কলকাতায় আবাসিক হোটেলে অগ্নিকাণ্ড
চিকিৎসার জন্য ভারতে গিয়ে ফিরলেন লাশ হয়ে
কুষ্টিয়া প্রতিনিধি
প্রকাশ: ১৯ আগস্ট ২০২৬, ১০:৪০ পিএম
নিহত সাংবাদিক দেবাশীষ দত্ত, তার স্ত্রী ও সন্তান। ফাইল ছবি
ভারতের কলকাতার একটি আবাসিক হোটেলে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে কুষ্টিয়ার সাংবাদিক দেবাশীষ দত্তসহ পরিবারের চারজন নিহত হয়েছেন। নিহত অন্য সদস্যরা হলেন, তার স্ত্রী আফশানা শিম্মিন (২৫), তিন বছরের ছেলে শর্ণশীষ দত্ত এবং শ্বশুর আকরাম আলী (৬৪)।
বুধবার (১৯ আগস্ট) ভোরে ভারতের কলকাতার নিউমার্কেট এলাকার মির্জা গালিব স্ট্রিটের একটি আবাসিক হোটেলে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে কুষ্টিয়ার একই পরিবারের চারজনসহ মোট নয়জনের মৃত্যু হয়।
নিহত দেবাশীষের বাড়ি কুষ্টিয়া শহরের আড়ুয়াপাড়া এবং শ্বশুর আকরাম আলীর বাড়ি থানাপাড়া এলাকায়। চিকিৎসা করাতে তারা সপরিবারে ভারতের বেঙ্গালুরে গিয়েছিলেন।
একসঙ্গে পরিবারের চার সদস্যের এমন করুণ মৃত্যু শোকের মাত্রাকে আরও ভারী করে তুলেছে। একই সঙ্গে তাদের এভাবে চলে যাওয়া মেনে নিতে পারছেন না স্বজন, সহকর্মী ও শুভাকাঙ্খীরা।
জানা গেছে, গত ৩ আগস্ট স্ত্রী আফসানা শারমিন মনীষার জটিল রোগের চিকিৎসার জন্য ঢাকা থেকে ফ্লাইটে ভারতের বেঙ্গালুর যান দেবাশীষ দত্ত। সঙ্গে ছিলেন স্ত্রী, শ্বশুর আকরাম হোসেন ও ছোট ছেলে শর্ণশীষ দত্ত। সেখানে চিকিৎসা শেষে মঙ্গলবার তারা কলকাতায় ফিরে নিউমার্কেট এলাকার মির্জা গালিব স্ট্রিটের একটি হোটেলে ওঠেন তারা।
পারিবারিক সূত্র জানায়, কলকাতায় পরিবারের সদস্যদের জন্য কেনাকাটা করেন দেবাশীষ। মঙ্গলবার রাতে কুষ্টিয়ার বাড়িতে থাকা বাবা-মায়ের সঙ্গে শেষবার কথা হয় তার। সেসময় তিনি জানান, বুধবার সকালে ফ্লাইটে তারা দেশে ফিরবেন। কিন্তু ভোরে হোটেলে আগুন লাগলে মুহূর্তেই সব শেষ হয়ে যায়। ভারত যাওয়ার সময় দেবাশীষ তার আট বছরের মেয়ে মহিমা দত্তকে কুষ্টিয়ার বাড়িতে মায়ের কাছে রেখে যান, ফলে সে বেঁচে যায়।
সাংবাদিক দেবাশীষ দত্ত (৩৯) কুষ্টিয়া শহরের আড়ুয়াপাড়ার দিলীপ দত্তের ছেলে। সকালে দিলীপ দত্ত ছেলে, পুত্রবধূ ও তাদর সন্তানের মৃত্যুর খবর পান। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তিনি ছেলের (দেবাশীষ) লাশের ছবি দেখেছেন।
দিলীপ দত্ত জানান, দেবাশীষের এক ছেলে ও এক মেয়ে। মেয়ে মহিমা দত্তকে (৮) রেখে গত ৩ আগস্ট তিনি স্ত্রী ও ছেলেকে নিয়ে চিকিৎসার জন্য বেঙ্গালুরেতে যান। গত সোমবার রাত ১১টায় উড়োজাহাজে করে কলকাতায় এসে হোটেলে উঠেছিলেন তারা। বুধবার সকালে দিলীপ দত্ত জানতে পারেন যে, অগ্নিকাণ্ডে তারা সবাই মারা গেছেন।
সাংবাদিক দেবাশীষ দত্ত ও তার স্ত্রী, সন্তানের মর্মান্তিক মৃত্যুর খবরে কুষ্টিয়ার বাড়িতে নেমে এসেছে শোকের ছায়া। প্রিয়জন হারানোর বেদনায় স্বজনদের আহাজারিতে ভারী হয়ে উঠেছে পরিবেশ। বাড়িতে ভিড় করছেন সহকর্মী, আত্মীয়-স্বজন, প্রতিবেশী ও শুভাকাঙ্খীরা।
বুধবার দুপুরে সরেজমিনে দেখা যায়, দেবাশীষ দত্তের বাড়িতে শোকাহত স্বজনদের কান্নায় এক হৃদয়বিদারক পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। একমাত্র কলিজার টুকরা সন্তানকে হারিয়ে কান্নায় ভেঙে পড়ছেন মা স্বপ্না দত্ত। তাকে ঘিরেই আত্মীয়-স্বজনরা সান্তনা দেওয়ার চেষ্টা করছেন। পাশের রুমে বাবা দিলীপ দত্ত নির্বাক বসে আছেন। আরেক রুমে আট বছরের মেয়ে মহিমা দত্তকে সবাই জড়িয়ে ধরে কান্না করছেন। শিশু মহিমা কিছুই বুঝতে পারছেন না।
ছেলের এমন করুণ মৃত্যুর খবরে বিলাপ করতে করতে মা স্বপ্না দত্ত বলেন, আমি বিশ্বাস করতে পারছি না। কালকেও তো ভালো মানুষটা আমার সঙ্গে কথা বলল! এখন আমার কী হবে?
বাড়িতে আসা সহকর্মী ও শুভাকাঙ্ক্ষীরা বলেন, দেবাশীষ দত্ত শুধু একজন সাংবাদিক ছিলেন না, তিনি ছিলেন সহকর্মীদেরও আপনজন। তার সঙ্গে কাটানো সময়ের স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে অনেকেই আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন।
সাংবাদিক দেবাশীষ দত্তের আকস্মিক মৃত্যুত গভীর শোক প্রকাশ করেছে কুষ্টিয়া প্রেস ক্লাব, কুষ্টিয়া সাংবাদিক ইউনিয়নসহ বিভিন্ন সাংবাদিক সংগঠন।



