হয় বলেও অভিযোগ করেন তিনি।
বিশম্ভরের দাবি, এসব হুমকির কারণে দীর্ঘদিন তিনি আইনগত ব্যবস্থা নিতে সাহস পাননি। প্রথম দফায় ঘর নির্মাণের সময় প্রায় চার লাখ টাকার ক্ষতি হয় বলেও অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে।
অভিযোগে আরও বলা হয়, গত ৬ আগস্ট আগের ঘটনার জের ধরে অভিযুক্তরা সংঘবদ্ধ হয়ে লাঠি, হাতুড়িসহ বিভিন্ন দেশীয় অস্ত্র নিয়ে ওই জমিতে প্রবেশ করেন। পরে নির্মাণাধীন আধাপাকা ঘরের টিনের চাল, বেড়া ও পাকা ভিটার বিভিন্ন অংশ হাতুড়ি দিয়ে পিটিয়ে ভেঙে ফেলা হয়। এতে আরও প্রায় চার লাখ টাকার ক্ষতি হয়েছে বলে দাবি করেছেন বিশম্ভর।
বর্তমানে অভিযুক্তরা তার ভোগদখলে থাকা জমি জোরপূর্বক দখল করে সেখানে ঘরবাড়ি নির্মাণের চেষ্টা করছেন বলেও অভিযোগ করেছেন তিনি। নিজের ও পরিবারের সদস্যদের নিরাপত্তা নিয়ে শঙ্কা প্রকাশ করে ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত, সম্পত্তির অধিকার রক্ষা এবং অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন তিনি।
বিশম্ভর চন্দ্র বর্মনের ছেলে শংকর বর্মণ বলেন, আমরা অত্যন্ত নিরীহ মানুষ। আমাদের ওপর জোর-জবরদস্তি করে জায়গা থেকে উচ্ছেদ করার চেষ্টা করা হচ্ছে। আমার ঘর ভাঙচুর করা হয়েছে। বাংলাদেশ সরকার ও প্রশাসনের কাছে আমি এ ঘটনার সুষ্ঠু বিচার চাই।
ভুক্তভোগীর মেয়ের জামাই বলেন, গত ৮ আগস্ট ঘর ভাঙচুরের ঘটনায় জাতীয় জরুরি সেবা ৯৯৯-এ কল করা হয়। পরে কটিয়াদীর সহকারী কমিশনার (ভূমি) ও কিশোরগঞ্জ জেলা পুলিশ সুপার বরাবর লিখিত অভিযোগ দেওয়া হলেও এখন পর্যন্ত কার্যকর কোনো আইনগত বা প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি বলে তাঁদের অভিযোগ।
তিনি আরও বলেন, গত ২৫ আগস্ট সাদা পোশাকে দুই পুলিশ সদস্য সরেজমিনে তদন্তে গেলে তাঁদের উপস্থিতিতেই অভিযুক্ত ব্যক্তি ঘর ভাঙচুরের কথা স্বীকার করে পরিবারটিকে হুমকি দেন। এতে তাঁরা চরম আতঙ্ক ও নিরাপত্তাহীনতায় রয়েছেন। দ্রুত ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত করে প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানান তিনি।
তবে এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন শাহ ওমর ফারুক ভান্ডারী। তিনি বলেন, ওই জায়গাটি আমার। দলিল অনুযায়ী পৌনে চার হাত জায়গা আমার। আমার জায়গায় ঘর তোলার কারণে সেটি ভেঙেছি। প্রায় সাত বছর ধরে এ নিয়ে বিরোধ চলছে। প্রশাসন কাগজপত্র যাচাইয়ের জন্য সময় দিয়েছে। তাদের কাগজ বৈধ প্রমাণিত হলে আমি জায়গাটি দাবি করব না। অন্যথায় দলিল অনুযায়ী জায়গা বুঝে নেব।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে কটিয়াদী মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. রফিকুল ইসলাম বলেন, জমি-জমা নিয়ে বিরোধ থাকতেই পারে। আপনারা আমাদের কেন বিরক্ত করেন? তাদের আদালতে গিয়ে দেওয়ানি মামলা করতে বলেন। এরপর তিনি ফোনের সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেন।
এ বিষয়ে উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) লাবনী আক্তার তারানা বলেন, এ বিষয়ে আমি একটি লিখিত অভিযোগ পেয়েছি। অভিযোগটির তদন্ত চলমান রয়েছে।



