নিতাইগঞ্জের আটা-ময়দা শিল্প রক্ষায় সরকারের সহযোগিতা চান মোহাম্মদ সোহাগ
নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রকাশ: ০৮ আগস্ট ২০২৬, ০৫:৫৫ পিএম
নারায়ণগঞ্জ আটা-ময়দা মিল মালিক সমিতির নবনির্বাচিত ত্রি-বার্ষিক কার্যকরী কমিটির অভিষেক ও সম্মাননা অনুষ্ঠান অনুষ্ঠিত হয়েছে। শনিবার (৮ আগস্ট) দুপুরে নগরীর নিতাইগঞ্জের পায়রা কনভেনশন সেন্টারে এ অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়।
অনুষ্ঠানে নবনির্বাচিত সভাপতি আলহাজ মোহাম্মদ সোহাগ ও সাধারণ সম্পাদক ইকবাল আলীকে ফুল ও সম্মাননা ক্রেস্ট দিয়ে বরণ করে নেন সদ্য বিদায়ী সভাপতি আলহাজ মোহাম্মদ জসীমউদ্দীন মৃধা, সাধারণ সম্পাদক আব্দুল মতিন মন্টুসহ বিদায়ী কমিটির নেতৃবৃন্দ। একইসঙ্গে বিদায়ী কমিটির সদস্যদেরও ফুল ও ক্রেস্ট দিয়ে সম্মাননা জানানো হয়।
অনুষ্ঠানে নবনির্বাচিত সভাপতির বক্তব্যে আলহাজ মোহাম্মদ সোহাগ বলেন, নারায়ণগঞ্জ আটা-ময়দা মিল মালিক সমিতি একটি প্রাচীন ও ঐতিহ্যবাহী সংগঠন। স্বাধীনতার পর থেকে মানুষের নিত্যপ্রয়োজনীয় খাদ্যপণ্যের চাহিদা পূরণে নিতাইগঞ্জের আটা-ময়দা মিলগুলো গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে আসছে।
তিনি বলেন, নিতাইগঞ্জের অল্প পরিসরের একটি এলাকায় দীর্ঘদিন ধরে বিপুলসংখ্যক আটা-ময়দার মিল গড়ে উঠেছে। বর্তমানে আধুনিক প্রযুক্তি ও স্বয়ংক্রিয় ব্যবস্থায় এসব মিলে আটা-ময়দা উৎপাদন করা হচ্ছে। দেশের আটা-ময়দার চাহিদা পূরণেও নারায়ণগঞ্জের মিলগুলো গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখছে।
মোহাম্মদ সোহাগ বলেন, “নিতাইগঞ্জের আটা-ময়দার একটি দীর্ঘ ঐতিহ্য রয়েছে। সারা বাংলাদেশে নারায়ণগঞ্জের আটা-ময়দার পরিচিতি রয়েছে। এই শিল্প শুধু আলহাজ সঙ্গে জড়িত নয়, দেশের খাদ্য সরবরাহ ব্যবস্থার সঙ্গেও সরাসরি সম্পৃক্ত।”
নিতাইগঞ্জকে পরিকল্পিত করার আহ্বান
নিতাইগঞ্জে অপরিকল্পিতভাবে গড়ে ওঠা শিল্প ও নগরায়ণের কারণে সৃষ্ট যানজট ও লোড-আনলোড সমস্যার কথা তুলে ধরে তিনি সরকারের সহযোগিতা কামনা করেন।
তিনি বলেন, নিতাইগঞ্জে আটা-ময়দা মিল মালিক ও গম আড়তদারদের পণ্য লোড-আনলোডের জন্য পর্যাপ্ত নির্দিষ্ট জায়গা নেই। ফলে দিনের বেলা ট্রাক লোড-আনলোড করতে গিয়ে রাস্তায় যানজট সৃষ্টি হয় এবং ব্যবসায়ীদের নানা সমস্যার মুখোমুখি হতে হয়।
মোহাম্মদ সোহাগ বলেন, বিসিকের মতো পরিকল্পিত কোনো জায়গায় আমাদের জন্য প্লটের ব্যবস্থা করা হলে আমরা সরকারকে নির্ধারিত ইজারা ও অন্যান্য অর্থ পরিশোধ করে তা ব্যবহার করতে চাই। এতে নিতাইগঞ্জের যানজট কমবে এবং ব্যবসায়ীরাও সুশৃঙ্খলভাবে ব্যবসা পরিচালনা করতে পারবেন।
তিনি নিতাইগঞ্জের শিল্প ও ব্যবসা-বাণিজ্যের উন্নয়নে সরকারের সংশ্লিষ্ট সব দপ্তরের সমন্বিত সহযোগিতা কামনা করেন। এ ক্ষেত্রে নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশন, জেলা পুলিশ, জেলা প্রশাসন, জেলা পরিষদ, নারায়ণগঞ্জ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ ও নারায়ণগঞ্জ চেম্বার অব কমার্সসহ সংশ্লিষ্ট অংশীজনদের এগিয়ে আসার আহ্বান জানান।
ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পের জন্য নীতিমালা চাইলেন
আটা-ময়দা মিলগুলো বড় করপোরেট প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে প্রতিযোগিতায় বিভিন্ন সমস্যার সম্মুখীন হচ্ছে উল্লেখ করে আলহাজ মোহাম্মদ সোহাগ বলেন, সরকারকে ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পের জন্য কার্যকর নীতিমালা গ্রহণ করতে হবে।
তিনি বলেন, “আমরা সরকারকে অনেক রাজস্ব ও কর দিই। কিন্তু বড় করপোরেট প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে প্রতিযোগিতা করতে গিয়ে নানা নীতিগত কারণে আমরা পিছিয়ে পড়ি। তাই ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পকে টিকিয়ে রাখতে সরকারের বিশেষ নীতিগত সহায়তা প্রয়োজন।”
তিনি আরও বলেন, আটা-ময়দা শিল্প দেশের মানুষের দৈনন্দিন খাদ্য চাহিদা পূরণে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। রুটি, বিস্কুট, বেকারিসহ বিভিন্ন খাদ্যপণ্য তৈরিতে আটা-ময়দার ব্যাপক ব্যবহার রয়েছে। একইসঙ্গে এ শিল্পের সঙ্গে বিপুলসংখ্যক শ্রমিক, পরিবহন ও অন্যান্য সংশ্লিষ্ট ব্যবসা জড়িত।
সরকারের ওএমএস কার্যক্রমে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা
মোহাম্মদ সোহাগ জানান, নারায়ণগঞ্জের প্রায় ৭০টি আটা-ময়দা মিল সরকারের ওপেন মার্কেট সেল (ওএমএস) কার্যক্রমে আটা সরবরাহের সঙ্গে যুক্ত রয়েছে। নারায়ণগঞ্জসহ ঢাকা মহানগর, নরসিংদী ও গাজীপুরসহ বিভিন্ন এলাকায় এ কার্যক্রমে আটা সরবরাহ করা হচ্ছে।
তিনি বলেন, দেশের খাদ্য সরবরাহ ব্যবস্থা স্বাভাবিক রাখা এবং সরকারের বিভিন্ন খাদ্য কর্মসূচি বাস্তবায়নে নারায়ণগঞ্জের আটা-ময়দা মিলগুলো গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে।
বাজার স্থিতিশীল রাখতে প্রশাসনের হস্তক্ষেপ দাবি
বাজারে কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি ও অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধির অপচেষ্টা রোধে প্রশাসনের দৃষ্টি আকর্ষণ করেন তিনি।
মোহাম্মদ সোহাগ বলেন, দেশে গমের কোনো প্রকৃত সংকট না থাকলেও কিছু অসাধু ব্যবসায়ী বাজার অস্থিতিশীল করার চেষ্টা করছে। গম মজুত করে কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি বা অস্বাভাবিক দাম বাড়ানোর কোনো অপচেষ্টা থাকলে সংশ্লিষ্ট আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও প্রশাসনকে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়ার আহ্বান জানান তিনি।
একইসঙ্গে নিতাইগঞ্জের বাজারে নিম্নমানের ভুসি বা ভেজাল পণ্য বাজারজাত বন্ধে প্রশাসনের কঠোর নজরদারি দাবি করেন তিনি।
ব্র্যান্ড ও ট্রেডমার্ক ব্যবহারে সতর্কবার্তা
