চট্টগ্রামে সাবেক মেয়র মঞ্জুর বাসায় গিয়ে তোপের মুখে হাসনাত আবদুল্লাহ
নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রকাশ: ১৫ এপ্রিল ২০২৬, ০৯:২১ এএম
চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের সাবেক মেয়র মোহাম্মদ মনজুর আলমের বাসায় গিয়ে জুলাইযোদ্ধা, ছাত্রদল নেতাকর্মী ও বিক্ষুব্ধ জনতার তোপের মুখে পড়েছেন জাতীয় নাগরিক পার্টি, এনসিপির দক্ষিণাঞ্চলের মুখ্য সংগঠক ও সংসদ সদস্য হাসনাত আব্দুল্লাহ।
মঙ্গলবার (১৪ এপ্রিল) বিকেল ৬টায় চট্টগ্রামের আকবর শাহ থানার উত্তর কাট্টলীর এইচ এম ভিলা থেকে বের হওয়ার সময় ঘটে এ ঘটনা। ২০১৮ সালের একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে আওয়ামী লীগের মনোনয়ন চাওয়া সেই মেয়র মঞ্জুকে আবারও এনসিপির ব্যানারে চসিক নির্বাচনের মাধ্যমে সামনে আনায় পাঁয়তারা হচ্ছে, এমন অভিযোগে হাসনাতের গাড়ি আটকে দেয় জুলাইযোদ্ধা ও বিএনপি নেতাকর্মীরা। জুলাইকে ধারণ করে আওয়ামী লীগ নেতা ও জুলাই যোদ্ধাদের উপর হামলা চালানো সেই ব্যক্তির সঙ্গে কিভাবে গোপন মিটিং করছেন তিনি, এসব প্রশ্নে তোপের মুখে পড়েন হাসনাত। প্রায় ঘণ্টাখানেক ধরে চলে তর্ক বিতর্ক, প্রশ্ন। ছড়িয়ে পড়ে উত্তেজনা। নানা ধরনের স্লোগান দিতেও দেখা যায় ক্ষুব্ধ নেতাকর্মীদের। এক পর্যায়ে পুলিশ প্রটোকল ও স্থানীয় বিএনপি নেতাদের সহযোগিতায় নিরাপদে ঘটনাস্থল ত্যাগ করেন হাসনাত।
এ বিষয়ে এনসিপির দক্ষিণাঞ্চলের মুখ্য সংগঠক হাসনাত আব্দুল্লাহ জানান, দিনশেষে রাজনীতিতে আমাদের অনেক মতপার্থক্য থাকবে। এটা রাজনৈতিক গণতন্ত্রের সুন্দর্য। একইসঙ্গে বেসিক রাজনীতির বাইরে গিয়েও আমাদের হৃদ্রতাপূর্ণ সম্পর্ক থাকবে।
ঘটনাস্থলে উপস্থিত ছিলেন মহানগর যুবদলের সহসভাপতি সাহেদ আকবর, নগর ছাত্রদলের সাবেক সহ সভাপতি মেজবাহউল নোমান , ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রদলের সাবেক আহবায়ক প্রকৌশলী মোহাম্মদ কায়েস, চট্টগ্রাম মহানগর ছাত্রদলের যুগ্ম আহ্বায়ক রাজিবুল হক বাপ্পি, যুগ্ম আহ্বায়ক মহারম আলী, আকবরশাহ থানা ছাত্রদলের সভাপতি ফাহিম উদ্দিন, ইসলামিয়া কলেজ ছাত্রদলের ইমনসহ আরও অনেকে।
তবে এই বিষয়ে জানতে সাবেক মেয়র মোহাম্মদ মনজুর আলমকে বেশ কয়েকবার ফোন দিলেও তিনি রিসিভ করেননি। এছাড়া এই বিষয়ে কোন মন্তব্য করতে অস্বীকৃতি জানান আকবর শাহ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মো. কামরুজ্জামান।
