কুড়িগ্রাম সদর হাসপাতালে আরএমওর অনুপস্থিতিতে তলানিতে স্বাস্থ্যসেবা ও শৃঙ্খলা
কুড়িগ্রাম প্রতিনিধি
প্রকাশ: ১১ জুলাই ২০২৬, ০৭:৩৭ পিএম
কুড়িগ্রাম ২৫০ শয্যাবিশিষ্ট জেনারেল হাসপাতালের আবাসিক মেডিকেল অফিসার (আরএমও) ডা. নিসর্গ মেরাজ চৌধুরীর বিরুদ্ধে কর্মস্থলে নিয়মিত অনুপস্থিতি এবং সরকারি কর্মঘণ্টায় বেসরকারি ক্লিনিকে রোগী দেখার অভিযোগ উঠেছে।
অভিযোগকারীদের দাবি, তার এই অনিয়মের কারণে জেলার প্রধান সরকারি হাসপাতালের প্রশাসনিক কার্যক্রম দুর্বল হয়ে পড়েছে, জরুরি স্বাস্থ্যসেবা ব্যাহত হচ্ছে এবং সাধারণ রোগীরা চরম ভোগান্তির শিকার হচ্ছেন। অভিযোগ থাকা সত্ত্বেও হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের কার্যকর পদক্ষেপ না নেওয়ায় জনমনে ক্ষোভ বাড়ছে।
সরেজমিন অনুসন্ধান এবং একাধিক রোগী, হাসপাতাল-সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি ও স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, গুরুত্বপূর্ণ এই দায়িত্বে থাকা সত্ত্বেও ডা. নিসর্গ মেরাজ চৌধুরী সপ্তাহের অধিকাংশ সময় কর্মস্থলে থাকেন না।
অভিযোগ রয়েছে, তিনি সাধারণত সোমবার, মঙ্গলবার ও বুধবার কুড়িগ্রামে অবস্থান করেন এবং বাকি সময় ঢাকায় থাকেন। কুড়িগ্রামে অবস্থানকালেও সরকারি কর্মঘণ্টার মধ্যে বিভিন্ন বেসরকারি ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টারে রোগী দেখেন বলে অভিযোগ করেছেন একাধিক ভুক্তভোগী।
রোগীদের ভাষ্য, জরুরি চিকিৎসাসংক্রান্ত প্রয়োজনে আরএমওর সঙ্গে দেখা করতে গেলে অধিকাংশ সময় তার কক্ষ বন্ধ পাওয়া যায়। ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করেও অনেককে ফিরে যেতে হয়। সবচেয়ে বেশি দুর্ভোগে পড়ছেন চরাঞ্চল ও প্রত্যন্ত এলাকা থেকে চিকিৎসা নিতে আসা নিম্ন আয়ের মানুষ।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক হাসপাতালের একাধিক কর্মকর্তা-কর্মচারী জানান, আরএমওর অনিয়মিত উপস্থিতির কারণে হাসপাতালের প্রশাসনিক তদারকি কার্যত দুর্বল হয়ে পড়েছে। ওয়ার্ড ব্যবস্থাপনা, শৃঙ্খলা রক্ষা এবং চিকিৎসাসেবা সমন্বয়েও এর নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে।
অনুসন্ধানে আরও জানা যায়, আরএমওর অনুপস্থিতিতে প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণ শিথিল হয়ে পড়ায় হাসপাতালের ভেতরে বিশৃঙ্খলা বেড়েছে। অভিযোগ রয়েছে, সাবেক স্টোরকিপার মমিনুল ইসলাম ও সদ্য বদলি হয়ে আসা প্রধান সহকারী ইউনুছ আলী গত এক সপ্তাহে উচ্চমান সহকারী ও কম্পিউটার অপারেটর মো. আব্দুল মান্নানসহ একাধিক কর্মকর্তা-কর্মচারীর ওপর হামলা ও মারধরের ঘটনায় জড়িত পড়েন। এসব অভিযোগ এবং বদলির শর্ত ভঙ্গের বিষয়েও প্রশাসনের কার্যকর হস্তক্ষেপ না থাকায় হাসপাতালের শৃঙ্খলা ভেঙে পড়েছে বলে অভিযোগ সংশ্লিষ্টদের।
এদিকে, চলতি বছরের ৯ মে কুড়িগ্রাম সদর হাসপাতালে যোগদান করা মেডিকেল অফিসার ডা. বায়েজিদ হাসান দায়িত্ব গ্রহণের পর কর্মস্থলে মাত্র একদিন উপস্থিত ছিলেন বলে অভিযোগ রয়েছে। এতে চিকিৎসক সংকট আরও প্রকট হয়ে জেলার সরকারি স্বাস্থ্যসেবা মারাত্মক চাপের মুখে পড়েছে বলে দাবি সংশ্লিষ্টদের।
সচেতন নাগরিক কমিটির সহ-সভাপতি খন্দকার খায়রুল আনম বলেন, সরকারি বেতন-ভাতা গ্রহণ করে কর্মস্থলে অনুপস্থিত থাকা এবং সরকারি সময়ে ব্যক্তিগত প্র্যাকটিস করা গুরুতর অপরাধ। বিষয়টি নিরপেক্ষভাবে তদন্ত করে দায়ীদের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া উচিত।
অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে কুড়িগ্রাম সদর হাসপাতালের আবাসিক মেডিকেল অফিসার ডা. নিসর্গ মেরাজ চৌধুরী বলেন, সপ্তাহের চারদিন অনুপস্থিতির অভিযোগ সঠিক নয়। আমি প্রতি শনিবার তত্ত্বাবধায়কের কাছ থেকে লিখিত ছুটি নিই। রবিবার সকালে এসে আবার দায়িত্ব পালন করি।
হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক ডা. মো. নুর নেওয়াজ বলেন, আরএমও প্রতি শনিবার ছুটি নেন। তার একটি অটিস্টিক সন্তান রয়েছে, সে কারণে প্রতি সপ্তাহে তাকে ঢাকায় থাকতে হয়।
তিনি আরও বলেন, এগুলো নিয়ে লেখালেখি করার দরকার নেই। এমনিতেই চিকিৎসকরা কুড়িগ্রামে থাকতে চান না। সংবাদ প্রকাশ হলে তিনিও বদলি নিয়ে যেতে পারেন। এতে কুড়িগ্রামের মানুষই ক্ষতিগ্রস্ত হবে।



