কিশোরগঞ্জে বিয়ের প্রলোভনে তরুণীকে ধর্ষণের অভিযোগ
কিশোরগঞ্জ প্রতিনিধি
প্রকাশ: ২৩ মে ২০২৬, ১২:৩৩ পিএম
কিশোরগঞ্জ সদর উপজেলার যশোদল ইউনিয়নে বিয়ের প্রলোভন দেখিয়ে এক তরুণীকে (২১) একাধিকবার ধর্ষণের অভিযোগ উঠেছে স্থানীয় যুবক মো. মিজান মিয়ার (২৫) বিরুদ্ধে।
এ ঘটনায় ভুক্তভোগী তরুণী বাদী হয়ে কিশোরগঞ্জ মডেল থানায় একটি লিখিত অভিযোগ দায়ের করেছেন। ঘটনাটি এলাকায় ব্যাপক চাঞ্চল্যের সৃষ্টি করেছে। অভিযুক্ত মো. মিজান মিয়া সদর উপজেলার যশোদল ইউনিয়নের বানিয়াকান্দি গ্রামের কাশেম মিয়ার ছেলে।
অভিযোগ সূত্রে জানা যায়, প্রায় এক বছর আগে যশোদল ইউনিয়নের মধ্য যশোদল এলাকার ওই তরুণী কম্পিউটার শেখার উদ্দেশ্যে মিজান মিয়ার পরিচালিত একটি কোচিং সেন্টারে ভর্তি হন। শুরুতে শিক্ষক-শিক্ষার্থীর সম্পর্ক থাকলেও ধীরে ধীরে অভিযুক্ত তার সঙ্গে ব্যক্তিগতভাবে যোগাযোগ বাড়াতে থাকেন। একপর্যায়ে মিজান মিয়া তরুণীকে প্রেমের প্রস্তাব দেন। প্রথমদিকে তরুণী এতে সাড়া না দিলেও পরবর্তীতে বিয়ের আশ্বাস ও ভবিষ্যতে সংসার করার প্রতিশ্রুতি দিয়ে তার সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক গড়ে তোলেন।
ভুক্তভোগীর অভিযোগ, সম্পর্ক গভীর হওয়ার পর অভিযুক্ত বিভিন্ন সময় তাকে দেখা করার জন্য চাপ দিতেন এবং বিয়ের প্রতিশ্রুতি দিয়ে বিভিন্ন স্থানে নিয়ে যেতেন। একপর্যায়ে সেই সুযোগে তার ইচ্ছার বিরুদ্ধে একাধিকবার শারীরিক সম্পর্ক স্থাপন করেন। তবে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে অভিযুক্তের আচরণে পরিবর্তন দেখা দিতে শুরু করে।
অভিযোগে বলা হয়, কয়েক মাস ধরে বিয়ের বিষয়টি চূড়ান্ত করার জন্য তরুণী চাপ দিলে মিজান মিয়া নানা অজুহাতে বিষয়টি এড়িয়ে যেতে থাকেন। কখনো পারিবারিক সমস্যা, কখনো আর্থিক অজুহাত দেখিয়ে সময়ক্ষেপণ করেন। একপর্যায়ে স্থানীয় কয়েকজনের মাধ্যমে তরুণী জানতে পারেন, অভিযুক্ত অন্যত্র বিয়ের চেষ্টা করছেন। বিষয়টি জানার পর তিনি মানসিকভাবে ভেঙে পড়েন এবং প্রতারণার শিকার হয়েছেন বলে অনুভব করেন।
ভুক্তভোগী তরুণীর দাবি, গত ১৮ মে সকাল আনুমানিক ৭টার দিকে তিনি অভিযুক্তের কোচিং সেন্টারে গিয়ে বিয়ের বিষয়ে চূড়ান্তভাবে কথা বলতে চান। এ সময় মিজান মিয়া ক্ষিপ্ত হয়ে তাকে অকথ্য ভাষায় গালিগালাজ করেন এবং বিয়ে করতে সরাসরি অস্বীকৃতি জানান। অভিযোগে আরও বলা হয়, তরুণী মামলা বা থানায় অভিযোগ করার কথা বললে অভিযুক্ত তাকে ভয়ভীতি ও প্রাণনাশের হুমকি দেন।
তরুণী জানান, ২০২৫ সালের ২২ সেপ্টেম্বর থেকে তিনি নিয়মিতভাবে ওই কোচিং সেন্টারে ক্লাস করতে যেতেন। সে সময় তিনি কলেজে ভর্তি হওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন। তবে সম্পর্ক গড়ে ওঠার পর অভিযুক্ত তাকে কলেজে ভর্তি না হওয়ার জন্য চাপ দেন। বিয়ের আশ্বাস ও সম্পর্কের বিশ্বাসের কারণে তিনি কলেজে ভর্তি কার্যক্রম পিছিয়ে দেন বলেও তিনি অভিযোগ করেন।