খোঁজ নিয়ে জানা যায় বিকেল তিনটার দিকে গোপনে চট্টগ্রামে এসে হাসনাত আবদুল্লাহ সাবেক মেয়র মন্জুর বাসায় প্রবেশ করলেও শুরুতে বিষয়টি পুরোপুরি গোপন রাখা হয়। খবর পেয়ে মন্জুর আলমের বাসার গলিতে হাজির হন শতাধিক ছাত্রদল নেতা কর্মী। গণমাধ্যম কর্মীরা জড়ো হতে থাকেন মন্জুর আলমের বাসার সামনে। তবে ওই সময় চট্টগ্রামের এনসিপি নেতারা হাসনাত আবদুল্লাহর চট্টগ্রাম সফর সম্পর্কে গণমাধ্যমকে কোন তথ্য দিতে পারেন নি। বিকেল পাঁচটার দিকে গণমাধ্যমকে মন্জুর আলমের পরিবারের পক্ষ থেকে হাসনাতের সাথে বৈঠককে গুজব বলে উড়িয়ে দেয়া হয়।
স্থানীয় দোকানদাররাও হাসনাত আবদুল্লাহকে ওই এলাকায় দেখেন নি বলে উপস্থিত গণমাধ্যম কর্মীদের জানান ।
বিকেল পৌঁনে পাঁচটার দিকে দুটি গাড়ি মন্জুর আলমের বাসা থেকে তাড়াহুড়ো করে বের হতে দেখা যায়। অনেকেই ধারনা করেন দুটি গাড়ির একটিতে হাসনাত আবদুল্লাহ ওই বাড়ি থেকে বের হয়ে চলে গেছেন। উপস্থিত গণমাধ্যম কর্মীরা বিভ্রান্ত হয়ে সাবেক মেয়র মন্জুর আলমের বাসার স্থান ত্যাগ করার এক ঘন্টার পরে ওই বাড়ি থেকে বের হতে দেখা যায় তাকে। সাথে সাথে উপস্থিত ছাত্র জনতা তাকে ঘিরে প্রশ্নবাণে জর্জরিত করেন। একজন জুলাই যোদ্ধা হয়ে কেন ফ্যাসিবাদের দোসর সাবেক মেয়র মন্জুর আলমের বাসায় এলেন হাসনাত - এমন প্রশ্নের উত্তর দিতে ধৈর্য ও স্বাভাবিকতা বজায় রাখেন হাসনাত আবদুল্লাহ। এ বিষয়ে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ভিডিও ভাইরাল হয়ে যায় সন্ধ্যা সাড়ে ছয়টার মধ্যে।
খবর পেয়ে আকবর শাহ থানার পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে সংক্ষুব্ধ ছাত্র জনতার তোপ মুখ থেকে উদ্ধার করে সংসদ সদস্য হাসনাত আবদুল্লাহকে।
বৈঠকে উপস্থিত থাকা একটি সুত্র জানিয়েছে, হাসনাত আবদুল্লাহ ও সাবেক মেয়র মন্জুর আলম দেশের চলমান রাজনৈতিক পরিস্থিতি, জনসম্পৃক্ততা বৃদ্ধি এবং এনসিপির ভবিষ্যৎ সাংগঠনিক বিভিন্ন কার্যক্রম নিয়ে বিস্তারিত মতবিনিময় করেন।অত্যন্ত সৌহার্দ্যপূর্ণ পরিবেশে অনুষ্ঠিত এই বৈঠকে উভয় নেতাই আগামী দিনে পারস্পরিক সহযোগিতা অব্যাহত রাখার বিষয়ে আশাবাদ ব্যক্ত করেছেন।
সুত্রটির দাবি, দুই নেতার এই হৃদ্যতাপূর্ণ সাক্ষাৎ সামনের চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন নির্বাচন ঘিরে রাজনৈতিক অঙ্গনে একটি ইতিবাচক বার্তা বহন করবে।
