জনতার শক্তিতে উন্মুক্ত হলো নবাব ফয়জুন্নেছার ঐতিহাসিক প্রবেশপথ
কুমিল্লা (দক্ষিণ জেলা) প্রতিনিধি
প্রকাশ: ১৭ জুন ২০২৬, ০৪:১৮ পিএম
ঐতিহ্য ও ইতিহাস রক্ষায় সাধারণ মানুষের সচেতনতা আবারও প্রমাণ করল—জনগণের সম্মিলিত শক্তির কাছে অন্যায় কখনো স্থায়ী হতে পারে না। দীর্ঘ প্রায় আট মাস পর অবশেষে উন্মুক্ত হয়েছে উপমহাদেশের প্রথম মুসলিম নারী নবাব ফয়জুন্নেছা চৌধুরানীর ঐতিহাসিক বাড়ি ও জাদুঘরের প্রধান প্রবেশপথ। ১৬ জুন রাতে প্রবেশপথটি পুনরায় খুলে দেওয়া হলে স্থানীয়দের মধ্যে স্বস্তি ও আনন্দের পরিবেশ সৃষ্টি হয়।
এটি শুধু একটি গেট খোলার ঘটনা নয়; বরং দেশের গুরুত্বপূর্ণ ঐতিহাসিক ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য সংরক্ষণে জনসচেতনতা, প্রশাসনিক উদ্যোগ এবং আইনের শাসনের একটি উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত।
জানা যায়, কুমিল্লার লাকসাম উপজেলার পশ্চিমগাঁওয়ে অবস্থিত নবাব ফয়জুন্নেছা জমিদারবাড়ি জাদুঘরের গেজেটভুক্ত ঐতিহাসিক প্রবেশপথ গত বছরের ৩১ অক্টোবর রাতে স্থানীয় ব্যক্তি সৈয়দ আলী দেয়াল নির্মাণ করে বন্ধ করে দেন। এ ঘটনায় স্থানীয়দের মধ্যে ব্যাপক ক্ষোভের সৃষ্টি হয় এবং বিষয়টি বিভিন্ন মহলে আলোচনার জন্ম দেয়।
পরবর্তীতে ওয়াকফ প্রশাসন বিষয়টি আইনগতভাবে পর্যালোচনা করে মত দেয় যে, জনসাধারণের ব্যবহৃত চলাচলের পথ কোনো ব্যক্তি একক সিদ্ধান্তে বন্ধ করতে পারেন না। সেই প্রেক্ষিতে জাদুঘরের প্রবেশপথ উন্মুক্ত করার জন্য জেলা প্রশাসকের কাছে আনুষ্ঠানিক সুপারিশ করা হয়।
তথ্য অনুসন্ধানে জানা গেছে, সৈয়দ আলী ৩ মার্চ ২০২৪ সালে গেটের মালিকানা দাবি করে একটি মামলা দায়ের করেন, যা বর্তমানে বিচারাধীন। তবে মামলার নিষ্পত্তির আগেই তিনি ৩০ অক্টোবর ২০২৪ সালে দেয়াল নির্মাণ করে ঐতিহাসিক প্রবেশপথ বন্ধ করে দেন বলে অভিযোগ রয়েছে। এ-সংক্রান্ত একটি নিষেধাজ্ঞা (ইনজাংশন) মামলাও পরবর্তীতে নিম্ন আদালত খারিজ করে দেন।
লাকসাম পৌরসভা সূত্রে জানা যায়, প্রবেশপথ বন্ধ করে নির্মিত দেয়ালের কোনো বৈধ অনুমোদন ছিল না। বিষয়টি যাচাই-বাছাই শেষে পৌরসভা কর্তৃপক্ষ দেয়াল অপসারণ ও গেট উন্মুক্ত করার জন্য একাধিকবার নোটিশ প্রদান করলেও তা উপেক্ষা করা হয়। পৌরসভার মতে, অনুমোদন ছাড়া দেয়াল নির্মাণ এবং জনসাধারণের চলাচলের ঐতিহাসিক পথ বন্ধ করা স্থানীয় সরকার বিধিমালার সুস্পষ্ট লঙ্ঘন।
নথিপত্র পর্যালোচনায় আরও বিভিন্ন অসঙ্গতির তথ্য উঠে এসেছে। অভিযোগ রয়েছে, সৈয়দ আলীর দলিলের চৌহদ্দি নবাববাড়ির উত্তর প্রান্তে হলেও তিনি দক্ষিণ প্রান্তের জমির ওপর মালিকানা দাবি করছেন। এছাড়া তার দলিলদাতা রফিকুল হকের মালিকানাধীন জমির পরিমাণ ছিল মাত্র ১ দশমিক ৯ শতাংশ, অথচ সৈয়দ আলী ৫ শতাংশ জমির দলিল গ্রহণ করেছেন বলে অভিযোগ রয়েছে। এসব বিষয় নিয়ে জালিয়াতির অভিযোগও স্থানীয়ভাবে আলোচিত হচ্ছে।
গেট পুনরায় উন্মুক্ত হওয়ায় সন্তোষ প্রকাশ করে নবাব এস্টেটের মোতাওয়াল্লি সৈয়দ মাসুদুল হক বলেন, এটি শুধু একটি প্রবেশপথ নয়, আমাদের ইতিহাস, সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যের প্রতীক। জনগণের সচেতন ভূমিকা এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের উদ্যোগের কারণে আজ ঐতিহাসিক এই পথ আবারও মানুষের জন্য উন্মুক্ত হয়েছে।
নবাব ফয়জুন্নেছার পিতৃবংশের উত্তরসূরি ফজলে রহমান চৌধুরী আয়াজ বলেন, এই প্রবেশপথ অনেক আগেই খুলে দেওয়া উচিত ছিল। নবাববাড়ি কোনো ব্যক্তির নয়, এটি আমাদের জাতীয় ঐতিহ্যের অংশ এবং সকলের গর্বের স্থান।
আইনজীবী ফরিদ আহমেদ মজুমদার বলেন, জনস্বার্থে ব্যবহৃত কোনো চলাচলের পথ ব্যক্তি মালিকানার অজুহাতে বন্ধ করা যায় না। আইন এ ধরনের কর্মকাণ্ডকে সমর্থন করে না।
স্থানীয়দের প্রত্যাশা, ভবিষ্যতে নবাব ফয়জুন্নেছার ঐতিহাসিক বাড়ি ও জাদুঘরকে কেন্দ্র করে আর কোনো প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি হবে না। দেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ এই ঐতিহ্যবাহী স্থাপনাটি যথাযথ সংরক্ষণ, উন্নয়ন ও পরিচর্যার মাধ্যমে আগামী প্রজন্মের কাছে ইতিহাসের সাক্ষী হয়ে থাকবে।



