কিশোরগঞ্জে ফিশারি নির্মাণে খাল-পানিপ্রবাহ বাধাগ্রস্তের অভিযোগ, ঝুঁকিতে বিস্তীর্ণ কৃষিজমি
কিশোরগঞ্জ প্রতিনিধি
প্রকাশ: ০৬ জুলাই ২০২৬, ০৪:৫৩ পিএম
কিশোরগঞ্জ সদর উপজেলার বৌলাই ইউনিয়নের গোয়ালাপাড়া গ্রামের মেঘনা বিলে ভূমির শ্রেণি পরিবর্তন করে ফিশারি নির্মাণের অভিযোগ উঠেছে স্থানীয় এক ব্যক্তির বিরুদ্ধে। এ ঘটনায় ফসলি জমি ও প্রাকৃতিক পানিপ্রবাহ রক্ষায় প্রশাসনের হস্তক্ষেপ দাবি করেছেন স্থানীয় কৃষকরা।
সোমবার (০৬ জুলাই) দুপুরে সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, গোয়ালাপাড়া গ্রামের মেঘনা বিলের বিস্তীর্ণ এলাকায় খননযন্ত্রের মাধ্যমে মাটি কাটার কাজ চলছে। বিলের বিভিন্ন স্থানে গভীর গর্ত খনন করা হয়েছে এবং সেখান থেকে উত্তোলন করা মাটি পাশেই স্তূপ করে রাখা হয়েছে। খননকাজের কারণে আগের সমতল কৃষিজমির চিত্র অনেকটাই বদলে গেছে। কোথাও কোথাও জমির চারপাশে উঁচু করে মাটির বাঁধ নির্মাণ করা হয়েছে, আবার কিছু স্থানে বাঁধ নির্মাণের কাজ চলমান রয়েছে।
এদিকে এ ঘটনায় গতকাল রবিবার (০৫ জুলাই) সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার (ইউএনও) বরাবর একটি লিখিত অভিযোগ দিয়েছেন এলাকাবাসী। অভিযোগে বলা হয়, ফসলি জমিতে গভীর গর্ত খনন, মাটি বিক্রি এবং ফিশারি নির্মাণের জন্য বাঁধ দেওয়ায় বিল ও আশপাশের কৃষিজমিতে স্থায়ী জলাবদ্ধতার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, গোয়ালাপাড়া গ্রামের বাসিন্দা মো. সাদ্দাম হোসেন মেঘনা বিলে ভূমির শ্রেণি পরিবর্তন করে নিজের জমির পাশাপাশি অন্যের কাছ থেকে লিজ নেওয়া ফসলি জমিতেও খননকাজ চালাচ্ছেন। অভিযোগ রয়েছে, সেখানে গভীর গর্ত খননের পর মাটি বিক্রি করা হচ্ছে এবং পরবর্তীতে ফিশারি নির্মাণের প্রস্তুতি হিসেবে মাটির বাঁধ নির্মাণ করা হচ্ছে। এতে এলাকার প্রাকৃতিক পানি নিষ্কাশনের পথ বাধাগ্রস্ত হতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন স্থানীয়রা। মেঘনা বিল আশপাশের দানাপাটুলি, ছাইই, মাগুরা ও দারিখুরা বিলের পানিপ্রবাহের গুরুত্বপূর্ণ সংযোগস্থল। এসব বিলের পানি স্বাভাবিকভাবে মেঘনা বিল হয়ে প্রবাহিত হয়। এখানে স্থায়ী বাঁধ নির্মাণ করা হলে পানির স্বাভাবিক প্রবাহ ব্যাহত হয়ে পাঁচটি বিলেই দীর্ঘস্থায়ী জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হতে পারে।
স্থানীয় কৃষকদের দাবি, এমন পরিস্থিতি সৃষ্টি হলে বর্ষা ও আমন মৌসুমে ধান চাষ মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে। পাশাপাশি শীতকালীন সবজি ও অন্যান্য ফসল উৎপাদনেও বিরূপ প্রভাব পড়বে। দীর্ঘ সময় জমিতে পানি জমে থাকলে মাটির উর্বরতা কমে যাবে এবং কৃষকদের আর্থিক ক্ষতির পরিমাণও বাড়বে।
তাদের অভিযোগ, কয়েকজনের ব্যক্তিগত লাভের জন্য ফসলি জমির শ্রেণি পরিবর্তন করে ফিশারি নির্মাণ করা হলে শত শত কৃষক ক্ষতির মুখে পড়বেন। কৃষিনির্ভর এ অঞ্চলের মানুষের প্রধান জীবিকা কৃষিকাজ। তাই প্রাকৃতিক পানিপ্রবাহ বাধাগ্রস্ত করে কোনো স্থাপনা নির্মাণ করা হলে তা কৃষি, পরিবেশ ও স্থানীয় জীববৈচিত্র্যের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে বলে মনে করছেন তারা। দ্রুত তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ এবং খনন ও ফিশারি নির্মাণ কার্যক্রম বন্ধের দাবি জানিয়েছেন এলাকাবাসী।
