হাঙ্গর খালের মৃত্যুই ডুবিয়েছে সাতকানিয়া-বাঁশখালী
চট্টগ্রাম প্রতিনিধি
প্রকাশ: ১৪ জুলাই ২০২৬, ১১:৩২ এএম
বান্দরবানের পাহাড়ি এলাকা থেকে উৎপত্তি হয়ে হাঙ্গর খাল বর্ষায় পাহাড়ি ঢলের বিশাল জলরাশি বয়ে আনে সমতলে। লোহাগাড়ার জঙ্গল পদুয়া, ফরিয়াদিকূল ও সাতকানিয়ার ছদাহা, কেঁওচিয়া ইউনিয়ন ঘুরে ডলু খালের সঙ্গে মিলে এই পানি সাঙ্গু নদীতে গিয়ে পড়ার কথা। কিন্তু বাস্তবে হাঙ্গর খালের শেষ অংশ এখন প্রায় অস্তিত্বহীন—কোথাও পলি জমে ভরাট, কোথাও দখল, কোথাও সংকীর্ণ নালায় পরিণত হয়েছে। ফলে পাহাড়ি পানি নদীতে পৌঁছানোর আগেই আটকে যাচ্ছে লোকালয়ে। এ কারণেই পটিয়া, আনোয়ারা, বাঁশখালী, সাতকানিয়া, লোহাগাড়া ও চন্দনাইশের বিস্তীর্ণ এলাকা বছরের পর বছর বন্যায় ডুবে যাচ্ছে।
সাতকানিয়ার ছদাহা ইউনিয়নের ১ নম্বর ওয়ার্ডের সদস্য মুজিবুর রহমান বলেছেন, খালের শেষ তিন কিলোমিটার আর খালের মতো নেই—পলি জমে নালায় পরিণত হয়েছে। উজানে স্লুইসগেট থাকলেও শুকনো মৌসুমে পানি থাকে না, বর্ষায় আবার পানি চলাচলের মতো অবস্থা নেই। দ্রুত খাল খনন না করলে প্রতি বছর এই দুর্ভোগ বাড়বে।
শুধু হাঙ্গর খাল নয়, সাতকানিয়ার কেঁওচিয়ার গড়াল খালও একসময় নৌযান চলাচলের উপযোগী ছিল, এখন তা মৃতপ্রায়। স্থানীয় বাসিন্দা এনামুল হকের ভাষ্য, ২০ বছর আগেও নৌকা চলত, এখন খালটির অস্তিত্বই নেই। তিনি মনে করেন, চট্টগ্রাম-কক্সবাজার রেললাইন দায়ী হলেও এটি একমাত্র কারণ নয়—নদী-খাল ভরাট, বড় দিঘি-পুকুর ভরাট, কৃষিজমি ভরাট করে বসতি গড়ে উঠেছে। পানি যাওয়ার স্বাভাবিক পথগুলো ধ্বংস হয়েছে।
একই অবস্থা ডলু খাল ও এর শাখা খালগুলোর। শুষ্ক মৌসুমে ডলু খালের অনেকাংশে চাষাবাদ হয়, বর্ষায় সেই খাল পাহাড়ি ঢলের পানি বহন করতে ব্যর্থ হয়। এতে সাতকানিয়া, লোহাগাড়া ও বাঁশখালীর পুরো নিষ্কাশনব্যবস্থা ভেঙে পড়েছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, দীর্ঘদিন নিয়মিত ড্রেজিং না হওয়ায় সাঙ্গু, ডলু ও অন্যান্য নদীর তলদেশে বিপুল বালি ও পলি জমেছে, নাব্যতা ও পানি ধারণক্ষমতা কমেছে। ফলে অতিবৃষ্টিতে নদী দ্রুত উপচে পড়ে এবং পানি দ্রুত নামতে পারে না। আগে বন্যার পানি দুই-এক দিনে নেমে গেলেও এবার এক সপ্তাহ পেরিয়েও সাতকানিয়া, লোহাগাড়া, চন্দনাইশ ও বাঁশখালীর বিস্তীর্ণ জনপদ ডুবে আছে—কোথাও হাঁটু, কোথাও কোমর বা বুকসমান পানি। ঘরবাড়ি, স্কুল, ফসলি জমি ও সড়ক ডুবে আছে, নৌকা ছাড়া চলাচল অসম্ভব।
সরেজমিনে দেখা গেছে, সাতকানিয়ার পশ্চিম ঢেমশা, এওচিয়া, বাজালিয়া, কেঁওচিয়া, লোহাগাড়ার পদুয়া ও চুনতি, চন্দনাইশের দোহাজারী এবং বাঁশখালীর নিম্নাঞ্চলে এখনো ঘরের ভেতর পানি। রান্নাঘর অচল, টিউবওয়েল ডুবে বিশুদ্ধ পানির সংকট। কৃষকেরা নষ্ট ফসলের ক্ষেত দেখে হতাশ।
