নরসিংদীতে মন্দিরের উন্নয়ন কাজের সরকারি বরাদ্দ বিএনপি নেতার পেটে
নরসিংদী প্রতিবেদক
প্রকাশ: ০৪ জুলাই ২০২৬, ০৭:৫৯ পিএম
মন্দিরের উন্নয়নের নামে সরকারি বরাদ্দকৃত টিআর (টেস্ট রিলিফ) প্রকল্পের অর্থ হাতিয়ে নেওয়ার অভিযোগ উঠেছে নরসিংদী জেলা বিএনপির মানবাধিকার বিষয়ক সম্পাদক ও জেলা কৃষক দলের সদস্য সচিব দীপক কুমার বর্মণ (প্রিন্স) এর বিরুদ্ধে।
একই সঙ্গে ওএমএস (ওপেন মার্কেট সেল) ডিলার নিয়োগ পাইয়ে দেওয়ার আশ্বাস দিয়ে জনপ্রতি এক লাখ টাকা, বিভিন্ন মন্দিরের কমিটি করে দেওয়ার নামে টাকা আদায়সহ বিভিন্ন ধরনের মামলাবাজি ও চাঁদাবাজির মাধ্যমে লাখ লাখ টাকার অভিযোগ উঠেছে এই নেতার বিরুদ্ধে।
নরসিংদীর পৌর শহরের বৌয়াকুড় এলাকায় অবস্থিত শীতলাবাড়ি মন্দির। সদর উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তার নথি বলছে চলতি বছরের ৫ এপ্রিল এই মন্দিরের নামে গ্রামীণ অবকাঠামো উন্নয়ন প্রকল্পের মাধ্যমে ১ লাখ ১৭ হাজার টাকা বরাদ্দ অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। শীতলা বাড়ি মন্দির উন্নয়ন প্রকল্পে বিধি মোতাবেক প্রকল্প বাস্তবায়নে জেলা বিএনপির মানবাধিকার বিষয়ক সম্পাদক ও জেলা কৃষক দলের সদস্য সচিব দীপক কুমার বর্মন (প্রিন্স)-কে সভাপতি, সঞ্জয় ধরকে সাধারণ সম্পাদক এবং জেলা ছাত্র দলের সাংস্কৃতিক সম্পাদক কিশান দাস পার্থ, সজয় দাস ও তুষার দাসকে সদস্য করে ৫ সদস্য বিশিষ্ট প্রকল্প বাস্তবায়ন কমিটি দাখিল করা হয়।
পরবর্তীতে চলতি বছরের ৫ এপ্রিল পৌর প্রশাসক, উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা ও উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার মাধ্যমে এই কমিটির অনুমোদনও দেওয়া হয়। পরে বিধি মোতাবেক প্রকল্প বাস্তবায়ন কমিটির সভাপতি হিসেবে দীপক কুমার বর্মন (প্রিন্স) এর নামে ইস্যুকৃত ১ লাখ ১৭ হাজার টাকার চেক গত মে মাসের ১১ তারিখে উত্তোলনও করা হয়। ব্যয়ও নাকি করা হয়েছে মন্দিরের উন্নয়ন কাজে, তবে বাস্তব চিত্র সম্পূর্ণ ভিন্ন।
শীতলা বাড়ী মন্দির উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নে ৫ সদস্য বিশিষ্ট কমিটির সদস্যরা হলো- নরসিংদী পৌর শহরের বৌয়াকুড় এলাকার দেবেন্দ্র বর্মনের ছেলে দীপক কুমার বর্মন (সভাপতি), হাজীপুর দাসপাড়া এলাকার গৌরাঙ্গ সূত্রধরের ছেলে সঞ্জয় সূত্রধর (সাধারণ সম্পাদক), বৌয়াকুড় এলাকার অজয় দাসের ছেলে সজয় দাস (সদস্য), শক্রঘ্ন দাসের ছেলে কিশান দাস পার্থ (সদস্য), নারায়ণ দাসের ছেলে তুষার দাস (সদস্য)।