টানা বর্ষণে বিপর্যস্ত কক্সবাজার, ৩৫ ইউনিয়ন প্লাবিত
কক্সবাজার প্রতিবেদক
প্রকাশ: ০৯ জুলাই ২০২৬, ০৫:০০ পিএম
টানা পাঁচ দিনের ভারী বর্ষণে কক্সবাজার জেলায় অনন্ত ৩৫ ইউনিয়ন প্লাবিত হয়েছে। একই সঙ্গে জলাবদ্ধতা ও পাহাড়ধসের ঝুঁকি ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে। ইতিমধ্যে পাজাড় ধস ও পানিতে ডুবে রোহিঙ্গা সহ ২৪ জনের প্রাণহানির ঘটনা ঘটেছে।
কক্সবাজার জেলার অধিকাংশ উপজেলার নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হয়ে বিচ্ছিন্ন হয়েছে সড়ক যোগাযোগ, বন্ধ রয়েছে গুরুত্বপূর্ণ সব নৌপথ। পরিস্থিতির আরও অবনতির আশঙ্কায় কক্সবাজার জেলা প্রশাসন সর্বোচ্চ সতর্কতা জারি করে পাহাড়ের পাদদেশ, ঢালু এলাকা ও বন্যাকবলিত নিচু স্থানে বসবাসকারীদের দ্রুত নিরাপদ আশ্রয়কেন্দ্রে চলে যাওয়ার নির্দেশ দিয়েছে। এর জন্য জেলার ৬৪৮ আশ্রয়কেন্দ্র প্রস্তুত রাখা হয়েছে। খোলা হয়েছে কন্ট্রোল রুম।
কক্সবাজার আবহাওয়া অফিসের সহকারী আবহাওয়াবিদ মো. আবদুল হান্নান জানান, বৃহস্পতিবার বিকাল ৩ টা পর্যন্ত কক্সবাজারে ৪৮ ঘন্টায় ২২৩ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে। বর্তমানে সমুদ্রবন্দরে ৩ নম্বর স্থানীয় সতর্কসংকেত বহাল রয়েছে। বৃষ্টি আরও কয়েকদিন অব্যাহত থাকবে।
ভারী বৃষ্টিতে বৃহস্পতিবার আবারও কক্সবাজারের চকরিয়ায় পাহাড় ধসে দুই শিশুর মৃত্যু হয়েছে। এ ঘটনায় আহত হয়েছেন আরও এক নারী।
বৃহস্পতিবার (৯ জুলাই) দিনপূর্ব রাত দেড়টার চকরিয়া উপজেলার বরইতলী ইউনিয়নের ৭ নম্বর ওয়ার্ডের মছনিয়া কাটার ডবল তলী এলাকায় এ ঘটনা ঘটে বলে জানান, চকরিয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) শাহীন দেলোয়ার।
নিহতরা হলেন, স্থানীয় বাসিন্দা ওবাইদুল ইসলামের আবদুল মজিদের ছেলে ওবাইদুল ইসলাম (১৩) ও মো. কাজলের মেয়ে রুমী আক্তার (১৩)।
বরতইলী ৭ নম্বর ওয়ার্ডের ইউপি সদস্য আব্দু শুক্কুর বলেন, ঘুমন্ত অবস্থায় রাত দেড়টার দিকে বাড়ির পেছনের পাহাড় ধসে তিনজন চাপা পড়ে। খবর পেয়ে স্থানীয়রা তাৎক্ষণিক একজনকে জীবিত উদ্ধার করেন। পরে চাপা পড়া অবস্থা থেকে গ্রামবাসীরা দুইজনের মরদেহ উদ্ধার করে।
ইউএনও শাহীন দেলোয়ার জানান, আহত নারীকে হাসপাতালে চিকিৎসা দেয়া হচ্ছে। পাশাপাশি ক্ষতিগ্রস্তদের প্রশাসনের পক্ষ থেকে সহায়তা প্রদান করা হবে।
এ নিয়ে গত চার দিনে কক্সবাজারে পাহাড়ধস ও পাহাড় ধসে ২৪ জনের মৃত্যু হল।
কক্সবাজার জেলা প্রশাসনের জারি করা গণবিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, কক্সবাজার সমুদ্রবন্দরে ৩ নম্বর স্থানীয় সতর্ক সংকেত বহাল রয়েছে। আবহাওয়া অধিদপ্তরের পূর্বাভাস অনুযায়ী আগামী কয়েক দিন ভারী থেকে অতি ভারী বর্ষণ অব্যাহত থাকতে পারে। এ অবস্থায় যেকোনো ধরনের প্রাণহানি এড়াতে ঝুঁকিপূর্ণ এলাকার বাসিন্দাদের দ্রুত নিকটস্থ সাইক্লোন শেল্টার বা নিরাপদ আশ্রয়কেন্দ্রে সরে যাওয়ার আহ্বান জানানো হয়েছে। জরুরি প্রয়োজনে জেলা প্রশাসনের কন্ট্রোল রুমের ০১৮৭২৬১৫১৩২ নম্বরে সার্বক্ষণিক যোগাযোগ করতে বলা হয়েছে।
