রোহিঙ্গা সংকটের নয় বছর
নিজ ভূমিতে ফিরতে মরিয়া, তবু অনিশ্চিত জীবনের শেষ নেই
তৌহিদুল ইসলাম, কক্সবাজার প্রতিবেদক
প্রকাশ: ২৫ আগস্ট ২০২৬, ১২:১৬ এএম
৮৬ বছরের বৃদ্ধ আব্দুল জব্বারের চোখে এখনো ভেসে ওঠে তাঁর জন্মভূমির ছবি। মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যের মংডু টুডেং জব্বারপাড়া গ্রাম, যে মাটিতে তাঁর জন্ম, যে মাটিতে তাঁর বাবা-দাদা-পরদাদার বসতি, যে জনপদে জীবনের সবচেয়ে দীর্ঘ সময় কাটিয়েছেন শিক্ষকতা করে, সেই মাটিতেই ফিরতে চান জীবনের শেষ প্রান্তে এসে।
একসময় তিনি ছিলেন গ্রামের প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক। প্রজন্মের পর প্রজন্ম শিশুকে পড়িয়েছেন। স্থানীয় সমাজে ছিল তাঁর সম্মান, পরিচয় ও অবস্থান। কিন্তু ইতিহাসের নির্মম বাঁকে সেই পরিচয়ই একদিন হয়ে ওঠে প্রশ্নবিদ্ধ। নাগরিকত্ব, জাতিগত পরিচয় ও নিরাপত্তার সংকট তাঁকে বারবার ঠেলে দিয়েছে সীমান্তের ওপারে।
আজ বাংলাদেশের কক্সবাজারের একটি রোহিঙ্গা শিবিরে বসে তাঁর একটাই আকাঙ্ক্ষা, “নিজ দেশে ফিরে যেতে চাই।”
আব্দুল জব্বারের গল্প আসলে একক কোনো মানুষের গল্প নয়। এটি একটি জনগোষ্ঠীর কয়েক দশকের রাষ্ট্রহীনতা, পরিচয় সংকট, উচ্ছেদ, নির্যাতন ও প্রত্যাবাসনের অপেক্ষার গল্প। ২০১৭ সালের ২৫ আগস্টের পর বাংলাদেশে আসা সাত লাখের বেশি রোহিঙ্গার ঢল বিশ্ববাসীর সামনে সংকটটিকে নতুন মাত্রায় তুলে ধরেছিল। কিন্তু সেই ঢলের পেছনে ছিল কয়েক দশকের ইতিহাস। নয় বছর পরও সেই ইতিহাসের সমাপ্তি লেখা হয়নি।
বরং কক্সবাজারের পাহাড়ঘেরা শিবিরগুলোতে নতুন প্রজন্ম বেড়ে উঠছে এমন এক অনিশ্চয়তার মধ্যে, যেখানে জন্মভূমি তাদের কাছে বাস্তবের চেয়ে বেশি একটি স্মৃতি, গল্প কিংবা স্বপ্ন।
আব্দুল জব্বারের ভাষ্য অনুযায়ী, তাঁর প্রজন্মের রোহিঙ্গারা মিয়ানমারে নাগরিক হিসেবে পরিচিত ছিলেন। শিক্ষা, চাকরি, ব্যবসা-বাণিজ্যসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে অংশগ্রহণের সুযোগও ছিল।
তবে ইতিহাসের ধারাবাহিকতায় সেই অধিকার ক্রমেই সংকুচিত হয়।
১৯৭৮ সালে মিয়ানমারের সামরিক সরকারের ‘অপারেশন ড্রাগন কিং’ বা ‘নাগামিন’ অভিযান রোহিঙ্গাদের জীবনে বড় ধরনের বিপর্যয় ডেকে আনে। নাগরিক ও ‘বিদেশি’ শনাক্ত করার নামে পরিচালিত ওই অভিযানে ব্যাপক ধরপাকড় ও নির্যাতনের অভিযোগ ওঠে। কয়েক মাসের মধ্যে আনুমানিক দুই থেকে আড়াই লাখ রোহিঙ্গা বাংলাদেশে পালিয়ে আসে। পরে বাংলাদেশ ও মিয়ানমারের মধ্যে চুক্তির পর বিপুলসংখ্যক শরণার্থী ফিরে যায়।