স্থানীয় কৃষক নাফিউল হাসান বলেন, “মেঘনা বিলে ফিশারি নির্মাণ করা হলে আশপাশের কয়েকটি বিলের পানিপ্রবাহ বাধাগ্রস্ত হবে। কিশোরগঞ্জ সদরের পানি নিষ্কাশনেরও এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ পথ। এতে আমাদের ধানিজমিতে স্থায়ী জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হবে এবং ভবিষ্যতে ধান চাষ প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়বে। আমরা বাধা দেওয়ার পরও ভ্যাকু মেশিন দিয়ে খননকাজ চলছে। তাই দ্রুত প্রশাসনের হস্তক্ষেপ কামনা করছি।”
আরেক কৃষক মোহাম্মদ হাসিবুল হাসান পারভেজ বলেন, “আমরা কৃষির ওপর নির্ভরশীল। ফিশারি নির্মাণ ও বাঁধ দেওয়ার কারণে পানির স্বাভাবিক প্রবাহ বাধাগ্রস্ত হলে ধানসহ অন্যান্য ফসল চাষে বড় ধরনের সংকট দেখা দেবে। কৃষিজমি রক্ষায় প্রশাসনের দ্রুত পদক্ষেপ প্রয়োজন।”
কৃষক আবু বাক্কার বলেন, “এই জমিগুলো আমাদের বাপ-দাদার আমল থেকে চাষাবাদের জন্য ব্যবহৃত হয়ে আসছে। আমরা জন্মের আগে থেকেই এখানে কৃষিকাজ হতো, আর এখনও এই জমির ফসল ফলিয়েই আমাদের সংসার চলে। যদি এসব ফসলি জমিতে ফিশারি নির্মাণ করা হয়, তাহলে অনেক কৃষক জীবিকা হারাবেন। পানি জমে থাকলে জমিতে আর চাষাবাদ করা সম্ভব হবে না।
আমাদের দাবি, আমরা যেন আগের মতো এই জমিতে ধানসহ বিভিন্ন ফসল আবাদ করে জীবিকা নির্বাহ করতে পারি। প্রশাসনের কাছে অনুরোধ, কৃষিজমি রক্ষায় দ্রুত প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হোক। আমার নিজেরও প্রায় ৬০-৬৫ শতাংশ জমি রয়েছে। বছরের পর বছর ধরে এই জমিতে চাষাবাদ করেই পরিবার চালিয়ে আসছি। যদি এখানে ফিশারি করা হয়, তাহলে আমাদের আর কোনো উপায় থাকবে না। আমরা চরম সংকটে পড়ে যাব।”
এ বিষয়ে জানতে চাইলে অভিযুক্ত মো. সাদ্দাম হোসেনের সঙ্গে মুঠোফোনে যোগাযোগ করা হলে তিনি অভিযোগের বিষয়ে শুনে বলেন, “আমি এখন ব্যস্ত আছি, পরে কল দেন।” এরপর তিনি কল কেটে দেন। পরবর্তীতে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি আর ফোন রিসিভ করেননি।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. কামরুল হাসান মারুফ বলেন, “এ বিষয়ে একটি লিখিত অভিযোগ পেয়েছি। অভিযোগ পাওয়ার পর ইউনিয়ন ভূমি সহকারী কর্মকর্তাকে ঘটনাস্থলে পাঠানো হয়। তিনি জানিয়েছেন, সকালে লোক পাঠানো হলেও সেখানে তখন কোনো খননকাজ চলছিল না এবং কাউকে পাওয়া যায়নি।
আমি তাকে নির্দেশ দিয়েছি, সকাল-বিকেল নিয়মিত ঘটনাস্থলের খোঁজ রাখতে। যখনই খননকাজ বা কোনো কার্যক্রম চলতে দেখা যাবে, তখনই তা বন্ধ করার ব্যবস্থা নিতে হবে। প্রয়োজনে আমি নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট পাঠিয়ে মোবাইল কোর্ট পরিচালনা করব এবং আইন অনুযায়ী প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।”



