গাজিপুরের ডিসি নিয়োগ পাওয়া নুরুল করিম ও তার স্ত্রীর অবৈধ সম্পদের খোঁজে দুদক
নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রকাশ: ১৯ মার্চ ২০২৬, ০৩:৫৬ পিএম
ছবি : সংগৃহীত
সরকারী অর্থ আত্মসাত, অবৈধ সম্পদ অর্জন এবং ক্ষমতার অপব্যবহার করে মামলায় ফাসিয়ে হয়রানীর অভিযোগ উঠেছে উপ সচিব নুরুল করিম ভূইয়া তার স্ত্রী মিনারা নাজনীনের বিরুদ্ধে। সম্পর্ক্যে স্বামী ও স্ত্রী হলেও দুই উপ সচিব বিসিএস ২৫ ব্যাচের প্রশাসন ক্যাডারে ব্যাপক দাপুটে হিসেবে পরিচিত। দুর্নীতি দমন কমিশনে তাদের অবৈধ সম্পদ অর্জন ও সরকারী অর্থ আত্মসাতের অভিযোগ অনুসন্ধানের মধ্যে গাজিপুর জেলায় ডিসি হিসেবে পদায়ন পেয়েছেন নুরুল করিম ভূইয়া। আর তার স্ত্রী মিনারা নাজমীনও আরেকটি জেলায় পদায়ন পেতে তৎবির চালিয়ে যাচ্ছেন।
দুদকের নির্ভরশীল সূত্র জানিয়েছে, সরকারী অর্থ আত্মসাত ও অবৈধ সম্পদের অভিযোগে ওই উপ সচিব নুরুল করিম ভূইয়া ও তার স্ত্রী মিনারা নাজনীনের বিরুদ্ধে অনুসন্ধানে নেমেছে দুর্নীতি দমন কমিশন(দুদক)। ইতোমধ্যে কমিশন এ বিষয়ে অনুসন্ধান কর্মকর্তাও নিয়োগ করেছে। নিয়োগ পাওয়া অনুসন্ধান কর্মকর্তা দুদকের সহকারী পরিচালক সৌরভ দাস ওই দুই উপ সচিবের স্থাবর ও অস্থাবর অবৈধ সম্পদের খোঁজে বিভিন্ন দপ্তরে চিঠি পাঠিয়েছে।
সূত্র জানিয়েছে. ফেনির বাসিন্দা নুরুল করিম ভূইয়া বিসিএস ২৫ ব্যাচে সুপারিশপ্রাপ্ত হন। চাকুরী জীবনে বিভিন্ন উপজেলায় সহকারী ভূমি কমিশনার, সিনিয়র ভূমি কমিশনার, আওয়ামীলীগ সরকারের সময় সংসদীয় স্থায়ি কমিটির চেয়ারম্যানের একান্ত সচিব, এবং উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা হিসেবে চাকুরী করেছেন। এর পর সিনিয়র সহকারী সচিব পেশানে বাংলাদেশ হাওর ও জলভূমি উন্নয়ন অধিদপ্তরের উপ পরিচালক হিসেবেও কাজ করেছেন। ২০১৭ সালে তিনি জাপানে উচ্চ শিক্ষার এক কোর্সে অংশগ্রহনের জন্য যান। একই বছর আরেকটি কোর্সের জন্য থাইল্যান্ড যান। ২০১৭ সালের ১৮ সেপ্টেম্বর থেকে ২০১৮ সালের ৮ জুন পর্যন্ত পিএইডি ডিগ্রী অর্জনের জন্য ইউকের একটি বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হয়ে দেশের বাইরে চলে যান। এরপর ২০২২ সালের ১ আগস্ট ডক্টর অব ফিলোসপি ইন কমিউনিকেশন বিসয়ে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের একটি বিশ্ববিদ্যালয়ে ডিগ্রী অর্জনের জন্য ভর্তি রয়েছেন। কিন্তু উচ্চ শিক্ষার নামে নুরুল করিম ও তার স্ত্রী দীর্ঘ ৮ বছর ধরে আমেরিকায় ছিলেন। সরকারী অর্থে আমেরিকায় আয়েশী জীবন যাপন করেছেন। আমেরিকার মতো ব্যয়বহুল দেশে বিলাশবহুল ফ্লাট নিয়ে থাকা এবং সন্তানকে পড়াশুনা করানোর মতো অর্থ সরকারী চাকুরী করে কিভাবে সম্ভব তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। মূলত আওয়ামীলীগ সরকারের সময়ে বিভিন্ন উজেলায় ভূমি সহকারী কর্মকর্তা ও উপজেলা নির্বার্হী কর্মকর্তা থাকাকালীণ ঘুষ ও দুর্নীতির মাধ্যমে বিপুল অর্থ হাতান নুরুল করিম। এছাড়া সরকারের যখন যে দপ্তরে দায়িত্বে ছিলেন সেখানেই দুর্নীতি ঘুষ বানিজ্য সরকারী অর্থ আত্মসাতের মতো কেলেঙ্কারী করেও পার পেয়ে গেছেন।
