আগামী ৭ মে, বৃহস্পতিবার। এই দিনটি বৈরি সময়ে আন্দোলনের পুরোধা, নারায়ণগঞ্জের মাটি ও মানুষের প্রিয় মুখ এটিএম কামালের ৬৮তম জন্মদিন। অন্যায় ও স্বেচ্ছাচারিতার বিরুদ্ধে আপসহীন সংগ্রামের প্রতীক হিসেবে পরিচিত এই নেতার রয়েছে এক বর্ণাঢ্য জীবন। একজন সমাজকর্মী, রাজনীতিবিদ, পরিবেশবাদী নির্ভীক নেতা হিসেবে মাটি ও মানুষের কল্যাণে কখনও তিনি প্রশংসিত, কখনও বা সমালোচিত। ১৯৫৮ সালের ৭ মে সোনারগাঁয়ের বারদির মসলন্দপুর গ্রামে এক সম্ভ্রান্ত মুসলিম পরিবারে এটিএম কামালের জন্ম। তার বাবা মরহুম তাহের মাস্টার এবং মা বিশিষ্ট নারী নেত্রী মরহুমা শাহানা খানম চৌধুরী। মাত্র ১৩ বছর বয়সেই এটিএম কামাল মহান মুক্তিযুদ্ধে সক্রিয় অংশগ্রহণ করেন। সোনারগাঁয়ের মুক্তিযোদ্ধাদের ট্রেনিং ক্যাম্পে প্রশিক্ষন গ্রহণ করার পর তিনি কমান্ডার মমিন ভূইয়া ফুলু গ্রুপের সদস্য হিসেবে দেশের স্বাধীনতার লড়াইয়ে ঝাঁপিয়ে পড়েন।
নারায়ণগঞ্জের রাজনীতির মাঠে অকুতোভয় রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব মহানগর বিএনপির সাবেক সাধারণ সম্পাদক এটিএম কামাল এক অবিচল নাম। আওয়ামী দমননীতির বিরুদ্ধে তিনি ছিলেন অদম্য সোচ্চার, অন্যায় আর সেচ্ছাচারিতার বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াতেন রাজপথে, অলিগলিতে। আওয়ামী লীগের সাথে অসম যুদ্ধ জেনেও কখনো পিছ পা হন নি সদা হাস্যোজ্জ্বল ও নিরহংকারী এই নেতা। ফ্যাসিষ্টের সাথে এই অসম যুদ্ধে হয়েছেন হত্যাকান্ড, রাষ্ট্রদ্রোহ, বিষ্ফোরক, অগ্নিসংযোগ সহ ৫০টিরও বেশি মামলার আসামি। নারায়ণগঞ্জ জেলার প্রত্যেকটি থানাতেই তার বিরুদ্ধে মামলা রয়েছে। এটিএম কামাল গত ১৬ বছরে পর্যায়ক্রমে জেল খেটেছেন প্রায় ৩ বছর।
ফ্যাসিষ্ট আওয়ামী পুলিশের তালিকায় কামাল সবসময় ছিলেন ‘মোষ্ট ওয়ান্টেট’। থানা থেকে এটিএম কামালকে যেখানে দেখা যাবে সেখানেই তাকে সরাসরি গুলি করার নির্দেশও ছিল সে সময়। সংগ্রামের এই দীর্ঘ সময়ে এটিএম কামাল অগনিতবার গ্রেফতার হয়েছেন। কর্মসূচি পালন করতে গিয়ে বহুবার রক্তাক্ত সহ গুলি আর লাঠিপেটার মুখোমুখি হয়েছেন। গ্রেফতার, হামলা-মামলা, রিমান্ড সব ধরনের নির্যাতন সহ্য করেও দুঃসময়ে দলীয় হাজার হাজার কর্মসূচি পালন করে গেছেন এটিএম কামাল। ২০১৮ এর জাতীয় নির্বাচনের সময় বাড়ীতে এসে এটিএম কামালকে না পেয়ে যৌথবাহিনী তার একমাত্র ছেলেকে গ্রেফতার করে নিয়ে যায়।
