Logo
Logo
×

সারাদেশ

সৈকতের বালিয়াড়ির বুকে সাড়ে ৬৩ কোটি টাকা ব্যয়ে পৌরসভার সড়ক

Icon

কক্সবাজার প্রতিবেদক

প্রকাশ: ২২ আগস্ট ২০২৬, ০৫:২৮ পিএম

সৈকতের বালিয়াড়ির বুকে সাড়ে ৬৩ কোটি টাকা ব্যয়ে পৌরসভার সড়ক

কক্সবাজার সমুদ্রসৈকতের সুগন্ধা পয়েন্ট থেকে কলাতলী পয়েন্টের দূরত্ব মাত্র ১ দশমিক ৬ কিলোমিটার। কাগজপত্রে এই পুরো এলাকাই প্রতিবেশগত সংকটাপন্ন এলাকা (ইসিএ)। অথচ সেই সৈকতের বালিয়াড়ি ভরাট করে নির্মাণ করা হচ্ছে ২৮ মিটার প্রশস্ত একটি সড়ক। ব্যয় ধরা হয়েছে ৬৩ কোটি ৫০ লাখ টাকা।

‘নগর উন্নয়ন ও নগর শাসন প্রকল্প’-এর আওতায় সড়কটি নির্মাণ করছে কক্সবাজার পৌরসভা। প্রকল্পটির অর্থায়ন করছে জাপান আন্তর্জাতিক সহযোগিতা সংস্থা (জাইকা)। ২০২৫ সালের ১৭ জুন এ কাজের দরপত্র আহ্বান করা হয়। পরে নির্মাণকাজ পায় ন্যাশনাল ডেভেলপমেন্ট ইঞ্জিনিয়ার্স (এনডিই)। ২০২৭ সালের ৫ অক্টোবর প্রকল্পটির কাজ শেষ হওয়ার কথা রয়েছে।

গত কয়েকদিন ধরে শুরু হয়েছে সড়কটির নির্মাণকাজ। সরেজমিনে দেখা গেছে, সৈকতের বিস্তীর্ণ বালিয়াড়ি ভরাট করে সড়কের অবকাঠামো তৈরির কাজ চলছে। এতে বালিয়াড়ির প্রাকৃতিক গঠন নষ্ট হওয়ার পাশাপাশি ধ্বংস করা হচ্ছে সৈকতের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ উদ্ভিদ সাগরলতা।

কক্সবাজারের নাজিরারটেক থেকে টেকনাফ পর্যন্ত প্রায় ১২০ কিলোমিটার দীর্ঘ সমুদ্রসৈকতকে ১৯৯৯ সালে প্রতিবেশগত সংকটাপন্ন এলাকা (ইসিএ) ঘোষণা করে সরকার। আইন অনুযায়ী, সৈকতের জোয়ার-ভাটার অঞ্চল থেকে ৩০০ মিটার পর্যন্ত বালিয়াড়িতে যেকোনো ধরনের স্থাপনা নির্মাণ ও উন্নয়ন নিষিদ্ধ। বালিয়াড়িতে নির্মিত অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদের বিষয়ে উচ্চ আদালতেরও নির্দেশনা রয়েছে।

পরিবেশবিদদের মতে, সৈকতের বালিয়াড়ি শুধু বালুর স্তূপ নয়; এটি উপকূলীয় বাস্তুতন্ত্রের গুরুত্বপূর্ণ অংশ এবং প্রাকৃতিক প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা। বিশেষ করে সমুদ্রের ঢেউ ও ঝড়ের প্রভাব কমাতে বালিয়াড়ি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।

অথচ কক্সবাজার সমুদ্রসৈকতের ভাঙন রোধ এবং পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্য সুরক্ষায় কয়েক বছর আগে এই বালিয়াড়িই কৃত্রিমভাবে গড়ে তোলা হয়েছিল। ২০২২ সালে যুক্তরাষ্ট্রের অর্থায়নে একটি বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা প্রাকৃতিক সুরক্ষা ব্যবস্থা হিসেবে সৈকতের নির্দিষ্ট অংশে বালুর স্তুপ সৃষ্টি করে সেখানে সাগরলতা রোপণ করে।

