শেরপুরে ২০ লাখ টাকা আত্মসাতের অভিযোগ অস্বীকার সাব-রেজিস্ট্রারের
শেরপুর (বগুড়া) প্রতিবেদক
প্রকাশ: ০১ আগস্ট ২০২৬, ০৬:০০ পিএম
বগুড়ার শেরপুর সাব-রেজিস্ট্রি অফিসে একটি জমির পে-অর্ডার অবমুক্তিকে কেন্দ্র করে ২০ লাখ ১৪ হাজার টাকা আত্মসাতের অভিযোগ অস্বীকার করেছেন খণ্ডকালীন সাব-রেজিস্ট্রার নাঈমা সিদ্দিকা। তাঁর দাবি, পে-অর্ডার অবমুক্তির পুরো প্রক্রিয়া সরকারি বিধি, প্রচলিত আইন ও ব্যাংকিং নিয়ম অনুসরণ করেই সম্পন্ন হয়েছে। ব্যক্তিগতভাবে তাঁর কোনো অর্থ অবমুক্ত বা পরিশোধ করার ক্ষমতা নেই; ব্যাংক নিজস্ব বিধি অনুযায়ী অর্থ পরিশোধ করে থাকে।
সাব-রেজিস্ট্রি অফিস সূত্রে জানা যায়, বর্তমানে সরকারি কোডে ই-চালানের মাধ্যমে জমা হওয়া অর্থ সরাসরি ব্যাংক থেকে ফেরত নেওয়ার সুযোগ নেই। কোনো কারণে দলিল নিবন্ধন সম্পন্ন না হলে সংশ্লিষ্ট সাব-রেজিস্ট্রারের কাছে আবেদন করতে হয়। যাচাই-বাছাই শেষে তাঁর প্রত্যয়নের ভিত্তিতে আবেদন জেলা রেজিস্ট্রারের মাধ্যমে ট্রেজারি বা হিসাবরক্ষণ কার্যালয়ে পাঠানো হয়। সরকারি অনুমোদনের পরই কেবল রিফান্ডের অর্থ ফেরত দেওয়া হয়।
জানা গেছে, উপজেলার শাহবন্দেগী ইউনিয়নের খন্দকারটোলা মৌজার ৩২৮ শতক জমি কেনাবেচাকে কেন্দ্র করে কয়েকজন ক্রেতার মধ্যে দীর্ঘদিন ধরে বিরোধ চলে আসছে। এ বিরোধের জেরে গত ২২ জুলাই শেরপুর সাব-রেজিস্ট্রি অফিসে উভয় পক্ষকে তদন্তের জন্য ডাকা হয়।
এর আগে একই জমির নিবন্ধনকে কেন্দ্র করে পে-অর্ডার অবমুক্তিতে অনিয়ম এবং ২০ লাখ ১৪ হাজার টাকা আত্মসাতের অভিযোগ এনে খণ্ডকালীন সাব-রেজিস্ট্রার নাঈমা সিদ্দিকার বিরুদ্ধে লিখিত অভিযোগ করেন ক্রেতা সাদিকা খানম।
অভিযোগে উল্লেখ করা হয়, ২০২৫ সালের ২৭ নভেম্বর ৩২৮ শতক জমি নিবন্ধনের জন্য ৪২ লাখ ৫০ হাজার টাকার আটটি পে-অর্ডার জমা দেওয়া হয়েছিল। তবে আইনি জটিলতার কারণে সেদিন দলিল নিবন্ধন সম্পন্ন হয়নি। পরে ২০২৬ সালের ১০ ফেব্রুয়ারি ৬ লাখ ৭১ হাজার টাকার একটি এবং ৭ মে প্রায় ১৩ লাখ ৪৩ হাজার টাকার আরেকটি পে-অর্ডার অবমুক্ত করা হয়। পরবর্তীতে ক্রেতার আমমোক্তার মো. নূর আলম শাকিল অবশিষ্ট পে-অর্ডার নগদায়ন বন্ধ রাখতে সাব-রেজিস্ট্রার ও সোনালী ব্যাংক কর্তৃপক্ষের কাছে আবেদন করেন।
শেরপুর সোনালী ব্যাংক শাখার ব্যবস্থাপক মাহবুবুল আলম বলেন, সাব-রেজিস্ট্রার কার্যালয় থেকে প্রয়োজনীয় অবমুক্তির পর প্রচলিত নিয়ম অনুসরণ করে ব্যাংক দুটি পে-অর্ডারের অর্থ পরিশোধ করেছে। পরে আরও দুটি পে-অর্ডার নগদায়নের চেষ্টা হলে তা স্থগিত রাখা হয়।
