অপহরণে ৩ দিন পর ৫ লাখ টাকা মুক্তিপণে ফিরেছেন টেকনাফের দর্জি
কক্সবাজার প্রতিনিধি
প্রকাশ: ০৯ আগস্ট ২০২৬, ০৭:০১ পিএম
কক্সবাজারের টেকনাফে অপহরণের ৩ দিন পর দাবি করা ৫ লাখ টাকা মুক্তিপণের টাকা পরিশোধ করে ফিরেছেন হ্নীলা বাজারের দর্জি দোকানদার মোস্তাক আহমদ (৩১)।
শনিবার (৮ আগস্ট) রাতে বাহারছড়ার একটি পাহাড়ি এলাকায় তাকে ছেড়ে দেওয়া হয়।
মোস্তাক টেকনাফ উপজেলার হ্নীলা ইউনিয়নের পূর্ব পানখালী ৪ নম্বর ওয়ার্ড এলাকার মৃত আব্দুস শুক্কুরের ছেলে। হ্নীলা বাজারে তাঁর একটি দর্জির দোকান রয়েছে।
মোস্তাক স্ত্রী হোসনে আরা বেগম মুক্তিপণের টাকা পরিশোধের কথা স্বীকার করেছেন। তিনি বলেছেন, মুক্তিপণের টাকা নিয়ে মোস্তাকের বোন জামাইকে বাহারছড়ার পাহাড়ি এলাকায় যেতে বলা হয়। অপহরণকারীদের নির্দেশ অনুযায়ী নির্দিষ্ট স্থানে ৫ লাখ টাকা রেখে আসার পর তারা টাকা নিয়ে সেখান থেকে সরে যায়। পরে অন্য একটি জায়গায় মোস্তাককে ছেড়ে দেওয়া হয়। তাঁকে শারীরিক ভাবে নির্যাতন চালানো হয়েছে। কথা বলতে পারছেন না।
তিনি জানান, গত ৫ আগস্ট বিকেল ২ টায় হ্নীলা কাঁচা বাজার থেকে মোস্তাক নিখোঁজ হন। ওই দিন রাত সাড়ে ৯টার দিকে মোস্তাকের পরিবারের কাছে ফোন আসে। অপর প্রান্ত থেকে জানানো হয়, তাঁকে অপহরণ করা হয়েছে। এরপর একের পর এক ফোন আসে। কখনো ৫০ লাখ, কখনো ১০ লাখ টাকা দাবি করা হয়। শেষ পর্যন্ত ৫ লাখ টাকায় রাজি হয় অপহরণকারীরা।
অপহরণকারীদের সঙ্গে পরিবারের সদস্যদের কথোপকথনের একটি অডিও রেকর্ড পাওয়া গেছে।
ওই ফোনালাপে হোসনে আরা বেগম কান্নাজড়িত কণ্ঠে অপহরণকারীদের অনুরোধ করেন, তাঁর স্বামীকে যেন মারধর বা হত্যা করা না হয়। তিনি বলেন, আল্লাহর ওয়াস্তে আমার স্বামীকে মারবেন না। আমি টাকা জোগাড় করে দিচ্ছি। জবাবে অপহরণকারীরা হুমকি দিয়ে জানায়, ৫০ লাখ টাকা না দিলে মুসতাককে হত্যা করা হবে। এমনকি তারা দাবি করে, মুসতাককে হত্যার জন্য একজন তাদের ৩০ লাখ টাকা দেওয়ার কথা বলেছে। স্বামীকে বাঁচাতে অসহায় স্ত্রী তখন বলেন, আমি যতটুকু পারি টাকা জোগাড় করার চেষ্টা করছি। আল্লাহর ওয়াস্তে আপনারা আমার স্বামীকে মারবেন না। আমি এত টাকা কোথায় পাব? একপর্যায়ে সন্তানদের কথা উল্লেখ করে স্বামীকে ফিরিয়ে দেওয়ার আকুতি জানান তিনি।
পরে অপহরণকারীরা মোস্তাককে তাঁর স্ত্রীর সঙ্গে কথা বলার সুযোগ দেয়। তখন মোস্তাক দ্রুত টাকা জোগাড় করে দিতে স্ত্রীকে অনুরোধ করেন। তিনি জানান, তাঁকে হত্যার জন্য ৩০ লাখ টাকা দেওয়ার কথা বলা হয়েছে এবং টাকা না দিলে তাঁকে মেরে ফেলা হবে। স্বামীকে জীবিত ফিরে পেতে মোস্তাক স্ত্রীকে প্রয়োজনে গহনা বিক্রি করে হলেও টাকা জোগাড় করার কথা বলেন তিনি। এদিকে অপহরণকারীরা হুমকি দেয়, বিষয়টি কাউকে জানানো হলে মুসতাককে হত্যা করা হবে। স্বামীকে বাঁচানোর আশায় তাঁর স্ত্রী তখন বারবার অনুরোধ করেন, আমি কাউকে বলব না। আল্লাহর ওয়াস্তে আমার স্বামীকে মারবেন না। শেষ পর্যন্ত নির্ধারিত সময়ের মধ্যে ৫ লাখ টাকা দেওয়ার পর মুসতাককে ছেড়ে দেওয়া হয়। তিন দিনের উৎকণ্ঠা, ভয় আর অনিশ্চয়তার পর পরিবারের কাছে ফিরে আসেন তিনি।
মোস্তাকের মা হাছান বানু বলেন, ছেলেকে অপহরণের পর আমরা খুব আতঙ্কের মধ্যে ছিলাম। অপহরণকারীরা বিভিন্ন সময় বিভিন্ন অঙ্কের টাকা দাবি করেছে। শেষ পর্যন্ত ৫ লাখ টাকা দেওয়ার পর আমার ছেলে বাড়িতে ফিরেছে।
মোস্তাক নিখোঁজ হওয়ার পর তাঁর শাশুড়ি নুর নাহার গত ৫ আগস্ট টেকনাফ মডেল থানায় একটি সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করেন। জিডিতে উল্লেখ করা হয়, হ্নীলা কাঁচাবাজার থেকে মোস্তাক আহমদ নিখোঁজ হয়েছেন।
টেকনাফ মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. সাইফুল ইসলাম বলেন, মোস্তাক নামে এক ব্যক্তি নিখোঁজ হওয়ার ঘটনায় থানায় একটি সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করা হয়েছে। শনিবার তিনি অপহরণকারীদের কাছ থেকে ফিরে এসেছেন এমন কোনো তথ্য তাঁর জানা নেই বলেও জানান ওসি। মোস্তাককে কে বা কারা অপহরণ করেছে কি না, বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে খতিয়ে দেখা হচ্ছে। একই সঙ্গে তাঁর নিখোঁজ হওয়ার প্রকৃত কারণ উদঘাটনে পুলিশ তদন্ত চালিয়ে যাচ্ছে।
টেকনাফের পাহাড় কেন্দ্রিক গত এক বছরে অন্তত আড়াই ব্যক্তিকে অপহরণ করা হয়েছে। যারা সকলেই মুক্তিপণের টাকা দিয়ে ফিরেছেন।