আব্দুল জব্বারও তাঁদের একজন।
তাঁর ভাষায়, বাংলাদেশে আশ্রয় নেওয়ার পর চুক্তির মাধ্যমে যখন তাঁরা মিয়ানমারে ফিরে যান, তখন তাঁদের আশা ছিল আগের মতো জীবন ফিরে পাবেন। কিন্তু সেই প্রত্যাশা পূরণ হয়নি।
“চুক্তি অনুযায়ী অধিকার দেওয়া হয়নি। উল্টো কয়েক বছর পর সব কিছু কেড়ে নেওয়া হয়” বলেন তিনি।
১৯৮২ সালের নাগরিকত্ব আইন রোহিঙ্গাদের সংকটকে আরও গভীর করে। নতুন নাগরিকত্ব কাঠামোয় নাগরিকত্বের শ্রেণিবিন্যাস ও ‘জাতীয় জাতিগোষ্ঠী’র ধারণা রোহিঙ্গাদের রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতির বাইরে ঠেলে দেয়। জাতিসংঘের মানবাধিকার সংক্রান্ত নথিতেও ১৯৪৮-১৯৬২ সময়কালে নাগরিক হিসেবে বিবেচিত রোহিঙ্গাদের পরবর্তী সময়ে অধিকার সংকুচিত হওয়ার বিষয়টি উঠে এসেছে। এরপর পরিচয়পত্র, চলাচল, শিক্ষা, চাকরি, বিয়ে, রাজনৈতিক অংশগ্রহণ, জীবনের প্রায় প্রতিটি ক্ষেত্রে বিধিনিষেধ ক্রমে বাড়তে থাকে।
আব্দুল জব্বারের ভাষায়, “যেখানে আমি জন্মেছি, যেখানে আমার পূর্বপুরুষরা বসবাস করেছে, সেখানে আমাকে কেন বাঙালি বলা হবে? আমি রোহিঙ্গা।”
এই একটি প্রশ্নের মধ্যেই যেন আটকে আছে রোহিঙ্গা সংকটের সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক ও মানবিক দ্বন্দ্ব। রোহিঙ্গা সংকটকে শুধু ২০১৭ সালের ঘটনা দিয়ে ব্যাখ্যা করলে এর দীর্ঘ ইতিহাস আড়াল হয়ে যায়। ১৯৭৮-এর পর ১৯৯০-এর দশকেও বড়সংখ্যক রোহিঙ্গা বাংলাদেশে আশ্রয় নেয়। ২০১২ সালে রাখাইনে সাম্প্রদায়িক সহিংসতা, ২০১৬ সালে নতুন করে সামরিক অভিযান এবং সর্বশেষ ২০১৭ সালের ভয়াবহ অভিযানের মধ্য দিয়ে সংকট ক্রমেই বিস্তৃত হয়।
২০১৭ সালের আগস্টে মিয়ানমারের নিরাপত্তা চৌকিতে হামলার পর সেনাবাহিনী বড় ধরনের অভিযান শুরু করে। এর পরবর্তী কয়েক মাসে সাত লাখের বেশি রোহিঙ্গা সীমান্ত পেরিয়ে বাংলাদেশে চলে আসে। জাতিসংঘ ও বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থা ওই অভিযানের সময় ব্যাপক মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ নথিভুক্ত করে। তখন কক্সবাজারের উখিয়া-টেকনাফের পাহাড়ে গড়ে ওঠে বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ শরণার্থী বসতি। একসময় যে জায়গাগুলো ছিল বন ও পাহাড়, সেখানে রাতারাতি তৈরি হয় হাজার হাজার ঝুপড়ি। বাঁশ, পলিথিন আর ত্রিপলের ঘর হয়ে ওঠে মানুষের ঠিকানা। নয় বছর পরও সেই অস্থায়ী ঠিকানাই স্থায়ী বাস্তবতা।