ভুক্তভোগী বলেন, আমাদের সম্পর্ক গভীর হওয়ার পর একাধিকবার শারীরিক সম্পর্ক হয়েছে। সে আমাকে বারবার বলেছে, সে আমাকে বিয়ে করবে। আমার পরিবারও বিষয়টি জানত এবং তার ওপর বিশ্বাস করেছিল। কিন্তু এখন সে সবকিছু অস্বীকার করছে, অপমানজনক ভাষায় কথা বলছে এবং অন্যত্র বিয়ের চেষ্টা করছে। আমি এখন সামাজিকভাবে চরম বিব্রত ও মানসিকভাবে ভেঙে পড়েছি।
তিনি আরও বলেন, প্রথমদিকে সামাজিক সম্মান ও ভবিষ্যতের কথা ভেবে বিষয়টি কাউকে জানাইনি। কিন্তু যখন বুঝতে পারলাম সে আমার সঙ্গে প্রতারণা করছে এবং বিয়ে করবে না, তখন আমি আইনের আশ্রয় নেওয়ার সিদ্ধান্ত নিই।
তরুণীর এক স্বজন বলেন, ছেলেটি দীর্ঘদিন ধরে বিয়ের আশ্বাস দিয়ে মেয়েটির সঙ্গে সম্পর্ক চালিয়ে গেছে। পরিবার থেকেও তাকে বিশ্বাস করা হয়েছিল। এখন বিয়ে না করে অন্যত্র বিয়ের চেষ্টা করার খবর পাওয়ার পর মেয়েটি ভেঙে পড়েছে।
স্থানীয় কয়েকজন বাসিন্দা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, মিজান মিয়া এলাকায় কোচিং পরিচালনা করতেন এবং তরুণীর সঙ্গে তার ঘনিষ্ঠ সম্পর্কের বিষয়টি অনেকেই জানতেন। তবে বিষয়টি এভাবে এতোদূর গড়াবে, তা তারা ভাবেননি। এ ধরনের ঘটনায় সুষ্ঠু তদন্ত হওয়া জরুরি। তারা অভিযোগের সুষ্ঠু তদন্ত করে প্রকৃত ঘটনা উদঘাটনের দাবি জানান।
স্থানীয় কয়েকজন নারীও এ ঘটনায় উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। তাদের ভাষ্য, বিয়ের আশ্বাস দিয়ে প্রতারণা ও সম্পর্ক গড়ে তোলার ঘটনা দিন দিন বাড়ছে। এমন ঘটনায় দ্রুত বিচার ও সামাজিক সচেতনতা প্রয়োজন বলে মনে করেন তারা।
অভিযোগের বিষয়ে বক্তব্য জানতে অভিযুক্ত মিজান মিয়ার মোবাইল ফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলে তিনি অভিযোগের বিষয়টি শুনেই কোনো মন্তব্য না করে ফোন কেটে দেন। পরবর্তীতে পুনরায় যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তার কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
এ বিষয়ে কিশোরগঞ্জ সদর উপজেলার যশোদল ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান ইমতিয়াজ সুলতান রাজনের সঙ্গে ফোনে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, বিষয়টি সম্পর্কে আমি অবগত আছি। ইতোমধ্যে অভিযুক্ত যুবক ও তার বাবার সঙ্গে আমার কথা হয়েছে। উভয় পক্ষের অভিযোগ ও বক্তব্য শুনে বিষয়টি গুরুত্বসহকারে দেখা হবে।
তিনি আরও বলেন, যেহেতু একটি লিখিত অভিযোগ থানায় দেওয়া হয়েছে, তাই আইন অনুযায়ী তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত ঘটনা বের হয়ে আসবে। কেউ যেন আইনের বাইরে গিয়ে কোনো ধরনের অপ্রীতিকর পরিস্থিতি সৃষ্টি না করে, সে বিষয়েও সবাইকে সতর্ক থাকতে বলা হয়েছে।
কিশোরগঞ্জ সদর মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মোহাম্মদ আবুল কালাম ভূঞা বলেন, অভিযোগটি গ্রহণ করা হয়েছে। বিষয়টি তদন্ত করে প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।



