কটিয়াদীতে প্রবাসীর বাড়িতে হামলা, মারধর ও লুটপাটের অভিযোগ
কিশোরগঞ্জ প্রতিনিধি
প্রকাশ: ০৪ এপ্রিল ২০২৬, ০৪:০৮ পিএম
কিশোরগঞ্জের কটিয়াদীতে এক প্রবাসীর বাড়িতে হামলা, মারধর ও লুটপাটের অভিযোগ উঠেছে। এতে প্রবাসীর বর্তমান স্ত্রীসহ অন্তত তিনজন গুরুতর আহত হয়েছেন।
শুক্রবার (০৩ এপ্রিল) বিকেলে ভুক্তভোগী প্রবাসী মাসুদ মিয়া (৪৫) বাদী হয়ে কটিয়াদী মডেল থানায় ১২ জনের নাম উল্লেখ করে লিখিত অভিযোগ করেছেন। এর আগে গত ২৬ মার্চ বিকেলে উপজেলার বনগ্রাম ইউনিয়নের নোয়াগাঁও গ্রামে এ ঘটনা ঘটে।
অভিযোগে বলা হয়েছে, প্রধান বিবাদী সুলতান মিয়া ও মাসুদের সাবেক স্ত্রী মোছা. অজুফা খাতুনের সঙ্গে দীর্ঘদিন ধরে পারিবারিক ও সম্পত্তি নিয়ে বিরোধ চলছিল। প্রবাসে থাকা অবস্থায় মাসুদ মিয়ার পাঠানো অর্থ দিয়ে অজুফা খাতুন নিজের নামে সম্পত্তি ক্রয় করেন বলে অভিযোগ রয়েছে। দেশে ফিরে সেই টাকার হিসাব চাইলে বিরোধ আরও তীব্র হয়।
ভুক্তভোগীর অভিযোগ, গত ২৬ মার্চ বিকেল ৪টার দিকে সুলতান মিয়ার নির্দেশে একদল লোক দেশীয় অস্ত্র নিয়ে তার বাড়িতে হামলা চালায়। তারা ঘরে ঢুকে মাসুদের বর্তমান স্ত্রী বিলকিস বেগমকে মারধর করে এবং ধারালো অস্ত্র দিয়ে আঘাত করে গুরুতর জখম করে। এ সময় মাসুদ মিয়া ও তার বাবা আব্দুল লতিফ (৬৫) এগিয়ে এলে তাদেরও মারধর করা হয়। এতে মাসুদের হাত ভেঙে যায় এবং তিনজনই গুরুতর আহত হন।
একপর্যায়ে হামলাকারীরা ঘরের আলমারি ভেঙে নগদ ৪১ হাজার টাকা, চারটি স্বর্ণের চুড়ি ও একটি চেইনসহ প্রায় চার লাখ টাকার মালামাল লুট করে নিয়ে যায় বলে অভিযোগে উল্লেখ করা হয়। আহতদের চিৎকারে স্থানীয়রা এগিয়ে এলে হামলাকারীরা পালিয়ে যায়। পরে তাদের উদ্ধার করে কিশোরগঞ্জ সদর হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। বর্তমানে তারা সেখানে চিকিৎসাধীন রয়েছেন।
প্রতিবেশী শামসুল হক বলেন, মাসুদ প্রবাস থেকে ফেরার পর আমরা জানতে পারি যে, তার স্ত্রী টাকা-পয়সা ও প্রয়োজনীয় নথিপত্র নিয়ে বাবার বাড়ি চলে গেছেন। এ নিয়ে পরে মামলা হলে স্থানীয়ভাবে কয়েকবার সালিস-বৈঠকও হয়েছে, কিন্তু কোনো সমাধান হয়নি। এরই মধ্যে মাসুদ বাড়িতে ফেরার পর সম্প্রতি এই বর্বর হামলার ঘটনাটি ঘটে। ঘটনার সময় কেউ সাহস করে এগিয়ে না আসায় আমি নিজেই তাকে উদ্ধার করে হাসপাতালে নিয়ে যাই। ঘরে খাবারের সময় একটি কুকুরকেও এভাবে মারা হয় না মানুষের সাথে এমন পৈশাচিকতা আমরা কোনোভাবেই মেনে নিতে পারছি না।
মাসুদের বাবা আব্দুল লতিফ বলেন, আমরা পরিবারের সবাই দুপুরে একসাথে খাবার খাচ্ছিলাম। কিছু বুঝে ওঠার আগেই হঠাৎ ৮-১০ জন লোক ঘরের দরজা ভেঙে ভেতরে ঢুকে পড়ে এবং বাইরে আরও প্রায় ১৭-১৮ জন অবস্থান নেয়। ঘরে ঢুকেই তারা আমার পুত্রবধূকে ধারালো অস্ত্র দিয়ে কোপাতে শুরু করে। আমি তাকে রক্ষা করতে গেলে তারা আমাকেও আঘাত করে। এরপর তারা আমার ছেলের ওপর চড়াও হয়। আমি বাধা দিতে গেলে লাঠি ও ধারালো অস্ত্র দিয়ে আমাকেও জখম করা হয়। একপর্যায়ে তারা আমার রক্তাক্ত পুত্রবধূকে টেনে-হিঁচড়ে বাইরে নিয়ে যায়। বর্তমানে আমরা সপরিবারে চরম প্রাণ সংশয়ে ভুগছি।