নয় বছরে শিবিরে জন্ম নিয়েছে নতুন প্রজন্ম :
২০২৬ সালের ৩০ জুন পর্যন্ত বাংলাদেশে রোহিঙ্গা শরণার্থীর সংখ্যা প্রায় ১২ লাখ। এর মধ্যে কক্সবাজারের ৩৩টি শিবিরে রয়েছে প্রায় ১১ লাখ ৬৬ হাজার মানুষ। আরও প্রায় ৩৪ হাজার রোহিঙ্গা রয়েছে ভাসানচরে। অর্থাৎ ২০১৭ সালে যারা শিশু ছিল, তাদের অনেকেই এখন কৈশোর পেরিয়েছে। কেউ কেউ তরুণ হয়েছে। আবার যারা ২০১৭ সালের পর জন্মেছে, তাদের একটি অংশ মিয়ানমার দেখেইনি।
তাদের কাছে ‘রাখাইন’ একটি পূর্বপুরুষের গল্প। কেউ বাবার মুখে শুনেছে নিজের গ্রামের নাম। কেউ মায়ের কাছে শুনেছে ফেলে আসা বাড়ির কথা। কেউ জানে না তাদের বাড়ির সামনে কী ছিল, পাশের গ্রামে কারা থাকত, গ্রামের মসজিদটি কোথায় ছিল কিংবা তাদের জমির সীমানা কোথায়। তবুও তারা জানে—তাদের একটি ‘দেশ’ আছে। সেটি মিয়ানমার। কিন্তু সেই দেশের নাগরিকত্ব তাদের নেই। এটাই রোহিঙ্গা সংকটের সবচেয়ে গভীর বৈপরীত্য।
ফিরতে চান, কিন্তু কিসের নিশ্চয়তায়? :
রোহিঙ্গাদের বড় অংশই বাংলাদেশে স্থায়ীভাবে থাকতে চায়, এমন ধারণা বাস্তবতার সঙ্গে পুরোপুরি মেলে না। বরং বহু রোহিঙ্গার সঙ্গে কথা বললে একটি বিষয় স্পষ্ট, তাঁরা ফিরতে চান। তবে নিরাপদ, স্বেচ্ছায় ও মর্যাদাপূর্ণ প্রত্যাবাসন চান।
তাঁদের দাবিগুলোও প্রায় একই। তারা বলছেন, নাগরিকত্বের নিশ্চয়তা, নিরাপত্তার নিশ্চয়তা, নিজেদের ভিটেমাটি ফেরত, ক্ষতিপূরণ এবং নির্যাতন ও হত্যার বিচার, এই পাঁচটি শর্তের সঙ্গে যুক্ত রয়েছে আরও একটি মৌলিক দাবি, তাঁদের রোহিঙ্গা পরিচয়ের স্বীকৃতি।
রোহিঙ্গা এআরএসপিএইচ-এর চেয়ারম্যান মোহাম্মদ জুবায়েরের ভাষায়, তাঁদের সংকটের মূল জায়গা পরিচয়। তাঁর বক্তব্য, “আমরা হচ্ছি রোহিঙ্গা, বার্মা আমাদের বাঙালি বলে। মিয়ানমার সরকার আমাদের বাঙালি বলে পরিচয় দিতে চায়। এই পরিচয়ের সংকটের কারণেই আমাদের সব অধিকার কেড়ে নেওয়া হয়েছে।”
এই পরিচয়ের প্রশ্নটি শুধু আবেগের নয়; এটি নাগরিকত্ব, ভোটাধিকার, ভূমির অধিকার এবং রাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্কের প্রশ্ন।
দুই দফা প্রত্যাবাসন উদ্যোগ, ফল শূন্য :