স্থানীয়দের অভিযোগ, প্রভাবশালীরা নিজেদের স্বার্থে প্রাকৃতিক নিষ্কাশন পথ ও স্লুইসগেট বন্ধ বা সীমিত করে রেখেছেন—পাহাড়ি মিঠাপানি ঘেরে ঢুকলে মাছের ক্ষতি হয় বলে তারা পানি চলাচলে বাধা দিচ্ছেন। এতে উজানের পানি লোকালয়ে আটকে থাকে।
বিশেষজ্ঞরা বলেছেন, এখনই সাঙ্গু, ডলু ও সংশ্লিষ্ট নদীগুলোর নিয়মিত ড্রেজিং, শাখা খাল পুনঃখনন, অবৈধ দখল উচ্ছেদ, জলাশয় সংরক্ষণ, পাহাড় কাটা বন্ধ এবং রেল-সড়ক অবকাঠামোয় পর্যাপ্ত পানি চলাচলের ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে। মৎস্যঘেরের নামে পানি প্রবাহে বাধা দিলে কঠোর আইনি ব্যবস্থাও জরুরি।
পানি উন্নয়ন বোর্ডের এক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, দক্ষিণ চট্টগ্রামের পানি ব্যবস্থাপনা নতুন করে পরিকল্পনা করতে হবে—কোথায় কীভাবে পানি প্রবাহিত হয়, কোথায় বাধা, কোথায় নতুন নিষ্কাশন পথ প্রয়োজন, তা বিবেচনায় সমন্বিত হাইড্রোলজিক্যাল পরিকল্পনা জরুরি।
বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন কর্পোরেশনের (বিএডিসি) উপ-সহকারী প্রকৌশলী আজমানুর রহমান বলেছেন, প্রবাহ কমে যাওয়ায় অনেক খাল ভরাট হয়ে গেছে। তারা কিছু খাল খনন করেছেন এবং একটি নতুন প্রকল্পের আওতায় সব শাখা খাল চিহ্নিত করে পর্যায়ক্রমে খনন করা হবে। এতে খালগুলো প্রাণ ফিরে পাবে এবং বর্ষার পানি দ্রুত নিষ্কাশন সম্ভব হবে।
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূগোল ও পরিবেশবিদ্যা অধ্যাপক ড. কাজী মো. বরকত আলীর ভাষ্য, চট্টগ্রামে জোয়ার-ভাটার প্রভাব ও মানুষের কার্যক্রম দুই-ই বন্যার কারণ। এবার রেকর্ড বৃষ্টির সঙ্গে জোয়ারের পানি যোগ হয়েছে, ফলে পানি দ্রুত নামছে না। পাশাপাশি নদী, নালা, পুকুর ও প্রাকৃতিক জলাশয় ভরাট, পাহাড় কাটা ও অপরিকল্পিত উন্নয়নে প্রবাহের পথ সংকুচিত বা বন্ধ হয়ে গেছে। তিনি চট্টগ্রাম-কক্সবাজার রেললাইনকেও দায়ী করে বলেন, ব্রিজ বাড়ানো ও ছোট ব্রিজ বড় করতে হবে। এছাড়া জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে এক মাস বৃষ্টি না হলেও পরের মাসে অতিবৃষ্টি হচ্ছে, যা বন্যা ডেকে আনে।
চট্টগ্রাম পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী শওকত ইবনে সাহীদ বলেছেন, বিলীন হয়ে যাওয়া কয়েকটি বড় খাল পুনঃখননের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। প্রধানমন্ত্রীর খাল খনন কর্মসূচির প্রথম ধাপে এসব খাল অন্তর্ভুক্ত। বিএডিসিও কিছু খাল খনন করছে। দীর্ঘমেয়াদি প্রকল্প বাস্তবায়ন হলে বন্যার প্রভাব অনেকটাই কমে আসবে বলে তিনি মনে করেন।