আটা-ময়দা মিল মালিকদের সততার সঙ্গে ব্যবসা পরিচালনার আহ্বান জানিয়ে নবনির্বাচিত সভাপতি বলেন, প্রতিটি মিলের নিজস্ব ব্র্যান্ড ও ট্রেডমার্ক রয়েছে। কোনো প্রতিষ্ঠানের ব্র্যান্ড বা ট্রেডমার্ক অবৈধভাবে ব্যবহার করে নিম্নমানের পণ্য বাজারজাত করা হলে সংগঠনের পক্ষ থেকে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
তিনি বলেন, “এখন আর অনিয়ম করার সুযোগ নেই। যে যার নিজস্ব ব্র্যান্ড ও ট্রেডমার্ক ব্যবহার করবেন। কোনো ধরনের অনিয়ম বা ভেজাল পণ্য বাজারজাতের প্রমাণ পাওয়া গেলে প্রয়োজনে বিএসটিআইকে জানানো হবে।”
তিনি ব্যবসায়ীদের হালাল, সৎ ও নিয়মতান্ত্রিকভাবে ব্যবসা পরিচালনার আহ্বান জানান।
‘ঐক্য ছাড়া সাফল্য কঠিন’-ইকবাল আলী
অনুষ্ঠানে নবনির্বাচিত সাধারণ সম্পাদক ইকবাল আলী বলেন, নারায়ণগঞ্জ আটা-ময়দা মিল মালিক সমিতি দীর্ঘদিনের একটি ঐতিহ্যবাহী সংগঠন। সংগঠনটি ব্যবসায়ীদের বিভিন্ন সমস্যা সমাধান, সরকারি দপ্তরের সঙ্গে সমন্বয় এবং নিতাইগঞ্জের ব্যবসা-বাণিজ্যের পরিবেশ উন্নয়নে কাজ করে আসছে।
তিনি বলেন, যেকোনো সাফল্য অর্জনের জন্য ঐক্য অত্যন্ত জরুরি। ঐক্য ছাড়া কোনো সংগঠনকে সামনে এগিয়ে নেওয়া কঠিন।
সংগঠনের নিষ্ক্রিয় সদস্যদের সক্রিয় হওয়ার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, যারা এখনো সমিতির সদস্য হননি, নতুন মিল মালিকদেরও সংগঠনের সদস্য হয়ে ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করা উচিত।
করোনাকালীন সময়ে নিতাইগঞ্জের ব্যবসায়ীদের ভূমিকার কথা তুলে ধরে ইকবাল আলী বলেন, জীবনের ঝুঁকি নিয়ে মিল মালিক ও অন্যান্য ব্যবসায়ীরা ব্যবসা প্রতিষ্ঠান চালু রেখেছিলেন। এর ফলে দেশের খাদ্য সরবরাহ ব্যবস্থা স্বাভাবিক রাখা সম্ভব হয়েছিল।
তিনি বলেন, নিতাইগঞ্জ দেশের অন্যতম বৃহৎ খাদ্যপণ্যের বাজার। এই বাজার সচল থাকার কারণে সারাদেশের খাদ্য সরবরাহ ব্যবস্থাও সচল ছিল। ভবিষ্যতেও ব্যবসায়ীদের স্বার্থ রক্ষার পাশাপাশি সামাজিক দায়বদ্ধতা থেকে মানুষের পাশে থাকার প্রত্যয় ব্যক্ত করেন তিনি।
নিতাইগঞ্জের ঐতিহ্যবাহী শিল্পকে পুনরুজ্জীবিত করার আহ্বান জানিয়ে ইকবাল আলী বলেন, নানা কারণে অনেক মিল বন্ধ হয়ে গেছে বা সংকটে পড়েছে। এই শিল্পকে আবার চাঙ্গা করতে ব্যবসায়ী, শ্রমিক, সাংবাদিক, রাজনীতিবিদসহ সমাজের সব শ্রেণি-পেশার মানুষের সহযোগিতা প্রয়োজন।
তিনি বলেন, “ব্যবসায়ী ও শ্রমিক কেউ কারও প্রতিপক্ষ নন। আমরা পরস্পরের পরিপূরক। ব্যবসা ভালো হলে মালিক, শ্রমিক ও সংশ্লিষ্ট সবাই উপকৃত হন। তাই সবাইকে একসঙ্গে কাজ করতে হবে।”
অনুষ্ঠানে আরও বক্তব্য দেন সদ্য বিদায়ী সভাপতি আলহাজ মোহাম্মদ জসীমউদ্দীন মৃধা, সাধারণ সম্পাদক আব্দুল মতিন মন্টুসহ সংগঠনের অন্যান্য নেতৃবৃন্দ।
অনুষ্ঠানে আটা-ময়দা মিল মালিক, ব্যবসায়ী, শ্রমিক নেতা, ট্রাক মালিক সমিতির নেতৃবৃন্দ, সাংবাদিকসহ বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার অতিথিরা উপস্থিত ছিলেন।
শেষে নবনির্বাচিত কমিটির পক্ষ থেকে অতিথিদের সম্মানে মধ্যাহ্নভোজের আয়োজন করা হয়। পরে দোয়া ও মোনাজাতের মাধ্যমে অনুষ্ঠানের সমাপ্তি ঘটে।



