সৈকতের বালিয়াড়িতে সড়ক নিমার্ণ: আট তথ্য চেয়েছে পরিবেশ অধিদপ্তর
কক্সবাজার প্রতিবেদক
প্রকাশ: ২৩ আগস্ট ২০২৬, ১০:৩৪ পিএম
কক্সবাজার সমুদ্র সৈকতের বালিয়াড়ির উপর চলমান সড়ক নিমার্ণের নকশা সহ আটটি তথ্য চেয়ে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে চিঠি প্রদান করেছে পরিবেশ অধিদপ্তর। একই সঙ্গে সড়ক নির্মাণের সব কার্যক্রম অনতিবিলম্বে বন্ধের দাবি জানিয়ে দুই সচিব, কক্সবাজারের ডিসি এবং ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানসহ ১০ জনকে আইনি নোটিশ পাঠিয়েছে বাংলাদেশ পরিবেশ আইনবিদ সমিতি (বেলা)।
রবিবার প্রকল্প পরিচালক এ এস এম রাশেদুর রহমান এবং ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান ন্যাশনাল ডেভেলপমেন্ট ইঞ্জিনিয়ার্সের (এনডিই) জেনারেল ম্যানেজার মো. আরিফুল ইসলামকে পাঠানো চিঠতে স্বাক্ষর করেছেন পরিবেশ অধিদপ্তর কক্সবাজার জেলা কার্যালয়ের পরিচালক জমির উদ্দিন।
চিঠিতে বলা হয়েছে, কক্সবাজার সমুদ্র সৈকতের সুগন্ধা থেকে সায়মন বিচ পয়েন্ট পর্যন্ত সৈকতের দৃশ্যমান বালিয়াড়িতে নির্মাণাধীন সড়কের স্থান পরিবেশ অধিদপ্তর পরিদর্শন করেছে। পরিদর্শনকালে দেখা যায়, সুগন্ধা পয়েন্ট সংলগ্ন সমুদ্র সৈকতের দৃশ্যমান বালিয়াড়িতে খননযন্ত্র দিয়ে বালু সমতল করে সড়ক নির্মাণের কার্যক্রম চলছে। বালিয়াড়ি সমুদ্র উপকূলের গুরুত্বপূর্ণ প্রাকৃতিক প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা হিসেবে কাজ করে। এর স্বাভাবিক গঠন ও ভূ-প্রকৃতি পরিবর্তন করলে উপকূলীয় ক্ষয়, বালু সঞ্চালন, জলোচ্ছ্বাস ও ঘূর্ণিঝড়জনিত ঝুঁকি এবং উপকূলীয় প্রতিবেশের ওপর বিরূপ প্রভাব পড়ার আশঙ্কা রয়েছে। এ প্রেক্ষাপটে নির্মাণাধীন সড়কটির প্রয়োজনীয়তা, অবস্থান, নকশা এবং সম্ভাব্য পরিবেশগত ও উপকূলীয় ঝুঁকি যথাযথভাবে মূল্যায়ন করা প্রয়োজন। তাই তিন কার্যদিবসের মধ্যে প্রকল্পের অনুমোদিত নকশা, পরিবেশগত ছাড়পত্র, সড়ক নির্মাণের ফলে বালিয়াড়ির স্বাভাবিক গঠন, বালু সঞ্চালন, উপকূলীয় ক্ষয়, নিষ্কাশন ব্যবস্থা এবং সামুদ্রিক প্রতিবেশের ওপর সম্ভাব্য প্রভাবের মূল্যায়ন, প্রকল্প বাস্তবায়নে সংশ্লিষ্ট অন্যান্য সরকারি দপ্তরের অনুমোদন ও ছাড়পত্র, নির্মাণাধীন সড়কের জমির মালিকানা-সংক্রান্ত খতিয়ান, দাগ, মৌজা ম্যাপ এবং অন্যান্য প্রাসঙ্গিক ভূমি রেকর্ডসহ আট ধরনের তথ্য পরিবেশ অধিদপ্তরে জমা দেওয়ার অনুরোধ জানানো হয়েছে।
চিঠিতে আরও বলা হয়েছে, পরিবেশ অধিদপ্তর ১৯৯৯ সালে কক্সবাজার-টেকনাফ সমুদ্র সৈকতের ১০ হাজার ৪৬৫ হেক্টর এলাকাকে প্রতিবেশগত সংকটাপন্ন এলাকা হিসেবে ঘোষণা করে। বিধিমালা অনুযায়ী এই এলাকায় মাটি, পানি, বায়ু এবং শব্দ দূষণকারী শিল্প বা প্রতিষ্ঠান স্থাপন এবং প্রাণী ও উদ্ভিদের আবাসস্থল ধ্বংসকারী সব ধরনের কার্যকলাপ নিষিদ্ধ। এ ছাড়া প্রতিবেশগত সংকটাপন্ন এলাকায় পরিবেশ অধিদপ্তরের সম্মতি ছাড়া ভূমির শ্রেণি পরিবর্তন করা যাবে না।
