একই পরিবারের ছয় প্রতিবন্ধী সদস্য পেলেন নতুন ঘর
নরসিংদী প্রতিবেদক
প্রকাশ: ২৭ জুন ২০২৬, ০৮:৪৬ পিএম
নরসিংদীর রায়পুরা উপজেলার মির্জাপুর ইউনিয়নের পূবেরচর গ্রামের দৃষ্টি প্রতিবন্ধী বৃদ্ধা হারেছা বেগম (৭০) ও তার পরিবারের দীর্ঘদিনের দুর্ভোগের অবসান ঘটেছে। একই পরিবারের ছয়জন প্রতিবন্ধী সদস্যকে নিয়ে বছরের পর বছর জরাজীর্ণ টিনের ঘরে মানবেতর জীবনযাপন করা এই পরিবারটি অবশেষে স্বেচ্ছাসেবীদের উদ্যোগে একটি নতুন, নিরাপদ ও বসবাসযোগ্য ঘর পেয়েছে। স্বেচ্ছাসেবীদের মানবিক এই উদ্যোগে বদলে গেল অসহায় পরিবারটির জীবন।
শনিবার (২৭ জুন) দুপুরে রায়পুরা উপজেলা স্বেচ্ছাসেবী ফোরামের উদ্যোগে নির্মিত নতুন ঘরটি আনুষ্ঠানিকভাবে পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা হয়। উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে স্থানীয় প্রশাসন, বিভিন্ন সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তা, শিক্ষাবিদ, জনপ্রতিনিধি, স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনের নেতৃবৃন্দ এবং এলাকার গণ্যমান্য ব্যক্তিরা উপস্থিত ছিলেন।
রায়পুরা উপজেলা স্বেচ্ছাসেবী ফোরামের সভাপতি সিরাজুল ইসলাম সালামের সভাপতিত্বে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. মাসুদ রানা। বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন জেড এইচ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রো-ভিসি অধ্যাপক ড. জসিম উদ্দিন, বাংলাদেশ ব্যাংকের অতিরিক্ত পরিচালক আসাদুল হক, উপজেলা সমাজসেবা কর্মকর্তা খলিলুর রহমান সরকার, ব্র্যাক ব্যাংকের ভৈরব শাখার এভিপি জিয়াউল হক, মির্জাপুর ইউনিয়ন পরিষদের সদস্য দুলাল সিংসহ বিভিন্ন সামাজিক ও স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনের নেতৃবৃন্দ। অনুষ্ঠান সঞ্চালনা করেন সংগঠনের অর্থবিষয়ক সম্পাদক সাইফুল ইসলাম মাহবুব।
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, প্রায় দুই দশক আগে হারেছা বেগমের স্বামী ফজর আলীর মৃত্যুর পর পরিবারটি চরম আর্থিক সংকটে পড়ে। বর্তমানে তাঁর সঙ্গে বসবাস করছেন জন্মান্ধ মেয়ে সুরাইয়া বেগম (৪৫), শারীরিক প্রতিবন্ধী জামাতা মরম আলী (৫৬) এবং দৃষ্টি প্রতিবন্ধী তিন নাতি-নাতনি, মদিনা পাখি (৯), আব্দুর শুক্কুর (৮) ও তাসনিম (৭)। পরিবারের ছয়জন সদস্যই বিভিন্ন ধরনের প্রতিবন্ধিতার কারণে স্বাভাবিক জীবনযাপনে প্রতিনিয়ত সংগ্রাম করে আসছেন।
ভাঙাচোরা টিনের ঘরে ঝড়-বৃষ্টি ও প্রতিকূল আবহাওয়ার মধ্যে বসবাস ছিল তাদের নিত্যদিনের বাস্তবতা। নিরাপদ আশ্রয়ের অভাবে প্রতিনিয়ত অনিশ্চয়তা ও দুর্ভোগে দিন কাটছিল পরিবারটির। পরে বিভিন্ন ব্যক্তি, শুভানুধ্যায়ী ও স্বেচ্ছাসেবীরা পরিবারটির পাশে দাঁড়ানোর আগ্রহ প্রকাশ করেন। তাদের সম্মিলিত সহযোগিতায় এক লাখ টাকারও বেশি ব্যয়ে অল্প সময়ের মধ্যে একটি নতুন বসবাসযোগ্য ঘর নির্মাণ করে পরিবারটির কাছে হস্তান্তর করা হয়।
দৃষ্টি প্রতিবন্ধী হারেছা বেগম বলেন, আমি চোখে দেখি না, বয়সও হয়েছে। ঝড়-বৃষ্টির সময় ভাঙা ঘরে খুব কষ্টে থাকতে হতো। এখন নতুন ঘর পেয়ে অনেকটা নিশ্চিন্ত। যারা আমাদের পাশে দাঁড়িয়েছেন, আল্লাহ যেন তাদের উত্তম প্রতিদান দেন।
তার মেয়ে সুরাইয়া বেগম বলেন, আমাদের সংসারে কোনো স্থায়ী আয়ের উৎস নেই। মা, স্বামী ও তিন সন্তানকে নিয়ে খুব কষ্টে দিন কাটছিল। আমাদের যেভাবে সবাই সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দিয়েছেন, তাতে আমরা নতুন করে বাঁচার আশা পেয়েছি। সকলের প্রতি আমরা আন্তরিকভাবে কৃতজ্ঞ।
উপজেলা সমাজসেবা কর্মকর্তা খলিলুর রহমান সরকার জানান, জেলা ও উপজেলা সমাজসেবা বিভাগের পক্ষ থেকে পরিবারটির জন্য গাভী প্রদানসহ বিভিন্ন সরকারি সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির আওতায় সহায়তা দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি তিনি স্বেচ্ছাসেবী ফোরামের এই উদ্দ্যোগকে সাধুবাদ জানিয়েছেন।
রায়পুরা উপজেলা স্বেচ্ছাসেবী ফোরামের সভাপতি সিরাজুল ইসলাম সালাম বলেন, পরিবারটির দুরবস্থায় অনেকেই সহযোগিতার জন্য এগিয়ে আসেন। সবার সম্মিলিত অর্থায়নে দ্রুত একটি নিরাপদ ও বসবাসযোগ্য ঘর নির্মাণ করে তাদের হাতে তুলে দিতে পেরেছি। সমাজের অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়ানোই আমাদের মূল লক্ষ্য।
উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. মাসুদ রানা বলেন, সরকারের পাশাপাশি সামাজিক সংগঠন ও স্বেচ্ছাসেবীদের এমন মানবিক উদ্যোগ সমাজে ইতিবাচক পরিবর্তনের অনুপ্রেরণা জোগায়। প্রশাসনের পক্ষ থেকেও পরিবারটির প্রয়োজনীয় সহায়তা অব্যাহত থাকবে।
স্থানীয় বাসিন্দাদের মতে, নতুন ঘর পাওয়ার মাধ্যমে পরিবারটির দীর্ঘদিনের একটি বড় কষ্ট দূর হয়েছে। তবে তাদের টেকসই পুনর্বাসনের জন্য নিয়মিত চিকিৎসাসেবা, প্রতিবন্ধী ভাতা, সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির আওতায় অন্তর্ভুক্তি এবং স্থায়ী আয়ের ব্যবস্থা নিশ্চিত করা জরুরি। তাহলেই পরিবারটি আরও সম্মানজনক ও স্বাভাবিক জীবনযাপন করতে সক্ষম হবে।