২০১৭ সালের বিপুল রোহিঙ্গা আগমনের পর বাংলাদেশ ও মিয়ানমার প্রত্যাবাসন নিয়ে চুক্তি করে। ২০১৮ সালের ১৫ নভেম্বর প্রথম দফায় প্রত্যাবাসনের উদ্যোগ নেওয়া হয়। কিন্তু রোহিঙ্গারা নিরাপত্তা ও অধিকার নিয়ে নিশ্চয়তা না পাওয়ায় ফিরে যেতে রাজি হননি। ২০১৯ সালের ২২-২৩ আগস্ট দ্বিতীয় দফায়ও একই পরিস্থিতি তৈরি হয়।
ফলে তালিকা তৈরি হয়েছে, যাচাই হয়েছে, কূটনৈতিক বৈঠক হয়েছে, আন্তর্জাতিক সম্মেলন হয়েছে—কিন্তু একজন রোহিঙ্গাকেও টেকসইভাবে নিজ ভূমিতে ফেরানো সম্ভব হয়নি।এর মধ্যে বদলে গেছে মিয়ানমারের বাস্তবতা।
আরও জটিল রাখাইন :
২০২১ সালে মিয়ানমারে সামরিক বাহিনীর ক্ষমতা দখলের পর দেশজুড়ে সংঘাত তীব্র হয়। রাখাইন রাজ্যও তার বাইরে নয়। আরাকান আর্মি ও মিয়ানমারের সামরিক বাহিনীর সংঘাত রাখাইনের পরিস্থিতিকে আরও জটিল করেছে। বিভিন্ন এলাকায় নিয়ন্ত্রণের পরিবর্তন, সশস্ত্র সংঘাত এবং নিরাপত্তাহীনতা প্রত্যাবাসনের সম্ভাবনাকে আরও অনিশ্চিত করেছে।
ফলে এখন প্রশ্ন শুধু, মিয়ানমার রোহিঙ্গাদের ফেরত নেবে কি না।
জাতিসংঘের ২০২৫-২৬ সালের রোহিঙ্গা প্রতিক্রিয়া পরিকল্পনাতেও নিরাপদ, স্বেচ্ছামূলক ও টেকসই প্রত্যাবাসনকে অন্যতম প্রধান লক্ষ্য হিসেবে রাখা হয়েছে। ২০২৬ সালে বাংলাদেশ ও আশ্রয়দাতা জনগোষ্ঠীসহ প্রায় ১৬ লাখ মানুষের জন্য ৭১০.৫ মিলিয়ন ডলারের মানবিক সহায়তা প্রয়োজন বলে জাতিসংঘ জানিয়েছে।
তালিকা বদলেছে, কিন্তু প্রত্যাবাসন শুরু হয়নি :
প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়ার সবচেয়ে আলোচিত অংশ হলো বাংলাদেশ ও মিয়ানমারের মধ্যে রোহিঙ্গাদের তথ্য যাচাই। বাংলাদেশ কয়েক ধাপে মিয়ানমারের কাছে ৮,২৯,০৩৬ জনের তথ্য দিয়েছে। ২০২৬ সালের জানুয়ারি পর্যন্ত মিয়ানমার প্রায় ৩,৫৪,৭৫১ জনের তথ্য যাচাই করেছিল; তাদের মধ্যে ২,৫৩,৯৬৪ জনকে ‘মিয়ানমারে পূর্বে বসবাসকারী ব্যক্তি’ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছিল। তখনও চলমান সংঘাতের কারণে প্রত্যাবাসন শুরু করা সম্ভব নয় বলে বাংলাদেশকে জানানো হয়।
এরপর জুলাইয়ের শেষ নাগাদ মিয়ানমারের যাচাইয়ের সংখ্যা আরও বাড়ে। সাম্প্রতিক তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশ দেওয়া ৮,২৮,৮২৪ জনের তালিকার মধ্যে মিয়ানমার ৪,২৬,৫৪৫ জনের যাচাই সম্পন্ন করেছে এবং ৩,০৮,৭৯৭ জনকে রাখাইনের সাবেক বাসিন্দা হিসেবে চিহ্নিত করেছে।
