নরসিংদীর প্রথম শহীদ তাহমিদের কবরে শ্রদ্ধা নিবেদন
নরসিংদী প্রতিবেদক
প্রকাশ: ১৮ জুলাই ২০২৬, ০৮:৩৯ পিএম
জুলাই গণঅভ্যুত্থানে নরসিংদীর প্রথম শহীদ তাহমিদ ভূঁইয়া (১৫)-এর দ্বিতীয় শাহাদাতবার্ষিকী উপলক্ষে তার কবরে পুষ্পস্তবক অর্পণ করে শ্রদ্ধা জানিয়েছেন বিএনপি, শহীদ তাহমিদ ভূঁইয়া মেমোরিয়াল ফাউন্ডেশন, বিভিন্ন সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠন এবং সর্বস্তরের মানুষ।
২০২৪ সালের ১৮ জুলাই কোটা সংস্কার আন্দোলন চলাকালে ঢাকা-সিলেট মহাসড়কের জেলখানা মোড় এলাকায় পুলিশের গুলিতে নিহত হন নবম শ্রেণির শিক্ষার্থী তাহমিদ।
বিএনপির যুগ্ম মহাসচিব ও নরসিংদী-১ সদর আসনের সংসদ সদস্য খায়রুল কবির খোকন বলেন, জুলাই সনদ অক্ষরে অক্ষরে বাস্তবায়ন করা হবে। জুলাই চেতনা আমরা বুকে ধারণ করি এবং সেটা বাস্তবায়ন করার জন্যে ইতোমধ্যে পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। যারা শহীদ হয়েছে তাদের পরিবারকে মাসিক ২০ হাজার টাকা বাতা দেওয়াসহ আহতদের সকল ধরনের সাহায্য সহযোগিতা রাষ্ট্রীয়ভাবে সুযোগ সুবিধা যা দেওয়ার তা দেওয়া হচ্ছে।
তিনি আর বলেন, যাদের কারণে আজকে মুক্ত বাংলাদেশ পেয়েছি, গণতান্ত্রিক পরিবেশ পেয়েছি, মত প্রকাশের স্বাধীনতা পেয়েছি, যাদের কারণে জাতীয় সংসদ নির্বাচনের মাধ্যমে একটি গণতান্ত্রিক সরকার, জনগণের সরকার প্রতিষ্ঠা হয়েছে। এই শহীদের কাছে দেশ ও জাতি এবং রাজনৈতিক দল গুলো ঋণী।
শনিবার (১৮ জুলাই) বিকেলে সদর উপজেলার চিনিশপুর ইউনিয়নের নন্দীপাড়া গ্রামে পারিবারিক কবরস্থানে জুলাই- আন্দোলনে নরসিংদীর প্রথম শহীদ তাহমিদ ভূঁইয়ার কবরে শ্রদ্ধা নিবেদন শেষে সাংবাদিকদের সঙ্গে তিনি এসব কথা বলেন।
এ সময় উপস্থিত ছিলেন জেলা পরিষদের প্রশাসক ও জেলা বিএনপির সহ-সভাপতি তোফাজ্জল হোসেন, সহ-সভাপতি ভিপি জলিল, গোলাম কবির কামাল, খবিরুল ইসলাম বাবুল, আকবর হোসেন, যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মহসিন হোসাইন বিদ্যুৎ, জেলা ছাত্রদলের সভাপতি সিদ্দিকুর রহমান নাহিদসহ জেলা ও উপজেলা পর্যায়ের নেতারা।
এদিকে, তাহমিদের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান নাছিমা কাদির মোল্লা হাইস্কুল অ্যান্ড হোমসে তার শাহাদাতবার্ষিকী উপলক্ষে আলাদা কোনো স্মরণসভার আয়োজন করা হয়নি। বিষয়টি জানতে চাইলে বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মো. ইমন হোসেন জানান, গত ১৬ জুলাই 'শহীদ দিবস' উপলক্ষে তাহমিদসহ জুলাই আন্দোলনের সকল শহীদকে স্মরণ করে বিদ্যালয়ে আলোচনা সভা, দোয়া ও রচনা প্রতিযোগিতার আয়োজন করা হয়।