এখন সেই সুরক্ষা ব্যবস্থার পাশেই সড়ক নির্মাণের নামে বালিয়াড়ি কেটে ও ভরাট করে ফেলা হচ্ছে।

সড়ক নির্মাণকারী প্রতিষ্ঠান এনডিইর প্রকল্প ব্যবস্থাপক মোহাম্মদ শাহীন মিয়া বলেন, কক্সবাজার পৌরসভার অর্থায়নে সড়কটির নির্মাণকাজ চলছে। নির্মাণের আগে পরিবেশ অধিদপ্তরের ছাড়পত্র নেওয়া হয়েছে কি না, সে বিষয়ে পৌরসভা বলতে পারবে।

কক্সবাজার পৌরসভার সহকারী প্রকৌশলী রুমেল বড়ুয়া বলেন, সমুদ্রসৈকতের সৌন্দর্যবর্ধন, ভাঙনকবলিত এলাকা রক্ষা এবং পর্যটকদের সুবিধার্থে সড়কটি নির্মাণ করা হচ্ছে।

তবে পরিবেশ অধিদপ্তর কক্সবাজার জেলা কার্যালয়ের উপপরিচালক খন্দকার মাহমুদ পাশা বলেন, সৈকতের বালিয়াড়ি ভরাট করে সড়ক নির্মাণের বিষয়টি তাঁরা শুনেছেন। বিষয়টি সরেজমিনে পরিদর্শন করে প্রতিবেদন দিতে একজন কর্মকর্তাকে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। প্রতিবেদন পাওয়ার পর প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

তিনি বলেন, কক্সবাজার সমুদ্রসৈকত প্রতিবেশগত সংকটাপন্ন এলাকা (ইসিএ)। এ এলাকায় যেকোনো ধরনের উন্নয়নকাজ করতে পরিবেশ অধিদপ্তরের ছাড়পত্র প্রয়োজন। কিন্তু সুগন্ধা পয়েন্ট থেকে কলাতলী পয়েন্ট পর্যন্ত সড়ক নির্মাণের জন্য পরিবেশ অধিদপ্তর থেকে কোনো ছাড়পত্র নেওয়া হয়নি।

পরিবেশবিষয়ক সংগঠন ইয়ুথ এনভায়রনমেন্ট সোসাইটির (ইয়েস) চেয়ারম্যান অ্যাডভোকেট মুজিবুল হক বলেন, নেদারল্যান্ডস, যুক্তরাষ্ট্র ও নিউজিল্যান্ডসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে জলবায়ু পরিবর্তন, সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি এবং উপকূলীয় ক্ষয় মোকাবিলায় প্রাকৃতিক উপায়ে সৈকতে বালিয়াড়ি সৃষ্টি ও সংরক্ষণে কোটি কোটি টাকা ব্যয় করা হচ্ছে।

তাঁর মতে, কক্সবাজার সমুদ্রসৈকতের ভাঙন রোধ এবং পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্য রক্ষায় যুক্তরাষ্ট্রের অর্থায়নে যে বালিয়াড়ি ও সাগরলতা গড়ে তোলা হয়েছিল, সেটি এখন পাশেই বিকল্প জায়গা থাকা সত্ত্বেও সড়ক নির্মাণের নামে ধ্বংস করা হচ্ছে। বিষয়টি দাতা দেশগুলোর কাছেও নেতিবাচক বার্তা দেবে।

অ্যাডভোকেট মুজিবুল হক বলেন, “বালিয়াড়ি ধ্বংস করে উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়ন পরিবেশগতভাবে আত্মঘাতী সিদ্ধান্ত। নির্মাণকাজ দ্রুত বন্ধ করে প্রকল্পটির পরিবেশগত প্রভাব নতুন করে পর্যালোচনা করা প্রয়োজন।”

Swapno

Abu Al Moursalin Babla

Editor & Publisher

Major(Rtd)Humayan Kabir Ripon

Managing Editor

Email: [email protected]

অনুসরণ করুন