রেকর্ড গড়ার অপেক্ষায় পাগলা মসজিদের দান, দানবাক্সে মিলল ৪৩ বস্তা টাকা
কিশোরগঞ্জ প্রতিনিধি
প্রকাশ: ২৭ জুন ২০২৬, ১০:০৩ এএম
কিশোরগঞ্জ জেলা শহরের নরসুন্দা নদীর তীরে অবস্থিত ঐতিহাসিক পাগলা মসজিদের ১৩টি লোহার দানবাক্স ছয় মাস পর খোলা হয়েছে। দানবাক্সগুলো থেকে ৪৩ বস্তা টাকা, বিপুল পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা ও স্বর্ণালঙ্কার পাওয়া গেছে। বর্তমানে টাকা গণনার কাজ চলছে। গণনা শেষে মোট টাকার পরিমাণ জানা যাবে। সংশ্লিষ্টদের ধারণা, এবার দানের পরিমাণ ২০ কোটি টাকা ছাড়িয়ে নতুন রেকর্ড গড়তে পারে।
শনিবার (২৭ জুন) সকাল ৭টা ১৮ মিনিটে জেলা প্রশাসক ও পাগলা মসজিদ পরিচালনা কমিটির সভাপতি সোহানা নাসরিনের উপস্থিতিতে দানবাক্সগুলো খোলা হয়।
এ সময় অতিরিক্ত পুলিশ সুপার নাজমুস সাকিব খান, অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (সার্বিক) মো. ইশতিয়াক ইমন, অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (রাজস্ব) মোহাম্মদ নাহিদ হাসনা খান, অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট মো. এরশাদুল আহমেদ, সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. কামরুল হাসান মারুফসহ র্যাব, পুলিশ ও আনসার সদস্যরা উপস্থিত ছিলেন।
দানবাক্স থেকে বের করা টাকা প্রথমে বস্তায় ভরে মসজিদের দ্বিতীয় তলায় নেওয়া হয়। সেখানে গণনার কাজ শুরু হয়। এ কাজে মসজিদ পরিচালনা কমিটির সদস্য, মসজিদ কমপ্লেক্সের মাদরাসা ও এতিমখানার শিক্ষক-শিক্ষার্থী, পার্শ্ববর্তী জামিয়া এমদাদিয়া মাদরাসার শিক্ষার্থী, রূপালী ব্যাংকের কর্মকর্তা-কর্মচারীসহ চার শতাধিক ব্যক্তি অংশ নিয়েছেন।
এর আগে গত বছরের ২৭ ডিসেম্বর, তিন মাস ২৭ দিন পর দানবাক্স খুলে পাওয়া গিয়েছিল ১১ কোটি ৭৮ লাখ ৪৮ হাজার ৫৩৮ টাকা। এছাড়াও বৈদেশিক মুদ্রা ও স্বর্ণালঙ্কার পাওয়া যায়। এবার সেই রেকর্ড অতিক্রম হওয়ার প্রত্যাশা করছেন সংশ্লিষ্টরা।
জানা গেছে, সাধারণত প্রতি তিন মাস পর পর পাগলা মসজিদের দানবাক্স খোলা হলেও এবার বিভিন্ন কারণে ছয় মাস পর খোলা হয়েছে। এ সময়ের মধ্যে দানের পরিমাণ বৃদ্ধি পাওয়ায় নতুন করে আরও দুটি দানবাক্স যুক্ত করা হয়েছে। প্রতিদিন দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে অসংখ্য মানুষ এসে এখানে দান করেন। অনেকের বিশ্বাস, এ মসজিদে দান করলে মনোবাসনা পূরণ হয়। সেই বিশ্বাস থেকেই দিন দিন বাড়ছে দানের পরিমাণ।
রূপালী ব্যাংক কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, বিপুল পরিমাণ টাকা গণনায় সারাদিন লেগে যেতে পারে। সন্ধ্যা কিংবা তারও পরে মোট হিসাব জানা সম্ভব হবে।
অতিরিক্ত পুলিশ সুপার নাজমুস সাকিব খান বলেন, “দানবাক্স খোলা ও টাকা গণনার কার্যক্রমে সার্বিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ৪০ জন পুলিশ সদস্য, ১০ জন র্যাব সদস্য এবং ২০ জন আনসার সদস্য দায়িত্ব পালন করছেন। এছাড়া মসজিদ পরিচালনা কমিটির সদস্য, মাদ্রাসার শিক্ষার্থী ও স্বেচ্ছাসেবকরাও কার্যক্রমে সহযোগিতা করছেন।