চিঠিতে প্রতিবেশগত সংকটাপন্ন এলাকা (ইসিএ) সংরক্ষণের বিষয়ে বাংলাদেশ পরিবেশ সংরক্ষণ আইন ও প্রতিবেশগত সংকটাপন্ন এলাকা ব্যবস্থাপনা বিধিমালা যে কোনো আইনের ওপর প্রাধান্য পাবে মর্মে সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগের রায় দেওয়া হয়েছে বলেও উল্লেখ করা হয়। এ ছাড়াও সৈকত রক্ষা নিয়ে উচ্চ আদালতের একাধিক নির্দেশনা রয়েছে।
এদিকে. এই সড়ক নির্মাণের সব কার্যক্রম অনতিবিলম্বে বন্ধের দাবি জানিয়ে ১০ জনকে আইনি নোটিশ পাঠিয়েছে বাংলাদেশ পরিবেশ আইনবিদ সমিতি (বেলা)। রবিবার বেলার আইনজীবী জাকারিয়া সুলতানা ডাক বিভাগের মাধ্যমে এ নোটিশ পাঠিয়েছেন বলে জানিয়েছেন।
যাদের নোটিশ পাঠানো হয়েছে তারা হলেন, পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তনবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের সচিব, গৃহায়ণ ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের সচিব, বাংলাদেশ পর্যটন করপোরেশনের চেয়ারম্যান, কক্সবাজার উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান, পরিবেশ অধিদপ্তরের মহাপরিচালক, কক্সবাজারের জেলা প্রশাসক, পুলিশ সুপার, কক্সবাজার পৌরসভার প্রশাসক, পরিবেশ অধিদপ্তর কক্সবাজার জেলা কার্যালয়ের পরিচালক ও ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান ন্যাশনাল ডেভেলপমেন্ট ইঞ্জিনিয়ার্সের (এনডিই) জেনারেল ম্যানেজার।
নোটিশে বলা হয়েছে, পরিবেশগত ছাড়পত্র গ্রহণ ছাড়া প্রতিবেশগত সংকটাপন্ন এলাকায় এবং কক্সবাজার উন্নয়ন কর্তেপক্ষের অনুমোদন ছাড়া নো ডেভেলপমেন্ট জোনে সড়ক নির্মাণ দেশে প্রচলিত আইনের স্পষ্ট লঙ্ঘন। কক্সবাজার সমুদ্র সৈকতের সুগন্ধা পয়েন্টের নির্মাণ নিষিদ্ধ স্থানে সড়ক নির্মাণের সব কার্যক্রম বন্ধ করে পৃথিবীর দীর্ঘতম সমুদ্র সৈকতের সংবেদনশীল পরিবেশ ও প্রতিবেশ ব্যবস্থাকে রক্ষা করতে না পারা আইন প্রয়োগকারী ও আদালতের রায় বাস্তবায়নকারী সংস্থা হিসেবে সংশ্লিষ্ট সরকারি কর্মকর্তারা চরম ব্যর্থতার পরিচায়ক।
মুলত কক্সবাজার সমুদ্রসৈকতের সুগন্ধা পয়েন্ট থেকে কলাতলী পয়েন্টের দূরত্ব মাত্র ১ দশমিক ৬ কিলোমিটার। কাগজপত্রে এই পুরো এলাকাই প্রতিবেশগত সংকটাপন্ন এলাকা (ইসিএ)। অথচ সেই সৈকতের বালিয়াড়ি ভরাট করে নির্মাণ করা হচ্ছে ২৮ মিটার প্রশস্ত একটি সড়ক। ব্যয় ধরা হয়েছে ৬৩ কোটি ৫০ লাখ টাকা।
‘নগর উন্নয়ন ও নগর শাসন প্রকল্প’-এর আওতায় সড়কটি নির্মাণ করছে কক্সবাজার পৌরসভা। প্রকল্পটির অর্থায়ন করছে জাপান আন্তর্জাতিক সহযোগিতা সংস্থা (জাইকা)। ২০২৫ সালের ১৭ জুন এ কাজের দরপত্র আহ্বান করা হয়। পরে নির্মাণকাজ পায় ন্যাশনাল ডেভেলপমেন্ট ইঞ্জিনিয়ার্স (এনডিই)। ২০২৭ সালের ৫ অক্টোবর প্রকল্পটির কাজ শেষ হওয়ার কথা রয়েছে।