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, বিএনপির এই নেতা মন্দিরের নামে বরাদ্দ করা পুরো অর্থই আত্মসাৎ করেছেন। নিজের বানানো প্রকল্প বাস্তবায়ন কমিটিতে নিজের আত্মিয়-স্বজনসহ কমিটি করা এবং কারো নাম ও স্বাক্ষর জালিয়াতিও করেছেন তিনি নিজেই। নিজ নামে চেকের মাধ্যমে টাকা উত্তোলন করার পরও শীতলা বাড়ী মন্দির কমিটির সভাপতি সুশীল চন্দ্র দাস ও সাধারণ সম্পাদক অখিল দাসসহ কমিটির অন্যান্য সদস্যরা বরাদ্দের বিষয়ে জানতে চাইলে বরাদ্দের টাকা পাওয়া যায়নি, পেলে জানানো হবে বলেও মন্তব্য করেন তিনি। মন্দিরের অর্থ আত্মসাতের ঘটনায় হতবাক মন্দির কমিটিসহ হিন্দু ধর্মাবলম্বীরা।
অভিযোগের বিষয়ে বৌয়াকুড় শীতলা বাড়ী মন্দির কমিটির সভাপতি সুশীল চন্দ্র দাস ও সাধারণ সম্পাদক অখিল দাস জানান, মন্দিরের উন্নয়ন কাজের জন্য তারা পৌরসভায় অনুদানের জন্য আবেদন করেছিলেন। তবে এ পর্যন্ত মন্দিরের নামে কোনো সরকারি অর্থ তারা পাননি।
মন্দির কমিটির অন্যান্য সদস্যরা জানান, মন্দিরের উন্নয়ন কাজের জন্য আমরা পৌরসভায় আবেদন করেছি। কিন্তু আমরা কোনো টাকা পাইনি। তবে লোকমুখে শুনছি, কে বা কারা মন্দিরের নামে টাকা এনেছে। মন্দিরের নামে যদি কেউ টাকা এনেও থাকে, সেই টাকা আমরা পাইনি। মন্দিরের উন্নয়নের জন্য সরকারি বরাদ্দকৃত টাকা যেন মন্দিরে ফিরিয়ে দেওয়া হয় এবং অর্থ আত্মসাৎকারীর দৃষ্টান্ত মূলক শাস্তির দাবিও জানান তারা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে।
এছাড়াও প্রকল্প বাস্তবায়ন কমিটির সদস্য তুষার দাস জেলা প্রশাসক ও পুলিশ সুপার বরাবর লিখিত অভিযোগ করে বলেন, অভিযুক্ত দীপক কুমার বর্মন (প্রিন্স) ‘প্রকল্প বাস্তবায়ন কমিটি’ গঠনের প্রস্তাবিত ফর্মে আমাকে না জানিয়ে আমার নাম, ঠিকানা, মোবাইল নাম্বার ব্যাবহার করে। এমনকি আমার স্বাক্ষরও জাল করে উক্ত ফর্মে আবেদন করে। আমি এব্যাপারে কিছুই জানিনা। জনস্বার্থে এবং ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের অনুদানের অর্থ আত্মসাতকারীর বিরুদ্ধে দ্রুত আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করে, উক্ত আত্মসাতকৃত সরকারি টাকা উদ্ধার করে মন্দিরের তহবিলে হস্তান্তরের জন্য আপনার নিকট বিনীত প্রার্থনা করছি। পাশাপাশি অভিযুক্ত দীপক কুমার বর্মন (প্রিন্স) এর বিরুদ্ধে টাকা আত্মসাৎ ও স্বাক্ষর জাল করার অপরাধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের অনুরোধ রইলো।