তিনি বলেন, পুরো কার্যক্রম নির্বিঘ্নে সম্পন্ন করতে প্রয়োজনীয় সব ধরনের নিরাপত্তা ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। পরিস্থিতি মোকাবিলায় বিকল্প (ব্যাকআপ) পরিকল্পনাও প্রস্তুত রয়েছে। প্রয়োজনে সে অনুযায়ী দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”
জেলা প্রশাসক ও পাগলা মসজিদ পরিচালনা কমিটির সভাপতি সোহানা নাসরিন বলেন, বর্তমানে পাগলা মসজিদের তহবিলে মোট ১১৪ কোটি ১৩ লাখ ৭ হাজার ৩৫২ টাকা জমা রয়েছে। এছাড়া মসজিদের নিজস্ব ওয়েবসাইট চালু করা হয়েছে, যার মাধ্যমে বিশ্বের যেকোনো প্রান্ত থেকে অনলাইনে ও মোবাইল ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে দান করা যায়। ইতোমধ্যে ওয়েবসাইটের বাংলা সংস্করণও চালু হয়েছে এবং অনলাইনে এ পর্যন্ত ২৪ লাখ ৭৬ হাজার ৮৮২ টাকা অনুদান এসেছে।
তিনি আরও বলেন, পাগলা মসজিদের আধুনিক ইসলামি কমপ্লেক্স নির্মাণের প্রয়োজনীয় কার্যক্রমও এগিয়ে চলছে। এ লক্ষ্যে বর্তমান মসজিদ কমপ্লেক্স ও কবরস্থানের মধ্যবর্তী ৫৩ দশমিক ৭৭ শতাংশ জমি মসজিদের নামে ক্রয় করা হয়েছে। বর্তমানে কমপ্লেক্সের নান্দনিক নকশা প্রণয়নের কাজ চলমান রয়েছে। পাশাপাশি মুসল্লিদের সুবিধার্থে মসজিদের বাইরে একটি পাবলিক টয়লেট নির্মাণের কাজও চলছে।
জেলা প্রশাসক বলেন, মসজিদের তহবিল থেকে কমপ্লেক্সের মাদ্রাসায় অধ্যয়নরত ১৩০ জন এতিম ও অসহায় শিক্ষার্থীর সব ধরনের ব্যয় বহন করা হয়। এছাড়া ৩৫ জন কর্মচারী ও ১০ জন আনসার সদস্যের বেতন, মসজিদের বিদ্যুৎ বিল এবং বিভিন্ন উন্নয়নমূলক ব্যয় এই তহবিল থেকেই মেটানো হয়। তহবিলের লভ্যাংশ থেকে কিশোরগঞ্জ জেলার অসহায় রোগীদের চিকিৎসার জন্যও আর্থিক সহায়তা দেওয়া হয়।
তিনি আরও বলেন, আজকের বিশাল গণনা কার্যক্রমে জামিয়া ইমদাদিয়া মাদ্রাসার ৩০০ জন শিক্ষার্থী, পাগলা মসজিদ মাদ্রাসার ১০৬ জন শিক্ষার্থী, রূপালী ব্যাংকের ১৩০ জন কর্মকর্তা-কর্মচারী, মসজিদের ৩৫ জন কর্মচারী এবং জেলা প্রশাসনের ১৯ জন স্টাফ অংশ নিচ্ছেন। অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেটের সভাপতিত্বে ৭ সদস্যের একটি উপ-কমিটি পুরো কার্যক্রম পরিচালনা করছে।
জনশ্রুতি অনুযায়ী, প্রায় আড়াইশ বছর আগে নরসুন্দা নদীর মাঝখানে জেগে ওঠা একটি টিলায় এক আধ্যাত্মিক পাগল সাধকের আস্তানা ছিল। তাঁর মৃত্যুর পর সেখানে গড়ে ওঠে পাগলা মসজিদ। এরপর থেকেই বিভিন্ন ধর্ম-বর্ণের মানুষ মানত ও দান নিয়ে এখানে আসতে শুরু করেন। নগদ অর্থের পাশাপাশি স্বর্ণ, রুপা, বৈদেশিক মুদ্রা, এমনকি গবাদিপশুও দান করার নজির রয়েছে।
বর্তমানে পাগলা মসজিদ দেশের অন্যতম আয়কারী ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান হিসেবে পরিচিত। মসজিদের দানের অর্থ দিয়ে মসজিদ, মাদরাসা, এতিমখানা ও বিভিন্ন সমাজকল্যাণমূলক কার্যক্রম পরিচালিত হয়। পাশাপাশি ছয়তলা বিশিষ্ট আধুনিক ইসলামি কমপ্লেক্স নির্মাণের পরিকল্পনাও রয়েছে। প্রায় ১১৫ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মাণাধীন এ কমপ্লেক্সে একসঙ্গে প্রায় ৫০ হাজার মুসল্লি নামাজ আদায় করতে পারবেন এবং নারীদের জন্য পৃথকভাবে পাঁচ হাজার মুসল্লির নামাজের ব্যবস্থা থাকবে।



