কেউ এসেছেন স্ত্রীর চিকিৎসায়, কেউ বাঁচার আশায়—সবার পাশে ‘মানবিক ডিসি’ জাহিদ
নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রকাশ: ১৯ আগস্ট ২০২৬, ০৮:৪৫ পিএম
স্ত্রীর গলায় টিউমার। অস্ত্রোপচারের জন্য প্রয়োজন প্রায় এক লাখ টাকা। কিন্তু শারীরিক অসুস্থতার কারণে কাজ করতে পারেন না কল্লোল বড়ুয়া। চিকিৎসার টাকা জোগাড়ের পথ প্রায় বন্ধ হয়ে যাওয়ায় স্ত্রীর জীবন বাঁচানোর আকুতি নিয়ে তিনি হাজির হন চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসকের গণশুনানিতে।
কল্লোলের মতো কেউ এসেছেন পক্ষাঘাতে কর্মক্ষমতা হারিয়ে, কেউ শারীরিক প্রতিবন্ধকতা নিয়ে জীবনসংগ্রাম চালিয়ে যাচ্ছেন। আবার কেউ স্বামী হারিয়ে থ্যালাসেমিয়াসহ নানা জটিল রোগের চিকিৎসা চালাতে না পেরে সাহায্য চেয়েছেন।
বুধবার (১৯ আগস্ট) চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসনের সাপ্তাহিক গণশুনানিতে এমন কয়েকজন অসহায় মানুষের কথা শোনেন জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ জাহিদুল ইসলাম। আবেদনকারীরা একে একে তুলে ধরেন অসুস্থতা, অভাব ও টিকে থাকার লড়াইয়ের কথা। জেলা প্রশাসক সবার কথা মনোযোগ দিয়ে শোনেন। পরে চিকিৎসা ও জীবনধারণের জন্য তাঁদের তাৎক্ষণিক আর্থিক সহায়তা দেন।
রাউজানের উরকিরচর ইউনিয়নের আবুরখীল গ্রামের কল্লোল বড়ুয়ার স্ত্রী সুরভী বড়ুয়ার গলায় কয়েক মাস আগে টিউমার ধরা পড়ে। চিকিৎসকেরা অস্ত্রোপচারের পরামর্শ দেন। কিন্তু সংসারে নিয়মিত আয় না থাকায় প্রয়োজনীয় অর্থ জোগাড় করতে পারেননি কল্লোল। তাঁর অসহায়ত্বের কথা শুনে স্ত্রীর চিকিৎসায় সহায়তার হাত বাড়িয়ে দেন জেলা প্রশাসক।
গণশুনানিতে এসেছিলেন রাউজানের কদলপুর গ্রামের শারীরিক প্রতিবন্ধী হাসনা হেনাও। তাঁর বাবা মোহাম্মদ হারুন অর রশিদ ২০২২ সালে মারা যান। নানা প্রতিকূলতার মধ্যেও হাসনা ২০০৮ সালে এসএসসি পাস করেন। তবে স্থায়ী কর্মসংস্থান না হওয়ায় এখন মানুষের বাড়িতে কাজ করে জীবিকা নির্বাহ করেন। সামান্য আয় দিয়ে দৈনন্দিন খরচ ও চিকিৎসার ব্যয় বহন করা তাঁর পক্ষে কঠিন। তাঁর জীবনসংগ্রামের কথা শুনেও তাৎক্ষণিক সহায়তা দেন জেলা প্রশাসক।
আনোয়ারার পড়ৈইপাড়া এলাকার ছবি দত্ত বর্তমানে নগরের মতিঝর্ণায় ভাড়া বাসায় থাকেন। শারীরিক প্রতিবন্ধকতার পাশাপাশি তাঁর স্বামীও অসুস্থ। দুজনের চিকিৎসা, ওষুধ ও সংসারের ব্যয় বহনের মতো নির্ভরযোগ্য আয়ের উৎস নেই। কোনো উপায় না পেয়ে তিনিও জেলা প্রশাসকের কাছে সহায়তা চান।
রাঙ্গুনিয়ার পারুয়া ইউনিয়নের সৈয়দনগর গ্রামের মো. রাশেদ দীর্ঘদিন ধরে পক্ষাঘাতে আক্রান্ত। বিভিন্ন হাসপাতালে চিকিৎসা নিয়েও তাঁর অবস্থার উল্লেখযোগ্য উন্নতি হয়নি। দীর্ঘ অসুস্থতায় কর্মক্ষমতা হারানো রাশেদ স্ত্রী, এক ছেলে ও এক মেয়েকে নিয়ে চরম আর্থিক সংকটে আছেন। উন্নত চিকিৎসার আশায় তিনি জেলা প্রশাসকের শরণাপন্ন হন।
উত্তর আগ্রাবাদের দিলুয়ারা আক্তার সুলতানার স্বামী ২০২৫ সালের ১০ জানুয়ারি হৃদ্রোগে মারা যান। দিলুয়ারা ডায়াবেটিস, উচ্চ রক্তচাপ ও থ্যালাসেমিয়াসহ বিভিন্ন জটিল রোগে আক্রান্ত। থ্যালাসেমিয়ার কারণে তাঁকে প্রতি তিন মাস পরপর রক্ত নিতে হয়। নিয়মিত ব্যয়বহুল ওষুধও সেবন করতে হয়। তাঁর একমাত্র সন্তান স্বল্প বেতনে চাকরি করলেও মায়ের চিকিৎসার পুরো ব্যয় বহন করতে পারছেন না। অসুস্থ শরীর নিয়ে গণশুনানিতে এসে তিনিও সাহায্যের আবেদন জানান।
প্রত্যেক আবেদনকারীর জীবনকাহিনি আলাদা হলেও তাঁদের অসহায়ত্ব ছিল একই। জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ জাহিদুল ইসলাম শুধু আবেদনপত্র দেখে তাঁদের বিদায় দেননি; ধৈর্য ধরে সবার কথা শুনে তাৎক্ষণিকভাবে পাশে দাঁড়িয়েছেন। তাই অসহায় মানুষের কাছে সাপ্তাহিক এই গণশুনানি কেবল প্রশাসনিক আনুষ্ঠানিকতা নয়—বিপদের সময় ভরসা ও আশ্রয় পাওয়ার একটি জায়গা। আর সেই আশ্রয়ের দরজা খুলে দিয়ে আবারও মানুষের পাশে দাঁড়ালেন ‘মানবিক ডিসি’ জাহিদ।



