Logo
Logo
×

সারাদেশ

তীব্র গরমে পানি-বিদ্যুৎ সংকটে নাকাল পটুয়াখালী পৌর শহরের ৮৫ হাজার মানুষ

Icon

পটুয়াখালী প্রতিনিধি

প্রকাশ: ১৫ আগস্ট ২০২৬, ১০:২৩ এএম

তীব্র গরমে পানি-বিদ্যুৎ সংকটে নাকাল পটুয়াখালী পৌর শহরের ৮৫ হাজার মানুষ

তীব্র গরমের মধ্যে ঘনঘন লোডশেডিং। এর সঙ্গে দীর্ঘদিনের তীব্র সুপেয় পানি সংকট। দুই মৌলিক সেবার সংকটে চরম দুর্ভোগে পড়েছেন পটুয়াখালী পৌর শহরের প্রায় ১৪ হাজার পরিবারের ৮৫ হাজার মানুষ। চাহিদার তুলনায় মাত্র এক-তৃতীয়াংশ পানি সরবরাহ পাওয়ায় রান্না, গোসল, খাবার পানি সংগ্রহসহ দৈনন্দিন কাজে বিপাকে পড়ছেন পৌরবাসী। সবচেয়ে বেশি ভোগান্তির শিকার হচ্ছেন নারী ও শিশুরা।

পৌরবাসীর অভিযোগ, পানি সংকটের সঙ্গে ঘনঘন বিদ্যুৎ আসা-যাওয়ায় পরিস্থিতি আরও কঠিন হয়ে উঠেছে। বিদ্যুৎ না থাকলে পানির মোটর চালানো যায় না। আবার অনেক সময় বিদ্যুৎ এলেও পানি সরবরাহ থাকে না। ফলে তীব্র গরমের মধ্যে একদিকে যেমন স্বস্তি মিলছে না, অন্যদিকে পানির জন্য বাড়তি সময় ও অর্থ ব্যয় করতে হচ্ছে তাদের। কবে নাগাদ এ সংকটের স্থায়ী সমাধান হবে, তা নিয়েও অনিশ্চয়তায় রয়েছেন বাসিন্দারা।

পটুয়াখালী পৌর শহরের ৫ নম্বর ওয়ার্ডের বাসিন্দা মিলি মল্লিক দীর্ঘদিন ধরে ওই এলাকায় বসবাস করছেন। গানের শিক্ষকতা করে সংসার চালান তিনি। তিনি বলেন, এলাকায় পানির সংকট আগে থেকেই ছিল। এখন এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে ঘনঘন লোডশেডিং। এতে প্রতিদিনের জীবনযাত্রা কঠিন হয়ে পড়েছে।

মিলি মল্লিক বলেন, জল ঠিকমতো পাই না। চাহিদার তুলনায় খুবই কম জল আসে। রান্না, গোসল, খাবার জল সবকিছুর জন্যই কষ্ট করতে হয়। অনেক সময় জল আসার অপেক্ষায় থাকতে হয়। এর মধ্যে আবার বিদ্যুৎ থাকে না। বিদ্যুৎ না থাকলে জল আসে না। যদিওবা কখনো আসে, ফোঁটা ফোঁটা পড়ে। সব মিলিয়ে আমাদের ভোগান্তির শেষ নেই।

পৌরসভার পানি শাখার তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে তাদের আওতায় ৯ হাজার ৩২০ জন গ্রাহক রয়েছেন। পৌর কর্তৃপক্ষের হিসাবে, শহরে প্রায় ১৪ হাজার পরিবারের বসবাস। এসব পরিবারের পানির চাহিদা পূরণে নিয়মিত পানি সরবরাহ করতে হয়। কিন্তু চাহিদার তুলনায় সরবরাহ অনেক কম হওয়ায় সংকট তৈরি হয়েছে।

পৌরবাসী জানান, দিনের পর দিন পর্যাপ্ত পানি না পাওয়ায় অনেক পরিবারকে বাইরে থেকে পানি সংগ্রহ করতে হচ্ছে। কেউ দূরের নলকূপ, আবার কেউ অন্য উৎস থেকে পানি এনে দৈনন্দিন প্রয়োজন মেটাচ্ছেন। এতে সময়ের পাশাপাশি বাড়ছে বাড়তি খরচও। সবচেয়ে বেশি বিপাকে পড়ছেন নিম্নআয়ের পরিবারের সদস্যরা।

পানি সংকটের পাশাপাশি বিদ্যুৎ পরিস্থিতিও তাদের দুর্ভোগ বাড়িয়ে দিয়েছে। স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, দিনে ও রাতে একাধিকবার বিদ্যুৎ চলে যাচ্ছে। কখনো স্বল্প সময়ের ব্যবধানে বিদ্যুৎ আসা-যাওয়া করছে। এতে তীব্র গরমে ঘরে থাকা কঠিন হয়ে পড়ছে। বিশেষ করে শিশু ও বয়স্কদের নিয়ে বিপাকে পড়ছেন পরিবারের সদস্যরা।

ঘনঘন বিদ্যুৎ আসা-যাওয়ার কারণে ফ্রিজ, টেলিভিশন, পানির মোটরসহ বিভিন্ন বৈদ্যুতিক যন্ত্রপাতি নষ্ট হওয়ার আশঙ্কাও করছেন পৌরবাসী। অনেকের বাড়িতে ইতিমধ্যে বৈদ্যুতিক সরঞ্জামে সমস্যা দেখা দিয়েছে বলে অভিযোগ তাদের।

