কক্সবাজারের বারে অনুমতিহীন এবং অপ্রাপ্তবয়স্কদের মদ বিক্রি
কক্সবাজার প্রতিবেদক
প্রকাশ: ২৮ আগস্ট ২০২৬, ০৯:০৫ পিএম
কক্সবাজার শহরের ঝাউতলায় রেনেসাঁ হোটেলের বারে হামলা ও পাল্টা হামলায় দুই যুবকের মৃত্যুর ঘটনায় শুধু আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতিই নয়, শহরের বারগুলোতে মদ বিক্রি ও পরিবেশনের নিয়মকানুন নিয়েও নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে।
বৃহস্পতিবার রাতে রেনেসাঁ হোটেলের দ্বিতীয় তলার বারে কথা কাটাকাটির জেরে সংঘর্ষে নাজিবুল হক রাশেদ (২৭) ও সোলাইমান ওরফে সালমান (২৬) নিহত হন। ঘটনার পর বারটিতে থেকে সিসিটিভির ফুটেজ সংগ্রহ ও তদন্ত শুরু করেছে পুলিশ।
ঘটনার পর ঘটনাস্থলে গিয়েছিলেন, কক্সবাজার জেলা পুলিশের মুখপাত্র ও অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (অভিযান ও অপরাধ) ওয়াহিদুর রহমানের নেতৃত্বে পুলিশ।
তিনি জানান, ঘটনার সময় বারটিতে নানা বয়সী অসংখ্য মানুষ ছিলেন। যারা সকলেই মদ্যপান করছিলেন। কিন্তু কারও মদ পানের বৈধ পারমিট ছিল না। যদিও বার কর্তৃ
পক্ষ দাবি করেছেন একজনের পারমিট রয়েছে। কিন্তু ওই পারমিটটিও দেখা ব্যর্থ হয়েছেন কর্তৃপক্ষ। আবার অনেক অপ্রাপ্ত বয়স্কদের দেখা গেছে যারা বারে বসে মদ পান করছিল।
তিনি বলেন, সরকারের নিয়ম মতে বারের মদ বিক্রি বা বসে পানের আগে অবশ্যই পারমিট আছে কিনা যাচাই করতে হয়। কিন্তু কক্সবাজারের বারগুলোতে বৈধ পারমিট ছাড়াই মদ বিক্রির অভিযোগটি পুরানো। বৃহস্পতিবার রাতে ঘটনার পর সেটি প্রমাণও মিলেছে। বারের ক্ষেত্রে এসব পারমিট দেখার দায়িত্ব জেলা প্রশাসন ও মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের। সরকারের সংস্থা দুইটিকে অবহিত করার পর পুলিশ এব্যাপারে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করবে।
অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (অভিযান ও অপরাধ) ওয়াহিদুর রহমানের বক্তব্যের পর সামনে এলো বারগুলোর নিরাপত্তা ও মদ বিক্রির নিয়ন্ত্রণ নিয়ে প্রশ্ন।
