ইতালির প্রলোভনে লিবিয়ায় জিম্মি বহু যুবক
সালথায় মানবপাচার চক্রের বিরুদ্ধে মানববন্ধন
সাজ্জাদ হোসেন, সালথা
প্রকাশ: ১৮ জুলাই ২০২৬, ০৩:৪৭ পিএম
সালথায় মানবপাচার চক্রের বিরুদ্ধে মানববন্ধন
ইতালিতে পাঠানোর প্রলোভন দেখিয়ে ফরিদপুরের সালথা উপজেলার রামকান্তপুর ইউনিয়নের বাহিরদিয়া গ্রামের ২০ থেকে ২৫ জনের কাছ থেকে প্রায় কোটি টাকা হাতিয়ে নেওয়ার অভিযোগ উঠেছে কথিত মানবপাচারকারী চক্রের বিরুদ্ধে। ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, ইতালিতে পাঠানোর কথা বলে তাদের নেওয়া হয় লিবিয়ায়। সেখানে একটি সংঘবদ্ধ চক্রের হাতে জিম্মি হয়ে তারা শারীরিক নির্যাতন ও মুক্তিপণের দাবির শিকার হয়েছেন। এখনো কয়েকজনের কোনো সন্ধান না পাওয়ার দাবি করেছেন স্বজনরা।
এ ঘটনায় জড়িতদের গ্রেপ্তার, ভুক্তভোগীদের কাছ থেকে নেওয়া অর্থ ফেরত এবং অভিযুক্তদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবিতে মানববন্ধন করেছেন ভুক্তভোগী পরিবার ও স্থানীয় এলাকাবাসী। শুক্রবার (১৭ জুলাই) বিকেলে উপজেলার রামকান্তপুর ইউনিয়নের বাহিরদিয়া বাজার এলাকায় এ মানববন্ধন অনুষ্ঠিত হয়।
মানববন্ধনে বক্তারা অভিযোগ করেন, বাহিরদিয়া গ্রামের বাদশা মোল্লার ছেলে এনামুল মোল্লা (২৫) ইতালিতে পাঠানোর কথা বলে স্থানীয় ২০ থেকে ২৫ জনের কাছ থেকে ধাপে ধাপে বিপুল পরিমাণ অর্থ সংগ্রহ করেন। ভুক্তভোগীদের দাবি, ইতালিতে পাঠানোর প্রতিশ্রুতি দেওয়া হলেও শেষ পর্যন্ত কাউকেই সেখানে পাঠানো হয়নি।
তাদের অভিযোগ, বিদেশে পাঠানোর নামে প্রথমে তাদের লিবিয়ায় নেওয়া হয়। পরে সেখানে সংঘবদ্ধ একটি মানবপাচারকারী চক্র তাদের জিম্মি করে মুক্তিপণের নামে পরিবারের কাছ থেকে দফায় দফায় টাকা আদায় করে। টাকা দিতে দেরি হলে চালানো হয় শারীরিক নির্যাতন। এমনকি অজ্ঞাত স্থানে আটকে রেখে হত্যার হুমকি দেওয়ারও অভিযোগ করেছেন কয়েকজন ভুক্তভোগী।
মানববন্ধনে বক্তারা আরও অভিযোগ করেন, স্থানীয় ইউপি সদস্য মনজুরুল মোল্লা ওই চক্রের অন্যতম দালাল হিসেবে কাজ করেছেন। তিনি বিদেশে পাঠানোর নানা প্রলোভন দেখিয়ে সহজ-সরল মানুষের কাছ থেকে অর্থ সংগ্রহে সহযোগিতা করেছেন বলে অভিযোগ করা হয়। ভুক্তভোগী পরিবারগুলোর অভিযোগ, অভিযুক্তরা স্থানীয়ভাবে প্রভাবশালী হওয়ায় তাদের বিরুদ্ধে কথা বললেই বিভিন্ন ধরনের ভয়ভীতি ও হয়রানির শিকার হতে হচ্ছে। এ কারণে অনেকেই মুখ খুলতে সাহস পাচ্ছেন না বলেও দাবি করেন তারা।