২০২৪ সালের নির্বাচনে আওয়ামী লীগ থেকে মনোনয়ন চাওয়া বিতর্কিত ব্যক্তির সাথে চুপিচুপি সাক্ষাতের বিষয়ে জানতে চাইলে জাতীয় নাগরিক পার্টির চট্টগ্রাম মহানগর সমন্বয়কারী সদস্য ও মিডিয়া সেলের প্রধান সমন্বয়কারী রিদুয়ান হৃদয় বলেন, "হাসনাত আবদুল্লাহ মূলত ব্যক্তিগত কাজে চট্টগ্রামে এসেছিলেন। এ সময় সাবেক মেয়র মঞ্জুরুল আলমের আমন্ত্রণে সাড়া দিয়ে তিনি তাঁর সাথে সৌজন্য সাক্ষাতে মিলিত হন। আগামীর রাজনীতি হবে এমন সৌহার্দপূর্ণ ও জনগণের।"
এনসিপি থেকে নির্বাচিত সংসদ সদস্য হাসনাত আবদুল্লাহ ও চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের সাবেক মেয়র মন্জুর আলমের ( জুলাই গণ অভ্যুত্থানে ছাত্রদের বিরুদ্ধে অর্থ যোগানদাতা) গোপন বৈঠক নিয়ে পুরো শহরে নানামুখী আলোচনা সমালোচনা শুরু হয়েছে।
স্থানীয় মুদি দোকানদার আবদুর রউল বলেন, সাবেক মেয়র মন্জুর আলম সব সময় টাকা ব্যবহার করে রাজনীতি করেছেন। টাকা দিয়ে আওয়ামী মনোনয়ন নিতে চেয়েছিলেন। জুলাই গণ অভ্যুত্থানের প্রথম সারির নেতা হাসনাত আবদুল্লাহ এনসিপিতে তাকে পদ দেয়ার গোপনে টাকা নিতে এসেছেন কিনা সেটি খতিয়ে দেখা উচিত। '
জুলাই গণ অভ্যুত্থান চট্টগ্রামের রাজপথে নেতৃত্বদানকারী শীর্ষ সমন্বয়কদের একজন রিদুয়ান সিদ্দিকী। জানতে চাইলে তিনি বলেন, গোপনে কোন কিছুই শুভকর নয়। যেহেতু গোপনে ফ্যাসিবাদের দোসর, অর্থের যোগানদাতা মন্জুর আলমের বাসায় জুলাই গণ অভ্যুত্থানের শীর্ষস্থানীয় নেতার বৈঠক হয়েছে - একারণে আর্থিক সুবিধা নিয়ে আওয়ামী লীগের মনোনয়ন প্রত্যাশী বিতর্কিত ব্যক্তিকে এনসিপিতে পদ দেবার চক্রান্ত হচ্ছে - এমন প্রশ্ন উঠতেই পারে। '
প্রসঙ্গত, মোহাম্মদ মনজুর আলম ২০১০ সালে চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের নির্বাচনে বিএনপির সমর্থন নিয়ে মেয়র নির্বাচিত হয়ে আলোচনায় আসেন। ‘রাজনৈতিক গুরু’ হিসেবে পরিচিত সাবেক মেয়র প্রয়াত এ বি এম মহিউদ্দিন চৌধুরীকে পরাজিত করে চমক সৃষ্টি করেছিলেন তিনি। মেয়র হওয়ার পর বিএনপির চেয়ারপারসনের উপদেষ্টাও হয়েছিলেন। তবে বিএনপির দুঃসময়ে আওয়ামী লীগে ফিরেন তিনি। সক্রিয় হন আওয়ামী লীগের রাজনীতিতে । বেশ কিছুদিন ধরে রাজনীতির মাঠে শোনা যাচ্ছিলো চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন নির্বাচনে মেয়র পদে এনসিপি থেকে নির্বাচন করতে পারেন সাবেক মেয়র মন্জুর আলম। একারণে মন্জুর আলম ও হাসনাত আবদুল্লাহ আজকের গোপন বৈঠকটি তাৎপর্যপূর্ণ বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।



