কক্সবাজার সমুদ্রসৈকতের বালিয়াড়ি দখলমুক্ত করতে পরিচালিত বড় অভিযানের রেশ কাটতে না কাটতেই সেখানে আবারও অবৈধ স্থাপনা গড়ে তুলেছিলেন ব্যবসায়ীরা। তবে সেই দখলদারিত্ব বেশিদিন টিকতে দেয়নি প্রশাসন। ফের অভিযান চালিয়ে সৈকতের শতাধিক অবৈধ স্থাপনা গুঁড়িয়ে দেয়া হয়েছে।
মঙ্গলবার (২৪ মার্চ) দুপুরে কক্সবাজার সমুদ্রসৈকতের সুগন্ধা পয়েন্টের ঝাউবাগান ও মারমেইড এলাকায় এই উচ্ছেদ অভিযান পরিচালনা করে জেলা প্রশাসন। এ সময় প্রশাসনের কাজে বাধা দেয়ার অভিযোগে একজনকে আটক করা হয়েছে।
উচ্ছেদ অভিযান চলাকালে যেসব স্থাপনার মালিককে পাওয়া যায়নি, সেগুলো ভেঙে সরাসরি ট্রাকে তুলে নেয়া হয়। অনেক ব্যবসায়ী আবার নিজ উদ্যোগেই তাদের স্থাপনা সরিয়ে নেন। উচ্ছেদের একপর্যায়ে মারমেইড এলাকার বালিয়াড়িতে কয়েকজন ব্যবসায়ী নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটের সঙ্গে বাগবিতণ্ডায় জড়ান। তখনই একজনকে আটক করা হয়।
এর আগে, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর নির্দেশনায় কক্সবাজার সমুদ্রসৈকতে অবৈধ ও অস্থায়ী স্থাপনা উচ্ছেদে গত ১২ মার্চ অভিযান শুরু করেছিল প্রশাসন। টানা পাঁচ দিনের ওই অভিযানে সৈকতের সুগন্ধা ও কলাতলী পয়েন্ট থেকে ৬৩০টি স্থাপনা উচ্ছেদ করা হয়। এরপর গত রোববার (২২ মার্চ) সরেজমিনে এলাকা পরিদর্শন করেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ। সৈকতের উচ্ছেদকৃত বালিয়াড়ি যাতে পুনরায় দখল না হয়, সে বিষয়ে তিনি ট্যুরিস্ট পুলিশ ও জেলা প্রশাসনকে সতর্ক থাকার নির্দেশ দেন।
কিন্তু স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর সেই নির্দেশনার মাত্র একদিন পরই সুগন্ধা পয়েন্টের ঝাউবাগান ও মারমেইডের সামনের বালিয়াড়িতে আবারও স্থাপনা বসানো শুরু হয়। এরই পরিপ্রেক্ষিতে মঙ্গলবার ফের অভিযানে নামে প্রশাসন।
উচ্ছেদ প্রসঙ্গে ব্যবসায়ী জাহাঙ্গীর আলম বলেন, ‘আমরা এখন দিশেহারা অবস্থায় আছি। একদিকে বসতে দিলে অন্য জায়গা থেকে সরিয়ে দেয়া হচ্ছে, আবার কোথাও স্থায়ীভাবে বসার সুযোগও দেয়া হচ্ছে না। উচ্ছেদের সময় আমাদের পুনর্বাসনের আশ্বাস দেয়া হলেও এখন পর্যন্ত সে বিষয়ে কোনো কার্যকর উদ্যোগ দেখা যাচ্ছে না।’
তিনি আরও বলেন, ‘আমরা সরকার ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে আকুল আবেদন জানাচ্ছি, আমাদের জন্য একটি নির্দিষ্ট ব্যবস্থা করে দেয়া হোক, যেন আমরা কীভাবে জীবিকা নির্বাহ করব তা বুঝতে পারি। আমরা খেটে খাওয়া মানুষ। আজ যদি ব্যবসা করতে না পারি, তাহলে আগামীকাল আমাদের খাবার জোটানো কঠিন হয়ে পড়বে।’
সুগন্ধা বিচ মার্কেট সমিতির সাধারণ সম্পাদক ফরিদুল আলম বলেন, ‘জায়গা না থাকায় আমরা বাধ্য হয়ে সড়কের পাশে গাড়ি রাখছি। কিন্তু সেখানেও উচ্ছেদ করা হচ্ছে। এত গাড়ি রাখার জন্য আমাদের কোনো নির্দিষ্ট স্থান নেই। ঈদ মৌসুমে পর্যটকের চাপ বেশি। রাস্তায় গাড়ি রাখলে চলাচল ব্যাহত হয়, আবার বিকল্প জায়গাও দেয়া হচ্ছে না।’
ক্ষোভ প্রকাশ করে তিনি বলেন, ‘আমরা খুব অসহায় অবস্থায় আছি। পুনর্বাসনের আশ্বাস দেয়া হলেও এখনো কোনো ব্যবস্থা হয়নি। পরিবার নিয়ে ঈদও ভালোভাবে করতে পারিনি। এখন কোথায় যাব, কী করব, সে দিশা পাচ্ছি না।’
উচ্ছেদ অভিযানের বিষয়ে ক্যামেরার সামনে কথা না বললেও নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট মনজু বিন আফনান শতাধিক অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদের বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন। তিনি জানান, বালিয়াড়িতে আর কোনো স্থাপনা বসাতে দেয়া হবে না।
এদিকে পর্যটন ব্যবসায়ীরা বলছেন, বালিয়াড়ি দখলমুক্ত রাখতে প্রশাসনের নিয়মিত নজরদারির পাশাপাশি সৌন্দর্যবর্ধনের উদ্যোগ নেয়া জরুরি।
কক্সবাজার কলাতলী-মেরিন ড্রাইভ হোটেল রিসোর্ট মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক মুকিম খান বলেন, ‘জেলা প্রশাসন ও বিচ ম্যানেজমেন্ট কমিটির পক্ষ থেকে এমন কার্যকর ব্যবস্থা নিতে হবে, যাতে কোনোভাবেই বালিয়াড়ি পুনরায় দখল করা না যায়। একই সঙ্গে সমুদ্রসৈকতের সৌন্দর্যবর্ধনে প্রয়োজনীয় সব উদ্যোগ গ্রহণ করা জরুরি। সৈকতকে পরিচ্ছন্ন ও আকর্ষণীয় রাখতে ব্যবসায়ী মহল এবং প্রশাসন, উভয় পক্ষকেই সমন্বিতভাবে সর্বোচ্চ ভূমিকা রাখতে হবে।’
উল্লেখ্য, এর আগে গত ৯ মার্চ জেলা আইনশৃঙ্খলা কমিটির সভায় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ এক সপ্তাহের মধ্যে সমুদ্রসৈকতের সব অবৈধ স্থাপনা অপসারণের ঘোষণা দিয়েছিলেন।