কক্সবাজারের জেলা প্রশাসক মো. আ: মান্নান জানিয়েছেন, জেলার ৬৪৮টি আশ্রয়কেন্দ্র প্রস্তুত রাখা হয়েছে। উদ্ধার, ত্রাণ ও জরুরি সহায়তা কার্যক্রম সময়ের জন্য জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে একটি কন্ট্রোল রুম চালু করা হয়েছে। দুর্যোগপূর্ণ আবহাওয়া কেটে না যাওয়া পর্যন্ত সবাইকে সতর্ক থাকার এবং সরকারি নির্দেশনা মেনে চলার আহ্বান জানান তিনি।
জেলা প্রশাসন, উপজেলা প্রশাসন, জনপ্রতিনিধিদের দেয়া তথ্য মতে, বঙ্গোপসাগরে সৃষ্ট লঘুচাপ ও সক্রিয় মৌসুমি বায়ুর প্রভাবে টানা বর্ষণে কক্সবাজার জেলার ১০ উপজেলার অন্তত ৩৫টি ইউনিয়নে দেড় শতাধিক গ্রাম প্লাবিত হয়েছে। অন্তত পাঁচ লাখ মানুষ পানিবন্দি রয়েছে। কক্সবাজার সদর, উখিয়া, টেকনাফ, রামু, চকরিয়া, মহেশখালী, কুতুবদিয়া, পেকুয়া, মাতামুহুরি ও ঈদগাঁও উপজেলার বিস্তীর্ণ এলাকা এখন দুর্যোগে বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে।
দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, অতিরিক্ত বৃষ্টির কারণে পাহাড়ের মাটি সম্পূর্ণ পানিসিক্ত হয়ে পড়েছে। ফলে যেকোনো সময় নতুন করে আরও বড় ধরনের পাহাড়ধসের ঘটনা ঘটতে পারে। পাশাপাশি শহর ও গ্রামীণ এলাকার খাল-নালা উপচে পড়ায় দীর্ঘস্থায়ী জলাবদ্ধতার সৃষ্টি হয়েছে।
কক্সবাজার জেলা প্রশাসনের তথ্য মতে, জেলার শত শত ঘরবাড়িতে পানি ঢুকেছে। তলিয়ে গেছে অসংখ্য গ্রামীণ সড়ক, বিদ্যুৎ ও যোগাযোগ ব্যবস্থাও বিভিন্ন স্থানে ব্যাহত হয়েছে। কক্সবাজার শহরের কলাতলী, সুগন্ধা, হোটেল-মোটেল জোন, বাজারঘাটা, তারাবনিয়াছড়া, আলীরজাহাল ও বাস টার্মিনাল এলাকায় হাঁটু থেকে কোমরসমান পানি জমে গেছে। কয়েক ঘণ্টার বৃষ্টিতেই শহরের অধিকাংশ সড়ক চলাচলের অনুপযোগী হয়ে পড়ছে।
অন্যদিকে উত্তাল সাগরের কারণে টানা ৭ দিন ধরে টেকনাফ-সেন্ট মার্টিন নৌপথে যাত্রীবাহী ট্রলারসহ সকল নৌ-যান চলাচল বন্ধ রয়েছে। একই সঙ্গে কক্সবাজার-মহেশখালী ও পেকুয়া-কুতুবদিয়া নৌপথেও নৌযান চলাচল বন্ধ থাকায় হাজারো মানুষ চরম ভোগান্তিতে পড়েছেন। বিশ্বের বৃহত্তম রোহিঙ্গা আশ্রয়শিবিরেও পরিস্থিতি উদ্বেগজনক। টানা বর্ষণে সেখানে দুই শতাধিক পাহাড়ধসের ঘটনা ঘটেছ।
টানা ভারী বৃষ্টি ও পাহাড়ি ঢলের পানিতে চকরিয়া পেকুয়া ও মাতামুহুরি উপজেলার বিস্তীর্ণ নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হয়েছে। এতে বসতবাড়ি, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও গ্রামীণ সড়ক তলিয়ে গিয়ে জনজীবন মারাত্মকভাবে ব্যাহত হয়েছে। উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় লক্ষাদিক মানুষ পানিবন্দী হয়ে পড়েছেন। সড়কে পানি ওঠায় ব্যাহত হচ্ছে যান চলাচলও।
সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে রাজাখালী, মগনামা ও উজানটিয়া ইউনিয়নের বিভিন্ন গ্রামীণ এলাকা। স্থানীয়দের অভিযোগ, রাজাখালী ইউনিয়নের বামুলাপাড়া-উলুডিয়া পাড়া, সুন্দরীপাড়া এলাকায় ওবাইদিয়া ফার্ম ও এরশাদ আলী ওয়াকফ এস্টেটের মাছের ঘেরে পানি আটকে থাকায় জলাবদ্ধতা আরও তীব্র হয়েছে। দ্রুত পানি নিষ্কাশনের ব্যবস্থা না নেওয়ায় দুর্ভোগ বাড়ছে বলে দাবি তাদের।
