নরসিংদীতে উদ্বোধন হলো ‘বাংলার ঈগল’ ম্যুরাল
নরসিংদী প্রতিবেদক
প্রকাশ: ০২ জুন ২০২৬, ০৮:২৬ পিএম
মহান মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম শ্রেষ্ঠ বীর সন্তান ও জাতির গৌরব বীরশ্রেষ্ঠ মতিউর রহমান-এর জীবন, বীরত্ব ও আত্মত্যাগকে নতুন প্রজন্মের কাছে তুলে ধরার লক্ষ্যে নরসিংদীর রায়পুরায় নবনির্মিত ম্যুরাল ‘বাংলার ঈগল’ উদ্বোধন করা হয়েছে।
মঙ্গলবার (২ জুন) দুপুরে ঢাকা-সিলেট মহাসড়কের রায়পুরা উপজেলার মাহমুদাবাদ নামাপাড়া এলাকায় আয়োজিত এক অনুষ্ঠানের মাধ্যমে ম্যুরালটির আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করা হয়।
উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন ইঞ্জিনিয়ার আশরাফ উদ্দিন বকুল।
উক্ত অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন ইসরাত জাহান কেয়া। এছাড়াও উপস্থিত ছিলেন মো. আবদুল্লাহ আল-ফারুক, মো. মাসুদ রানা, মুনমুন পাল, বায়েজিদ বিন মনসুরসহ প্রশাসনের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা, রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ, বীর মুক্তিযোদ্ধা, সাংবাদিক ও স্থানীয় গণ্যমান্য ব্যক্তিরা।
রায়পুরা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. মাসুদ রানা জানান, পূর্বের নকশা ও স্থাপত্যিক বৈশিষ্ট্য অক্ষুণ্ণ রেখে ‘বাংলার ঈগল’ ম্যুরালটি নতুনভাবে আরও বৃহৎ পরিসরে ও নান্দনিক রূপে নির্মাণ করা হয়েছে। নতুন ম্যুরালের উচ্চতা ৩১ ফুট এবং প্রস্থ ২২ ফুট, যেখানে পূর্ববর্তী কাঠামোর উচ্চতা ছিল ১৬ ফুট ও প্রস্থ ছিল ১২ ফুট। ফলে স্মৃতিচিহ্নটি এখন আরও দৃষ্টিনন্দন ও দর্শনার্থীদের জন্য আকর্ষণীয় হয়ে উঠেছে।
তিনি আরও জানান, ঢাকা-সিলেট মহাসড়কের প্রশস্তকরণ প্রকল্পের কারণে গত ২০ জানুয়ারি সংশ্লিষ্ট পরিবারের সম্মতি নিয়ে বীরশ্রেষ্ঠ মতিউর রহমানের ভাস্কর্যটি সাময়িকভাবে অপসারণ করেছিল সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তর। পরবর্তীতে নতুন পরিসরে পুনর্নির্মাণের উদ্যোগ গ্রহণ করা হয় এবং সেই ধারাবাহিকতায় বর্তমান ম্যুরালটি নির্মিত হয়েছে।
উল্লেখ্য, বীরত্ব, আত্মত্যাগ ও দেশপ্রেমের প্রতীক
বীরশ্রেষ্ঠ মতিউর রহমান বাংলাদেশের সাতজন বীরশ্রেষ্ঠের একজন। মহান মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে মাতৃভূমিকে শত্রুমুক্ত করার দৃঢ় সংকল্প নিয়ে তিনি পাকিস্তানের বিমানঘাঁটি থেকে একটি যুদ্ধবিমান নিয়ে বাংলাদেশের উদ্দেশ্যে রওনা দেন। স্বাধীনতার পক্ষে সেই সাহসী অভিযানের সময় বিমান দুর্ঘটনায় তিনি শহীদ হন। দেশের স্বাধীনতার জন্য তাঁর অসীম সাহস, বীরত্ব ও আত্মত্যাগের স্বীকৃতিস্বরূপ বাংলাদেশ সরকার তাকে সর্বোচ্চ সামরিক বীরত্বসূচক খেতাব ‘বীরশ্রেষ্ঠ’ প্রদান করে।
বীরশ্রেষ্ঠ মতিউর রহমানের জন্মস্থান নরসিংদীর রায়পুরা উপজেলার রামনগর গ্রামে। তার স্মৃতি সংরক্ষণ ও মুক্তিযুদ্ধের চেতনা নতুন প্রজন্মের মাঝে ছড়িয়ে দিতে ২০০৮ সালে সেখানে একটি জাদুঘর নির্মাণ করা হয়। একইসঙ্গে ঢাকা-সিলেট মহাসড়কের পাশে মাহমুদাবাদ নামাপাড়া এলাকায় নির্মিত হয় স্মৃতিফলক ‘বাংলার ঈগল’। ত্রিমুখী কালো পাথরে নির্মিত এই স্মারক স্থাপনাটির এক পাশে রয়েছে বীরশ্রেষ্ঠ মতিউর রহমানের প্রতিকৃতি, অন্য পাশে তাঁর জীবনবৃত্তান্ত। তৃতীয় স্তম্ভটি খোলা আকাশের প্রতীক হিসেবে ফাঁকা রাখা হয়েছে, যা তাঁর স্বপ্ন, সাহস ও অসীম সম্ভাবনার প্রতীক হিসেবে বিবেচিত।
স্মারকের কেন্দ্রস্থলে ত্রিভুজাকৃতির একটি স্তম্ভে টেরাকোটার মাধ্যমে মহান মুক্তিযুদ্ধের বিভিন্ন ঐতিহাসিক দৃশ্য ফুটিয়ে তোলা হয়েছে। আর সর্বোচ্চ স্থানে স্থাপিত যুদ্ধবিমানের ভাস্কর্যটি বীরশ্রেষ্ঠ মতিউর রহমানের আকাশজয়ী সাহসিকতা ও আত্মত্যাগের স্মারক হিসেবে দর্শনার্থীদের দৃষ্টি আকর্ষণ করে। এটি একই সঙ্গে তাঁর গ্রামের প্রবেশদ্বারের প্রতীক হিসেবেও ব্যবহৃত হচ্ছে।
স্থানীয় প্রশাসনের মতে, ‘বাংলার ঈগল’ শুধু একটি ম্যুরাল নয়, এটি মহান মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস, দেশপ্রেম, আত্মত্যাগ এবং জাতীয় গৌরবের এক জীবন্ত প্রতীক। বীরশ্রেষ্ঠ মতিউর রহমানের বীরত্বগাথা নতুন প্রজন্মের কাছে পৌঁছে দিতে এবং মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে আরও সুদৃঢ় করতে এই স্মারক গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে। তার প্রতি জাতির গভীর শ্রদ্ধা ও কৃতজ্ঞতার স্থায়ী নিদর্শন হিসেবেই “বাংলার ঈগল” আগামী দিনগুলোতে ইতিহাস সচেতন মানুষের কাছে বিশেষ আকর্ষণের কেন্দ্র হয়ে থাকবে।