মানববন্ধনে অংশ নেওয়া ভুক্তভোগী হুসাইন সর্দার বলেন, “ইতালিতে নেওয়ার কথা বলে আমাকে লিবিয়ার একটি অজ্ঞাত স্থানে আটকে রাখা হয়। পরে পরিবারের কাছে আরও টাকা দাবি করা হয়। টাকা না দিলে নির্যাতন করা হতো। আমি দেশে ফোন করে কান্নাকাটি করলে পরিবার টাকা পাঠায়। এরপর কোনোভাবে দেশে ফিরতে সক্ষম হই। আমি এ ঘটনার সুষ্ঠু বিচার চাই।”
আরেক ভুক্তভোগী ওসমান মোল্লা বলেন, “ইতালিতে পাঠানোর কথা বলে আমার কাছ থেকে ১৬ লাখ টাকা নেওয়া হয়। পরে লিবিয়ায় আটকে রেখে আরও ২৫ লাখ টাকা দাবি করা হয়। টাকা না দিলে হত্যা করে সাগরে ফেলে দেওয়ার হুমকি দেওয়া হয়। শেষ পর্যন্ত অতিরিক্ত টাকা দিয়ে দেশে ফিরতে হয়েছে। তবে এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন ইউপি সদস্য মনজুরুল মোল্লা। তিনি বলেন, “আমাদের বিরুদ্ধে আনা সব অভিযোগ সম্পূর্ণ মিথ্যা ও ভিত্তিহীন। গ্রাম্য বিরোধের জেরে একটি পক্ষ উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে আমাদের বিরুদ্ধে অপপ্রচার চালাচ্ছে। ভুক্তভোগীদের সঙ্গে আমাদের শুধু লিবিয়ায় পাঠানোর বিষয়ে কথা হয়েছিল। বর্তমানে তারা লিবিয়ায় চাকরি করছেন। আর আমার ছোট ভাই এনামুলের বিরুদ্ধে যে অভিযোগ আনা হয়েছে, সেটি তার ব্যক্তিগত বিষয়। তার সঙ্গে কার কী লেনদেন হয়েছে, সে বিষয়ে আমি কিছু জানি না। অভিযুক্ত এনামুল মোল্লা বর্তমানে লিবিয়ায় অবস্থান করায় তার বক্তব্য তাৎক্ষণিকভাবে নেওয়া সম্ভব হয়নি।
এ বিষয়ে নগরকান্দা সার্কেলের সহকারী পুলিশ সুপার মোহাম্মদ আল ফাহাদ বলেন, “মানবপাচারের অভিযোগগুলো গুরুত্বের সঙ্গে খতিয়ে দেখা হচ্ছে। ভুক্তভোগীরা লিখিত অভিযোগ দিলে আইন অনুযায়ী প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে। পাশাপাশি পুলিশের পক্ষ থেকে বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে সচেতনতামূলক প্রচারণা চালানো হবে, যাতে প্রতারণার শিকার হয়ে কেউ অবৈধ পথে বিদেশে যাওয়ার চেষ্টা না করেন।”
মানববন্ধন থেকে বক্তারা অভিযোগের সুষ্ঠু তদন্তের মাধ্যমে জড়িতদের দ্রুত গ্রেপ্তার, ভুক্তভোগীদের অর্থ ফেরত এবং কথিত মানবপাচারকারী চক্রের বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানান। একই সঙ্গে দাবি বাস্তবায়নে কার্যকর পদক্ষেপ না নেওয়া হলে আরও কঠোর আইনগত কর্মসূচি নেওয়ার হুঁশিয়ারি দেন তারা।
ভুক্তভোগীদের দাবি—ইতালির স্বপ্ন দেখিয়ে যারা মানুষকে লিবিয়ায় পাচার করে জিম্মি ও নির্যাতনের মুখে ঠেলে দিয়েছে, তদন্তের মাধ্যমে তাদের শনাক্ত করে আইনের আওতায় আনা হোক।