এদিকে, বৌয়াকুড় এলাকার বাসিন্দা বলাই নামে একজন জানান, আমাকে ওএমএসের ডিলার এনে দেওয়ার কথা বলে দীপক কুমার বর্মণ (প্রিন্স) ভাই এক লাখ টাকা চান। পরে আমার স্ত্রীর হাতের বালা বন্ধক রেখে এক লাখ টাকা জোগাড় করে তাঁর হাতে দিই। কিন্তু আজ পর্যন্ত আমাকে ডিলারও দেওয়া হয়নি, টাকাও ফেরত পাইনি।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ভাগবত আশ্রমের একজন জানান, গত ৫ আগস্টের পর ভাগবত আশ্রম কমিটির মধ্যে সাংগঠনিক সমস্যা দেখে দিলে আশ্রমের ভক্তবৃন্দরা বর্তমান সাংসদ খায়রুল কবির খোকনের স্মরণাপন্ন হন। পরে তিনি দীপক কুমার বর্মণ (প্রিন্স) কে বিষয়টি দেখে সহযোগিতা করার দায়িত্ব দেন। এই সুযোগ কাজে লাগিয়ে প্রিন্স কমিটি করে দেয়ার নামে উভয় পক্ষের কাছ থেকেই মোটা অংকের টাকা হাতিয়ে নেন।
এছাড়া বিভিন্ন ব্যক্তি ও ব্যবসায়ীর কাছ থেকে নানা অজুহাতে অর্থ আদায়ের অভিযোগও সামনে এসেছে। স্থানীয়দের বাসিন্দাদের সাথে কথা বলে জানা গেছে, নরসিংদী জেলা বিএনপির মানবাধিকার বিষয়ক সম্পাদক ও জেলা কৃষক দলের সদস্য সচিব দীপক কুমার বর্মণ (প্রিন্স) ও তার শ্যালক জেলা ছাত্র দলের সাংস্কৃতিক সম্পাদক কিশান দাস পার্থ তাদের দলীয় স্ব স্ব পদের ক্ষমতা দেখিয়ে সনাতনী সম্প্রদায় ও বিভিন্ন ব্যবসায়ীকে মামলা-হামলার ভয় দেখিয়ে অর্থ হাতিয়ে নেওয়া সহ এ ধরনের আরও একাধিক ব্যক্তিরা তাদের প্রতারণার শিকার হয়েছেন। বিষয়টির নিরপেক্ষ তদন্ত এবং দোষীদের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণে সংশ্লিষ্ট প্রশাসনের হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন স্থানীয়রা।
আনিত সকল অভিযোগ অস্বীকার করে দীপক কুমার বর্মণ (প্রিন্স) বলেন, বরাদ্ধকৃত টাকা মন্দির কমিটির কোষাধ্যক্ষ সজয় দাস জানেন। আপনার কোনো কিছু জানতে হলে ওনার সাথে যোগাযোগ করেন।
মন্দির কমিটির কোষাধ্যক্ষ সজয় দাস বলেন, আমরা জানতে পেরেছি, কে বা করা আমাদের মন্দিরের বরাদ্ধকৃত টাকা স্বাক্ষর করে নিয়ে এসেছে। তবে এখনো আমরা সরকারি কোনো অনুদানের টাকা পাইনি।
মন্দিরের টাকা আত্মসাতের বিষয়টি নিন্দনীয় উল্লেখ করে জেলা বিএনপির ধর্ম বিষয়ক সম্পাদক মাওলানা নোমান আহমেদ বলেন, মসজিদ-মন্দিরসহ উপাসনালয় গুলোতে সরকার অগ্রাধিকার ভিত্তিতে অর্থ বরাদ্দ দিয়ে থাকে। এছাড়াও জেলা বিএনপির সভাপতি ও সদর-১ আসনের সংসদ সদস্য খায়রুল কবির খোকন দূর্নীতি, চাঁদাবাজ এবং মাদকের বিরুদ্ধে জিরো ট্রলারেন্স ঘোষণা করেছেন। মন্দিরে অনিয়ম হয়ে থাকলে তবে তদন্ত করে সাংগঠনিক ব্যবস্থা গ্রহন করা উচিত।
নরসিংদী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা আসমা জাহান সরকার জানান, বিষয়টি আমি শুনেছি তবে লিখিত কোন অভিযোগ পাইনি। এ বিষয়ে খোঁজ নিয়ে তদন্ত করে দেখা হবে।