অ্যালকোহল নিয়ন্ত্রণ বিধিমালা ২০২২ অনুযায়ী ২১ বছরের কম বয়সী কাউকে অ্যালকোহল পানের পারমিট বা অনুমতি দেওয়া যাবে না। অর্থাৎ শুধু প্রাপ্তবয়স্ক হওয়াই যথেষ্ট নয়; নিয়ম অনুযায়ী মদপানের জন্য প্রয়োজনীয় অনুমতিও থাকতে হবে। বিধিমালায় পারমিটধারীর কাছে নির্দিষ্ট সীমার মধ্যে অ্যালকোহল বিক্রির বিধানও রয়েছে। আইন অনুযায়ী একজন পারমিটধারীর কাছে একবারে সর্বোচ্চ তিন ইউনিট অ্যালকোহল বিক্রির সীমা নির্ধারিত রয়েছে। আইন অনুযায়ী ২১ বছরের নিচে কাউকে মদপানের অনুমতি দেওয়া যায় না। একই সঙ্গে ২১ বছরের কম বয়সী ব্যক্তির কাছে অ্যালকোহল বিক্রির প্রশ্নও আইনগতভাবে নিষিদ্ধতার মধ্যে পড়ে। কিন্তু কক্সবাজার একটি পর্যটন শহর হওয়ায় বিভিন্ন বয়সী পর্যটক ও স্থানীয়দের যাতায়াত রয়েছে। ফলে বারগুলোতে তরুণদের বয়স যাচাই না করেই মদ পরিবেশন করা হয়।
স্থানীয়দের অভিযোগ, কক্সবাজারের সরকার অনুমতি বারে তরুণদের কাছ থেকে বয়স বা পারমিটের তথ্য যথাযথভাবে যাচাই না করেই মদ পরিবেশন করা হয়। বারের প্রবেশ রেজিস্টার, পারমিট যাচাইয়ের রেকর্ড, বিক্রয় রেজিস্টার ও ক্যাশমেমো যাচাই করলে যার সত্যতা পাওয়া যাবে।
অনুসন্ধান বলছে, কক্সবাজারে সরকার অনুমোদিত বারের সংখ্যা ১০ টি। এগুলো হল, শহরের ঝাউতলা এলাকার রেনেসাঁ, সৈকতের লাবণী পয়েন্টের কয়লা, কলাতলী এলাকার সী-গাল, সী প্যালেস, সী ক্রাউন, নি:স্বর্গ, কক্স-টু ডে, সায়মান, ওশান প্যারাডাইস ও ইনানীর রয়েল টিউলিপ।
যে বারগুলোতে ২০ থেকে ২৫ বছর বয়সী অনেক তরুণ পারমিট না থাকলেও বারে বসে মদ পান করতে প্রায়শ দেখা মিলে। সরকারি গেজেটে প্রকাশিত অ্যালকোহল-সংক্রান্ত লাইসেন্সের শর্তে বলা হয়েছে, অনুমোদিত বার বা কাউন্টার ছাড়া অন্য কোনো স্থানে বিলাতি মদ বিক্রি বা পরিবেশন করা যাবে না। একই হোটেল বা রেস্তোরাঁয় পৃথক বার বা কাউন্টার থাকলে পৃথক লাইসেন্সের বিধানও রয়েছে। আবাসিক হোটেলের ক্ষেত্রে আবাসিক কক্ষে মদ পরিবেশন বা ব্যবহারেরও নিষেধাজ্ঞা রয়েছে। কিন্তু কক্সবাজারের বার গুলোতে তাও মানা হয় না।
বৃহস্পতিবার রেনেসাঁর বারে সংঘাতে ছুরিকাঘাতের কথা বলা হচ্ছে। তা হলে প্রশ্ন উঠেছে প্রবেশের সময় নিয়ম মতে তল্লাশী করার কথা থাকলেও তা হয়নি কেন?