পরিবার ও প্রত্যক্ষদর্শী সূত্রে জানা গেছে, ২০২৪ সালের ১৮ জুলাই কোটা সংস্কার আন্দোলনের অংশ হিসেবে ঢাকা-সিলেট মহাসড়কের জেলখানা মোড়ে শিক্ষার্থীদের বিক্ষোভে অংশ নেন তাহমিদ ভূঁইয়া ও তার সহপাঠী ইমন হোসেন। দুপুরে হাজারো শিক্ষার্থী মহাসড়ক অবরোধ করে বিক্ষোভ করছিলেন। একপর্যায়ে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সঙ্গে সংঘর্ষের ঘটনায় রাবার বুলেট ও গুলিতে শতাধিক আন্দোলনকারী আহত হন। আহতদের নরসিংদী সদর ও জেলা হাসপাতালে নেওয়া হলে নরসিংদী জেলা হাসপাতালে তাহমিদ ভূঁইয়া এবং সদর হাসপাতালে ইমন হোসেনকে চিকিৎসক মৃত ঘোষণা করেন।
তাহমিদের বাবা রফিকুল ইসলাম ভূঁইয়া বলেন, গুলিবিদ্ধ হওয়ার পর আন্দোলনকারীরা তার ছেলেকে নরসিংদী জেলা হাসপাতালের জরুরি বিভাগে নিয়ে যান। সেখানে চিকিৎসক মৃত ঘোষণা করলে আন্দোলনকারীরা স্ট্রেচারে করে মরদেহ আবার জেলখানা মোড়ে নিয়ে আসেন এবং মরদেহ সামনে রেখে বিক্ষোভ অব্যাহত রাখেন।
তিনি আরও বলেন, এ সময় আন্দোলনকারীরা স্টেডিয়ামের দিকে অগ্রসর হলে পুলিশ আবারও গুলি চালায়। প্রাণ বাঁচাতে আন্দোলনকারীরা তাহমিদের মরদেহ সড়কে রেখে স্টেডিয়ামসংলগ্ন একটি মসজিদে আশ্রয় নেন। তখন মরদেহেও আবার গুলি লাগে। আমি প্রায় ৫০ গজ দূর থেকে পুরো ঘটনাটি দেখছিলাম। কিছুই করার ছিল না। গুলির তীব্রতা কমলে শিক্ষার্থীদের সহায়তায় ছেলের মরদেহ বাড়িতে নিয়ে আসি। পরে নাছিমা কাদির মোল্লা হাইস্কুল অ্যান্ড হোমস এবং চিনিশপুর ঈদগাহ মাঠে দুটি জানাজা অনুষ্ঠিত হয়। এরপর ময়নাতদন্ত ছাড়াই সেদিন রাতেই চিনিশপুর কবরস্থানে তাহমিদকে দাফন করা হয়।
তাহমিদ ভূঁইয়া ছিলেন পল্লিচিকিৎসক রফিকুল ইসলাম ভূঁইয়া ও এক গৃহিণীর তিন সন্তানের মধ্যে জ্যেষ্ঠ। তিনি নাছিমা কাদির মোল্লা হাইস্কুল অ্যান্ড হোমসের নবম শ্রেণির শিক্ষার্থী ছিলেন। তার দুই বোনের নাম লিনাত ও সুমাইয়া।
স্থানীয়রা জানায়, জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে নরসিংদীর প্রথম শহীদ হিসেবে তাহমিদ ভূঁইয়ার নাম আজও মানুষের স্মৃতিতে গভীরভাবে জড়িয়ে রয়েছে। প্রতিবছর তার শাহাদাতবার্ষিকীতে বিভিন্ন রাজনৈতিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠন এবং সাধারণ মানুষ তার কবর জিয়ারত ও শ্রদ্ধা নিবেদনের মাধ্যমে তার আত্মত্যাগকে স্মরণ করেন।