অভিযোগে নাম আসা দলিল লেখকের সহকারী সামছু হোসেনও আত্মসাতের অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। শেরপুর সাব-রেজিস্ট্রি অফিসে সংশ্লিষ্টদের উপস্থিতিতে দেওয়া এক ভিডিও বক্তব্যে তিনি দাবি করেন, সমিতির সাবেক সভাপতি এস. এম. ফেরদৌস আলমের অনুরোধে তিনি সোনালী ব্যাংকে গিয়ে পে-অর্ডারে সাক্ষর করেন। পরে মাসুদ, আরিফ ও শাকিল তাঁকে ব্যাংকে নিয়ে যান। সেখানে ১৩ লাখ ৪২ হাজার ৯৫০ টাকার একটি পে-অর্ডার ভাঙিয়ে নগদ অর্থ তাঁদের হাতে তুলে দেন। এর আগে ৬ লাখ ৭১ হাজার টাকার আরেকটি পে-অর্ডারের অর্থ তানিয়া আক্তার ও জাহিদের হাতে বুঝিয়ে দেন বলেও তিনি দাবি করেন।
এ বিষয়ে আমমোক্তার মো. নূর আলম শাকিল বলেন, “কে টাকা নিয়েছে, সেটা রেজিস্ট্রি অফিস কর্তৃপক্ষ জানে। আমাকে এ ঘটনায় জড়ানো হচ্ছে। অফিস টাকা দেওয়ার আগে মূল মালিকের সঙ্গে কথা বলতে পারত, কিন্তু তা করেনি। আমি তাদের ভগ্নিপতি হওয়ায় আমাকে ভুলভাবে উপস্থাপন করে মানুষের মধ্যে বিভ্রান্তি ছড়ানোর চেষ্টা চলছে।”
তবে অভিযোগে উল্লেখ থাকা সমিতির সাবেক সভাপতি এস. এম. ফেরদৌস আলম এবং অফিসে কর্মরত জাহিদের সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাঁদের বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
এ বিষয়ে খণ্ডকালীন সাব-রেজিস্ট্রার নাঈমা সিদ্দিকা বলেন, সম্পত্তি হস্তান্তরের ক্ষেত্রে বিভিন্ন সরকারি কোডে পে-অর্ডারের মাধ্যমে সংগৃহীত অর্থ পরবর্তী কর্মদিবসে ব্যাংকে জমা দেওয়া হয়। সরকারি অর্থের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতেই পে-অর্ডার ভাঙানোর সময় সাব-রেজিস্ট্রারের প্রতিস্বাক্ষর নেওয়ার অনুরোধ করা হয়েছিল। ব্যাংক তাদের নিজস্ব বিধি অনুযায়ী অর্থ পরিশোধ করেছে।
তিনি আরও বলেন, “সরকারি অর্থ তসরুপের অভিযোগটি বর্তমানে তদন্তাধীন। একজন সরকারি কর্মচারী হিসেবে আমি তদন্তে সর্বাত্মক সহযোগিতা করছি। আমার বিরুদ্ধে আনা আত্মসাতের অভিযোগ সম্পূর্ণ মিথ্যা, ভিত্তিহীন ও উদ্দেশ্যপ্রণোদিত।”
এদিকে, অভিযোগ ও পাল্টা বক্তব্যের পর বিষয়টি নিয়ে স্থানীয়ভাবে ব্যাপক আলোচনা সৃষ্টি হয়েছে। সংশ্লিষ্টদের মতে, চলমান তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত ঘটনা উদঘাটিত হলে পে-অর্ডার অবমুক্তি ও অর্থ লেনদেন সংক্রান্ত সব প্রশ্নের স্পষ্ট জবাব মিলবে।