এব্যাপারে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের কক্সবাজার কার্যালয়ের উপ পরিচালক সোমেন মন্ডল জানান, কক্সবাজারে সাড়ে ৫ শতের অধিক ব্যক্তি মদ পানের জন্য বৈধ পারমিট রয়েছে। এর বাইরে অনেক পর্যটক এবং বিদেশীরা রয়েছেন। যাদের পারমিট আছে। এর উপর ভিত্তি করেই কক্সবাজারের বারগুলো পরিচালিত হয়। বৈধ পারমিট ছাড়া মদ বিক্রি না করতেই আগে থেকে সর্তক করা আছে। তা না মানলে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। একই জন্য বৃহস্পতিবার রেনেসাঁয় সংঘটিত ঘটনা বিষয়টি নিয়েও তদন্ত হচ্ছে।
#হামলা পাল্টা হামলায় নিহত ২
বৃহস্পতিবার (২৮ আগস্ট) রাত সাড়ে ১১টার দিকে কক্সবাজার শহরের ঝাউতলায় রেনেসাঁ হোটেলের মদের বারে কথা কাটাকাটির জেরে হামলা ও পাল্টা হামলায় দুই যুবক নিহত হয়েছেন।
নিহতরা হলেন, শহরের নুনিয়ারছড়ার মৃত জয়নাল আবেদীনের ছেলে নাজিবুল হক রাশেদ ( ২৭) ও বিডিআর ক্যাম্প এলাকার আবুল কালামের ছেলে সোলাইমান ওরফে সালমান (২৯)।
রেনেসা বারের ম্যানেজার তারেক বলেন, পারমিট ছাড়াই রাশেদের সাথে আরো ৪ জন যুবক বারে আসে। তারা সেখানে বসে মদ পান করে। সেখানে রাশেদের সাথে কোন এক বিষয় নিয়ে তার সাথেই আসা শহরের ২ নং ওয়ার্ডের আনসারের মধ্যে কথা কাটা কাটি হয়। এরপর আনসার ফোন করে আরো দুইজনকে ডেকে আনে। তারা এসে রাশেদকে ভাঙ্গা বোতল ও ছুরি দিয়ে আঘাত করে পালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করে। এর মধ্যে বিডিআরক্যাম্প এলাকার সালমানকে জনতা আটক করে।
বার ও আশেপাশের সিসিটিভি ফুটেজে দেখা গেছে, রাত ১১ টার পর পর শহরের খুরুশকুল রাস্তার মাথা এলাকার আবু তাহের মিয়ার ছেলে পুলিশের তালিকাভুক্ত সন্ত্রাসী তাজুয়ার হক রাধি ও তার বন্ধু সালমান বারে প্রবেশ করছেন। এরপর সালমান গিয়ে রাশেদকে জাপটে ধরে। আর রাধি এলোপাতাড়ি ছুরিকাঘাত ও কাঁচের বোতল দিয়ে আঘাত করে। পরে রাশেদ আহতাবস্থায় নিচে নেমে এসে মাটিতে লুটিয়ে পড়ে। স্থানীয়রা তাকে উদ্ধার করে হাসপাতালে নিয়ে যায়। এবং সালমানকে ধরে উত্তম মাধ্যম দেয়।
এই বিষয়ে নাম প্রকাশ না করার শর্তে স্থানীয় এক দোকানদার বলেন, হোটেলের বাইরের যখন হামলাকারীরা আসে তখন সালমানকে ধরে ফেলা হয়। কিন্তু এরই মধ্যে রাশেদের স্বজনরা খবর পেয়ে ঘটনাস্থলে চলে আসে। তারা সালমানকে সেখানে একদফা মারধর করে তুলে নিয়ে যায়। পরে রাশেদের এলাকায় নিয়ে আবার মারধর করে মূমুর্ষ অবস্থায় পুলিশের হাতে তুলে দেয়।
পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, বারে আহত রাশেদকে হাসপাতালে নেয়ার মৃত ঘোষণা করা হয়। এর পর মূমুর্ষ অবস্থায় সালমানকে পুলিশে সোপর্দ করা হয়। পরে পুলিশ তাকে কক্সবাজার সদর হাসপাতালে নিয়ে যায়। সেখানে তার অবস্থার আরো অবনতি হওয়ায় তাকে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে রেফার করা হয়। সেখানে শুক্রবার সকালে তার মৃত্যু হয়।
কক্সবাজারের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার অহিদুল ইসলাম বলেন, প্রাথমিকভাবে আমরা জানতে পেরেছি মদের বারে কথা কাটাকাটির জেরে হামলা ও পাল্টা হামলায় দুই যুবক নিহত হয়েছেন। কি নিয়ে কথা কাটাকাটি হয়েছে তা জানার চেষ্টা চলছে। এই ঘটনায় যারা যারা জড়িত তাদের চিহ্নিত করে আইনের আওতায় আনতে কাজ করছে পুলিশ।