মাসুদের দ্বিতীয় স্ত্রী বিলকিস বেগম বলেন, আমার শাশুড়ি অসুস্থ, তার অপারেশনের কথা ছিল। মূলত তার সেবা-শুশ্রূষা করার জন্যই আমি শ্বশুরবাড়িতে ছিলাম। ঘটনার সময় আমি দুপুরের খাবার খেতে বসেছিলাম। ঠিক সেই মুহূর্তেই আমার সতিনের লোকজন দেশীয় অস্ত্র নিয়ে আমার ওপর হামলা চালায়। আমাকে হত্যার উদ্দেশ্যেই মাথায় ও শরীরে কোপ দেওয়া হয়। শাশুড়ির সেবার মতো একটি মানবিক কাজে লিপ্ত থাকা অবস্থায় আমার ওপর এই নৃশংস হামলা চালানো হয়েছে। আমি এই ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত ও দোষীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি চাই।
প্রবাসী মাসুদ বলেন, দীর্ঘ প্রায় সাত বছর মালয়েশিয়ায় হাড়ভাঙা খাটুনি খেটে কনস্ট্রাকশন শ্রমিকের কাজ করেছি। নিজের রক্ত পানি করা প্রায় ৩০-৩৫ লাখ টাকা পরম বিশ্বাসে স্ত্রীর হাতে পাঠিয়েছিলাম। কিন্তু দেশে ফিরে দেখি আমার সব স্বপ্ন শেষ। সে আমার সব টাকা আত্মসাৎ করেছে, এমনকি বাবার জমি বন্ধক রাখা ঋণের টাকাও তার ভাইদের দিয়ে দিয়েছে। ছুটির এই সময়ে আমি যখন টাকার হিসাব চাইলাম, তখন থেকেই আমার ওপর অমানুষিক নির্যাতন শুরু হয়। গত পরশু আমার স্ত্রীর ভাইয়েরা দলবল নিয়ে ঘরে ঢুকে আমাকে কুপিয়ে জখম করে।
তারা আমাকে টেনে-হিঁচড়ে কলাপাতা বিছিয়ে জবাই করার চেষ্টা করেছিল। আমার ছোট ছেলে আর ফুফুর চিৎকার শুনে প্রতিবেশীরা এগিয়ে না এলে আজ আমি বেঁচে থাকতাম না। আমাকে মারতে না পেরে তারা আমার দ্বিতীয় স্ত্রীকে কুপিয়েছে; সে এখন মৃত্যুর সাথে লড়ছে। আমার পাসপোর্ট-ভিসাও তারা ছিনিয়ে নিয়েছে। একদিকে ঋণের বোঝা, অন্যদিকে পরিবারের চিকিৎসা—আমি এখন পুরোপুরি নিঃস্ব ও দিশেহারা। আমি এই বর্বরতার বিচার চাই।
এদিকে মাসুদ বিদেশে থাকাকালীন এবং দেশে ফেরার পর থেকেই মেয়ের ওপর অমানুষিক নির্যাতনের অভিযোগ তুলেছেন প্রথম স্ত্রী ওজুফা বেগমের মা জুমেলা বেগম। তিনি জানান, নির্যাতনের মাত্রা সহ্য করতে না পেরে তার মেয়ে পিত্রালয়ে আশ্রয় নিতে বাধ্য হন।
জুমেলা বেগম অভিযোগ করে বলেন, আমার মেয়ে বাড়ি আসার পর থেকে তার সন্তানদের কেউ খোঁজখবর নেয়নি। উল্টো মিথ্যা মামলা দিয়ে হয়রানি করা হচ্ছে। তারা প্রভাব খাটিয়ে এবং টাকার বিনিময়ে আমাদের বিরুদ্ধে একতরফা ডিক্রি নিয়েছে। পবিত্র ঈদুল ফিতর উপলক্ষে তার মেয়ে সন্তানদের নিয়ে শ্বশুরবাড়িতে গেলে সেখানে তাদের ওপর বর্বরোচিত হামলা চালানো হয়। এই হামলায় জুমেলা বেগমের মেয়ে, তার গর্ভবতী নাতনি, এমনকি ছোট শিশুরাও রেহাই পায়নি। বাদ যায়নি মেয়ের জামাইও। এই নৃশংস ঘটনার বর্ণনা দিতে গিয়ে জুমেলা বেগম কান্নায় ভেঙে পড়েন এবং প্রশাসনের কাছে এই ন্যক্কারজনক হামলার সুষ্ঠু তদন্ত ও বিচার দাবি করেন।
এ বিষয়ে কটিয়াদী মডেল থানার পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, অভিযোগটি তদন্ত করে প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।