উপজেলা প্রশাসন ও স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, টানা বৃষ্টি ও পাহাড়ি ঢলের কারণে অন্তত ২০টি গ্রামের মানুষ পানিবন্দী হয়ে পড়েছেন। ক্ষতিগ্রস্ত এলাকার মধ্যে রয়েছে টইটং ইউনিয়নের হাজীবাজার ও সোনাইছড়ি, শিলখালীর হেদায়াতাবাদ, মাঝেরঘোনা, কাছারীমোড়া ও পেঠান মাতবরপাড়া, রাজাখালীর বামুলাপাড়া, মৌলভীপাড়া, উলুডিয়াপাড়া, মগনামার শরৎঘোনা, পশ্চিম বাজারপাড়া, ধারিয়াখালী, ধরদরীঘোনা, মটকাভাঙা, চেরাংঘোনা, মরিচ্যাদিয়া, রঙ্গিয়াখালী, মগঘোনা, মাঝিরপাড়া ও মৌলভীপাড়া, উজানটিয়ার মিয়াপাড়া, সাবখালীপাড়া, ঘোষলপাড়া, পেকুয়ারচর ও পেরাসিংগাপাড়া, পেকুয়া সদর ইউনিয়নের মোরারপাড়া, সৈকতপাড়া, পূর্ব মেহেরনামা ও পশ্চিম গোয়াঁখালী এবং বারবাকিয়া ইউনিয়নের পাহাড়িয়াখালী গ্রাম।
স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, অনেক পরিবারের ঘরে পানি ঢুকে পড়েছে। বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পাঠদান ব্যাহত হচ্ছে। পাশাপাশি গ্রামীণ সড়ক তলিয়ে যাওয়ায় যাতায়াতে চরম দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে। অনেক পরিবার নিরাপদ স্থানে আশ্রয় নিতে বাধ্য হয়েছে।
চট্টগ্রাম দক্ষিণ বন বিভাগের বারবাকিয়া রেঞ্জ কর্মকর্তা খালেকুজ্জামান বলেন, "টানা বৃষ্টিতে পাহাড় ধসের আশঙ্কা রয়েছে। এ কারণে পাহাড়সংলগ্ন এলাকার বাসিন্দাদের নিরাপদ স্থানে সরে যেতে সতর্কতামূলক মাইকিং করা হচ্ছে।"
পেকুয়া উপজেলা বিএনপির সভাপতি ও পেকুয়া সদর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান এম বাহাদুর শাহ বলেন, "নবগঠিত পেকুয়া পৌর এলাকায় জলাবদ্ধতা নিরসনে পেকুয়া বাজারের জেনারেল হাসপাতাল থেকে বাজারের পশ্চিম মাথা পর্যন্ত কহেলখালী খালের প্রয়োজনীয় জায়গায় ময়লা-আবর্জনা অপসারণ করে দ্রুত পানি নিষ্কাশনের ব্যবস্থা করা হয়েছে।" এছাড়া খুলে দেওয়া হয়েছে প্রবাহমান খালের ওয়াপদা সংলগ্ন স্লুইস গেট।
পেকুয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) রফিকুল ইসলাম বলেন, "অতিরিক্ত বৃষ্টিপাতের ফলে নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হওয়ায় ঝুকিপূর্ণ জায়গা সমূহে পরিদর্শন সহ উপজেলা প্রশাসন সার্বিক পরিস্থিতি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করছে। দুর্যোগ মোকাবিলায় প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি গ্রহণের পাশাপাশি পরিস্থিতি স্বাভাবিক না হওয়া পর্যন্ত নিম্নাঞ্চল ও পাহাড়সংলগ্ন এলাকার বাসিন্দাদের সতর্ক থাকার আহ্বান করা হয়েছে।
অন্য দিকে চকরিয়া কাকারা ফাহাশিয়া খালী লক্ষেশ্বর করইয়া ঘোনা বমুবিল ছড়ি চকরিয়া পৌরসভার বিভিন্ন ওয়ার্ড পানিতে তলিয়ে গেছে।এমনকি চকরিয়া সরকারি কলেজে ও হাঁটু পরিমাণ পানি ডুকেছে তাতে ক্লাস সহ দাপ্তরিক কাজ করতে পারছেন না কলেজ কতৃপক্ষ।
জেলা প্রশাসক মো. আ: মান্নান বলেছেন, ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের জন্য পর্যাপ্ত শুকনো খাবার মজুত রয়েছে। অতিরিক্ত শুকনো খাবারের চাহিদাও সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে। ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারের জন্য ঢেউটিন প্রস্তুত রাখা হয়েছে। পরিস্থিতির আরও অবনতি হলে কন্ট্রোল রুমের কার্যক্রম আরও জোরদার করা হয়েছে এবং সব উপজেলা প্রশাসনের সঙ্গে সমন্বয় করে উদ্ধার ও ত্রাণ কার্যক্রম পরিচালনা করা হবে।