অর্থাৎ যাচাই প্রক্রিয়ায় অগ্রগতি হয়েছে, কিন্তু প্রত্যাবাসনের পথে সেই অগ্রগতি এখনো বাস্তব প্রত্যাবর্তনে রূপ নেয়নি। মিয়ানমারের সামরিক-সমর্থিত সরকার জানিয়েছে, নিরাপত্তা পরিস্থিতির উন্নতি হলে প্রত্যাবাসন শুরু করা যেতে পারে। কিন্তু রোহিঙ্গাদের প্রশ্ন, কবে সেই নিরাপদ পরিস্থিতি তৈরি হবে? এই ‘কবে’ প্রশ্নটির কোনো নির্দিষ্ট উত্তর নেই।
বাংলাদেশের ওপর বাড়ছে দীর্ঘমেয়াদি চাপ :
রোহিঙ্গা সংকট শুধু মানবিক সংকট নয়; এটি বাংলাদেশের জন্য দীর্ঘমেয়াদি সামাজিক, অর্থনৈতিক, পরিবেশগত ও নিরাপত্তাজনিত চ্যালেঞ্জও তৈরি করেছে। কক্সবাজারের উখিয়া-টেকনাফে কয়েক লাখ রোহিঙ্গার বসতি স্থানীয় জনজীবনের ওপর ব্যাপক চাপ তৈরি করেছে। পাহাড় কাটা, বনভূমির ওপর চাপ, জ্বালানি কাঠের ব্যবহার, পানি ও স্বাস্থ্যসেবা, স্থানীয় শ্রমবাজার, মাদক ও মানবপাচারসহ বিভিন্ন ইস্যুতে ঝুঁকি তৈরি হয়েছে। একই সঙ্গে ক্যাম্পে অপরাধী চক্রের তৎপরতা, অপহরণ, চাঁদাবাজি, মাদক ব্যবসা ও মানবপাচার পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে।
অন্যদিকে আন্তর্জাতিক সহায়তার ওপর নির্ভরশীল এই বিশাল জনগোষ্ঠীর জন্য তহবিল সংকটও ক্রমে বড় সমস্যা হয়ে উঠছে। জাতিসংঘ বলছে, ২০২৬ সালের মানবিক পরিকল্পনার আওতায় রোহিঙ্গা শরণার্থী এবং তাঁদের আশ্রয়দাতা বাংলাদেশি জনগোষ্ঠীর জন্য বিপুল অর্থের প্রয়োজন। অর্থাৎ সংকট যত দীর্ঘ হচ্ছে, তার ব্যবস্থাপনাও তত ব্যয়বহুল হয়ে উঠছে।
সবচেয়ে বড় ঝুঁকি ‘হারানো প্রজন্ম’ :
রোহিঙ্গা সংকটের সবচেয়ে ভয়াবহ পরিণতি হয়তো এখনো পুরোপুরি দৃশ্যমান হয়নি। কারণ একটি প্রজন্ম এমন পরিবেশে বড় হচ্ছে, যেখানে তাদের নিজস্ব রাষ্ট্র নেই, নাগরিকত্ব নেই এবং ভবিষ্যৎ সম্পর্কে নিশ্চিত কোনো পথনির্দেশ নেই। শিবিরের শিশুরা স্কুলে যায়, খেলাধুলা করে, স্বপ্ন দেখে। কিন্তু সেই স্বপ্নের গন্তব্য কোথায়, বাংলাদেশ, মিয়ানমার, নাকি অন্য কোনো দেশ, তা তারা জানে না। তাদের অনেকের জন্ম বাংলাদেশে। জন্মসনদ তাদের পরিচয়ের একটি অংশ হতে পারে, কিন্তু নাগরিকত্ব নয়। তারা মিয়ানমারের নাগরিকও নয়।
ফলে একটি প্রজন্ম তৈরি হচ্ছে, যাদের জীবন শুরু হয়েছে বাস্তুচ্যুতির মধ্যে এবং ভবিষ্যৎ আটকে আছে প্রত্যাবাসনের অপেক্ষায়। এই অবস্থাকে দীর্ঘায়িত করলে ‘রোহিঙ্গা সংকট’ শুধু শরণার্থী সংকট থাকবে না; এটি একটি দীর্ঘস্থায়ী প্রজন্মগত সংকটে পরিণত হবে।
সব হিসাব, কূটনীতি, চুক্তি ও বৈঠকের বাইরে একজন বৃদ্ধ মানুষের অপেক্ষাকে কি মাপা যায়? আব্দুল জব্বারের বয়স এখন ৮৬। তিনি জানেন না জীবনের আর কতটা সময় তাঁর হাতে আছে।