এটিএম কামাল নিজের জীবন ও পরিবারকে উপেক্ষা করে দলের কিঠোর দুঃসময়ে নেমে পড়েছেন রাজপথে। বার বার গ্রেফতার হয়েছেন, মামলা খেয়েছেন, কারাবরণ করেছেন। নাজেহাল হয়েছেন শারীরিক ও মানসিকভাবে। তবুও দমানো যায় নি এটিএম কামালকে। আর এই অদম্য মনোভাবের জন্যই দলীয় প্রধান বেগম খালেদা জিয়ার নিকট তিনি আস্থার স্থান লাভ করতে পেরেছিলেন। এটিএম কামাল কারাগারে বন্দি অবস্থায় পরিবারের খোজখবর নেয়া সহ আইনী সহযোগীতার ব্যবস্থাও করেছিলেন বেগম খালেদা জিয়া।
প্রাচ্যের ড্যান্ডি নারায়ণগঞ্জের মাটি ও মানুষের সুখে-দুঃখে নিজেকে একাকার করে ফেলেছিলেন এটিএম কামাল। অসংখ্য সফল রাজনৈতিক ও সামাজিক আন্দোলনের নেতৃত্ব দিয়ে ব্যাপক আলোচিত হন তিনি। মানুষের অধিকার আদায়ের সংগ্রামে তিনি কখনও আপোষ করেননি। অন্যায় আর স্বেচ্ছাচারিতার বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়িয়েছেন নিঃশঙ্ক চিত্তে। কখনও রাজপথে, কখনও শহীদ মিনারে, প্রেস ক্লাব চত্ত্বরে, মিছিলে, সমাবেশে, অনশনে অবিচল তিনি। স্বার্থান্বেষীদের রক্তচক্ষু, হামলা, মামলা, জেল, জুলুম হুলিয়া থামাতে পারেনি তাকে। তাইতো সমালোচকেরা বলে, থামতে জানে না এটিএম কামাল।
তার উল্লেখযোগ্য কিছু আন্দোলনের মধ্যে রয়েছে, ১/১১ পরবর্তি তৎকালিন সেনা সমর্থিত সরকারের বিরুদ্ধে জীবনের ঝুকি নিয়ে দল ও জিয়া পরিবারের চরম দুঃসময়ে দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়া, তারেক রহমান ও আরাফাত রহমান কোকো'কে মুক্তি দিয়ে বিদেশে চিকিৎসার জন্য পাঠানোর দাবিতে ১২ দিনের আমরণ অনশন। টিপাইমুখ বাঁধ নির্মাণের প্রতিবাদে ঢাকার মুক্তাঙ্গন থেকে সিলেট জকিগঞ্জের অমলসিদ পর্যন্ত সাড়ে ৩০০ কিলোমিটার পদযাত্রা। সুন্দরবন বাঁচাও আন্দোলনে রামপাল তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্রের প্রতিবাদে নারায়ণগঞ্জ থেকে রামপাল ফয়লাহাট পর্যন্ত ২২৫ কিলোমিটার পদযাত্রা। সাংবাদিক দম্পতি সাগর-রুনি হত্যাকান্ডের বিচার দাবিতে ৪৮ ঘণ্টার অনশন।
তৎকালীন রাজনৈতিক অস্থিরতার সময় বিরোধী দলীয় নেতাকর্মীদের গুমের প্রতিবাদে এটিএম কামাল কাফনের কাপড়কে তার সঙ্গি করেন। গলায় কাফনের কাপড় জড়িয়ে রাজপথে নেমে আসা তার এই সাহসী পদক্ষেপ রাজনৈতিক অঙ্গনে আলোচনার জন্ম দেয় এবং কর্মীদের মনে সাহস সঞ্চার করে। দেশ ও দলের চরম দুঃসময়ে কর্মীদের সাহস যোগানো এবং ন্যায়ের পথে আপসহীন থাকা মৃত্যুঞ্জয়ী এই নেতার জীবন থেকে শিক্ষা নেয় অগণিত তরুণ। ৬৮তম জন্মদিনে তার দীর্ঘায়ু ও সুস্থতা কামনা করেন নারায়ণগঞ্জের সর্বস্তরের মানুষ।