পৌর শহরের ৩ নম্বর ওয়ার্ডের বাসিন্দা মানিক হোসেন বলেন, গরমের মধ্যে ঘণ্টার পর ঘণ্টা বিদ্যুৎ থাকে না। বাসায় ছোট বাচ্চা ও বয়স্ক মানুষ আছে। তাদের নিয়ে খুব কষ্টে থাকতে হচ্ছে। আবার বিদ্যুৎ এলেও বেশিক্ষণ থাকে না। এভাবে বিদ্যুৎ আসা-যাওয়া করলে যন্ত্রপাতি নষ্ট হওয়ার ভয় থাকে। ওয়ার্কশপ আছে, ঠিকমতো বিদ্যুৎ না পাওয়ায় কাজ করতে পারছি না। নিচতলায় কোনো রকম পানি পাওয়া গেলেও আমাদের দ্বিতীয় তলা কিংবা তৃতীয় তলায় পানি একেবারেই ওঠে না। খুব কষ্টে আছি।

মামুন নামে আরেক বাসিন্দা বলেন, পানি নেই, বিদ্যুৎও ঠিকমতো নেই। পানির মোটর চালাতে বিদ্যুৎ দরকার। কিন্তু যখন পানি আসে, তখন অনেক সময় বিদ্যুৎ থাকে না। আবার বিদ্যুৎ এলেও পানি সরবরাহ থাকে না। ফলে দুই দিক থেকেই ভোগান্তিতে পড়তে হচ্ছে।

৫ নম্বর ওয়ার্ডের বাসিন্দা মানষ বিশ্বাস বলেন, সংসারের সব কাজ পানির ওপর নির্ভরশীল। পানি না থাকলে রান্না করা যায় না, গোসল করা যায় না, এমনকি খাবার পানির জন্যও কষ্ট করতে হয়। বাইরে থেকে পানি কিনে বা সংগ্রহ করে আনতে হচ্ছে। এতে সংসারের খরচও বেড়ে যাচ্ছে।

পৌর শহরের ভোটার সংখ্যা প্রায় ৫১ হাজার। তবে পৌর কর্তৃপক্ষের হিসাবে, পুরো শহরে প্রায় ১৪ হাজার পরিবারের মানুষ বসবাস করছেন। বিপুল এই জনগোষ্ঠীর পানির চাহিদা পূরণ করতে গিয়ে হিমশিম খেতে হচ্ছে পৌরসভার সংশ্লিষ্ট শাখাকে।

পটুয়াখালী পৌরসভার নির্বাহী প্রকৌশলী মো. জসীম উদ্দীন বলেন, পানির চাহিদার তুলনায় বর্তমানে সরবরাহে কিছুটা ঘাটতি রয়েছে। এ কারণে পৌরবাসীকে সমস্যায় পড়তে হচ্ছে। সংকট নিরসনে পৌরসভা কাজ করছে। পানির উৎপাদন ও সরবরাহ বাড়ানোর জন্য প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নেয়া হচ্ছে। ধীরে ধীরে পরিস্থিতির উন্নতি হবে বলে আশা করছেন তিনি।

এদিকে বিদ্যুৎ বিভাগের কর্মকর্তারা বলছেন, চাহিদার তুলনায় বিদ্যুৎ সরবরাহে ঘাটতি থাকায় লোডশেডিং করতে হচ্ছে। বিদ্যুৎ সরবরাহ স্বাভাবিক রাখতে নানা পদক্ষেপ নেয়া হচ্ছে।

পটুয়াখালী পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির জেনারেল ম্যানেজার আবুল কাশেম বলেন, বিদ্যুতের চাহিদার তুলনায় সরবরাহে ঘাটতি থাকায় কিছুটা লোডশেডিং হচ্ছে। পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখার চেষ্টা চলছে। গ্রাহকদের চাহিদা অনুযায়ী বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করতে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের সঙ্গে সমন্বয় করে কাজ চলছে।

পৌরবাসীর অভিযোগ, পানি ও বিদ্যুৎ এই দুই মৌলিক সেবার সংকট দীর্ঘায়িত হওয়ায় তাদের জীবনযাত্রা ক্রমেই কঠিন হয়ে উঠছে। তীব্র গরমে বিদ্যুৎ না থাকা যেমন অসহনীয় হয়ে উঠেছে, তেমনি পর্যাপ্ত পানি না থাকায় প্রতিদিনের প্রয়োজনীয় কাজও ব্যাহত হচ্ছে। এর সঙ্গে বিদ্যুৎ বিল বাড়ার অভিযোগও রয়েছে অনেকের। ফলে সব মিলিয়ে পরিস্থিতি তাদের কাছে ‘মরার ওপর খাঁড়ার ঘা’ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

স্থানীয় বাসিন্দারা বলছেন, সাময়িক উদ্যোগ নয়, পানি ও বিদ্যুৎ সংকটের স্থায়ী সমাধান প্রয়োজন। বিশেষ করে পানির উৎপাদন ও সংরক্ষণ সক্ষমতা বাড়ানোর পাশাপাশি নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করা জরুরি। দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া না হলে আগামী দিনগুলোতে জনদুর্ভোগ আরও বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা করছেন তারা।

পৌরবাসীর প্রত্যাশা, সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ দ্রুত সমন্বিত উদ্যোগ নিয়ে পানি ও বিদ্যুৎ এই দুই সংকটের স্থায়ী সমাধান করবে। এতে পটুয়াখালী পৌর শহরের হাজারো পরিবারের স্বাভাবিক জীবনযাত্রা ফিরে আসবে।

Swapno

Abu Al Moursalin Babla

Editor & Publisher

Major(Rtd)Humayan Kabir Ripon

Managing Editor

Email: [email protected]

অনুসরণ করুন