তিনি জানেন, তাঁর জন্মভূমি এখন আগের মতো নেই। তিনি জানেন, সেখানে রাজনৈতিক ও সামরিক বাস্তবতা বদলে গেছে। তিনি জানেন, তাঁর বাড়িঘর আগের জায়গায় আছে কি না, সেটিও নিশ্চিত নয়। তারপরও তাঁর আকাঙ্ক্ষা বদলায়নি।
“আমি রোহিঙ্গা। জীবনের শেষ সময়ে আমার একটাই ইচ্ছা, নিজ দেশে ফিরে যেতে চাই।”
এই কথার মধ্যে রয়েছে নয় দশকের একটি মানুষের জীবনের সারাংশ।
সংকটের সমাধান কোথায়? :
রোহিঙ্গা সংকটের সমাধান বাংলাদেশে তাদের অনির্দিষ্টকাল রেখে দেওয়ার মধ্যে নেই। আবার নিরাপত্তা ও অধিকার নিশ্চিত না করে জোর করে মিয়ানমারে ফেরত পাঠানোও কোনো সমাধান নয়।
সমাধানের পথ মূলত মিয়ানমারের ভেতরেই। রোহিঙ্গাদের নাগরিকত্বের প্রশ্নের সমাধান করতে হবে। তাঁদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে। বসতভিটা ও ভূমির অধিকার পুনঃপ্রতিষ্ঠা করতে হবে। জাতিগত বৈষম্য বন্ধ করতে হবে। অতীতের গুরুতর মানবাধিকার লঙ্ঘনের জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ, রোহিঙ্গাদের নিজেদের ভবিষ্যৎ সম্পর্কে সিদ্ধান্ত নেওয়ার সুযোগ দিতে হবে। কারণ প্রত্যাবাসন শুধু মানুষকে সীমান্তের এক পাশ থেকে অন্য পাশে নিয়ে যাওয়ার নাম নয়।
রোহিঙ্গাবিষয়ক গবেষক ও চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের নৃবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক রাহমান নাসির উদ্দিন বলেন, “আগেও দুই দফা প্রত্যাবাসনের চেষ্টা ব্যর্থ হয়েছে। বর্তমানে রাখাইনের পরিস্থিতি আরও জটিল। শুধু মিয়ানমার সরকার রাজি হলেই হবে না, সেখানে নিরাপদ পরিবেশ তৈরি করতে হবে।”
শরণার্থী ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন কমিশনার (আরআরআরসি) মোহাম্মদ মিজানুর রহমান জানিয়েছেন, রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়ায় বর্তমানে কোনো অগ্রগতি নেই। জন্মহার কিছুটা কমলেও বাংলাদেশে রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর চাপ ক্রমেই বাড়ছে।
পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমান সংসদে জানান, রোহিঙ্গা সংকট সমাধান অনেকাংশে নির্ভর করছে রাখাইনের নিরাপত্তা পরিস্থিতি, আন্তর্জাতিক চাপ ও মিয়ানমারের সদিচ্ছার ওপর। তিনি বলেন, রাখাইনে স্থিতিশীল পরিবেশ তৈরিতে মিয়ানমার সরকার ও আরাকান আর্মির মধ্যে সংলাপ জরুরি।