একটি সূত্র জানিয়েছে,উপ সচিব নুরুল করিম ভূইয়া ও তার স্ত্রী মিনারা নাজমীনের রোশানল থেকে বাচঁতে এবং হয়রানীর প্রতিকার চেয়ে প্রধানমস্ত্রীর দপ্তর, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও জন প্রশাসন মন্ত্রনালয়ে লিখিত অভিযোগ করেছে ওই দুই উপসচিবের রোশানলের শিকার বাংলাদেশ নৌ বাহিনীর সাবেক এক লেফটেন্যান্ট কমান্ডার। যিনি উপ সচিব নুরুল করিম ভুইয়ার স্ত্রী মিনারা নাজমীনের আপন ভাই। এছাড়া দুর্নীতি দমন কমিশন দুদকে তাদের বিরুদ্ধে অবৈধ সম্পদ অর্জন ও সরকারী অর্থ আত্মসাতের অভিযোগে অনুসন্ধান চলছে। এমন পর্যায়ে স্থানীয় সরকার বিভাগের উপ সচিব নুরুল করিম ভূইয় কে গাজিপুরের জেলা প্রশাসক হিসেবে পদায়ন করা হয়েছে। যা রীতিমতো নানা প্রশ্ন তৈরী করেছে। তার স্ত্রী ¯ স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের রাজনৈতিক শাখা ১ এর উপ সচিব মিনারা নাজমীনও জেলায় পদায়ন পাওয়ার জোর তৎবির চালাচ্ছেন। এ দুই কর্মকর্তরা সম্পত্তিগত দন্দ্বে স্বজনকের হয়রানী করতে পুলিশ থেকে শুরু করে বিচারালয় পর্যন্ত প্রভাব বিস্তারের অভিযোগ রয়েছে।
দুদকের নির্ভরযোগ্য সূত্র জানিয়েছে, ২০২৫ সালের ডিসেম্বর মাস থেকে সরকারের তৎকালীন পরিসংখ্যান ও তথ্য ব্যবস্থাপনা বিভাগের উপ সচিব ( বর্তমানে গাজিপুর জেলা প্রশাসক হিসেবে নিয়োগ পাওয়া) নুরুল করিম ভূইয়া এবং বিদ্যু, জ্¦ালানী ও খনিজ মন্ত্রনালয়ের বিদ্যু বিভাগের উপ সচিব ( বর্তমানে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের রাজনৈতিক শাখা ২) মিনারা নাজনিনের বিরুদ্ধে অবৈধ সম্পদ অর্জনের অভিযোগ অনুসন্ধান শুরু করেছে দুদক। অনুসন্ধান কর্মকর্তা হিসেবে দুদকের ঢাকা জেলা সমন্বিত জেলা কার্যালয় ১ এর সহকারী পরিচালক সৌরভ দাসকে অনুসন্ধান কর্মকর্তা হিসেবে নিয়োগ করা হয়েছে। অনুসন্ধান কর্মকর্তা ইতোমধ্যে অনুসন্ধানের অংশ হিসেবে সরকারের বিভিন্ন দপ্তরে নুরুল করিম ভূইয়া ও মিনারা নাজমীনের অবৈধ সম্পদের বিষয়ে তথ্য সংগ্রহ শুরু করেছে। ইতোমধ্যে বাংলাদেশ ব্যাংকসহ বিভিন্ন আর্থিক প্রতিষ্ঠান, ভূমি অফিস, সাবরেজিস্ট্রি অফিসসহ সরকারের সংশ্লিষ্ট দপ্তরে চিঠি পাঠানো হয়েছে ্ও দুই উপ সচিবের নামে বেনামে বা তাদের দ্বারা লাভবান স্বজনদের নামে থাকা স্থাবর ও অস্থাবর সম্পদ আছে কিনা।
দুদকের অনুসন্ধান সংশ্লিস্ট কর্মকর্তা জানান, উপ সচিব নুরুল করিম ভূইয়া এবং তার স্ত্রী আরেক উপ সচিব মিনারা নাজমীনের বিরুদ্ধে দুদকে আসা অবৈধ সম্পদ অর্জনের অভিযোগ শুরু করেছেন। ইতোমধ্যে তাদের স্থাবর ও স্থাবর সম্পদের তথ্য চেয়ে চিঠি পাঠানো হয়েছে। সব তথ্য দুদক এখনো হাতে পায়নি। তথ্য আসার পর এগুলো যাচাই বাচাই করে তাদের সম্পদ বিবরনী দাখিলের নোটিশ পাঠানো হবে।
দুদকে আসা এক অভিযোগে বলা হয়েছে, নুরুল করিম ভূইয়া বিসিএস ২৫ ক্যাডারে সুপারিশপ্রাপ্ত হন। তিনি সরকারী চাকুরীতে যোগদানের শুরু থেকেই ঘুষ দুর্নীতি এবং ক্ষমতার অপব্যবহারের মাধ্যমে বিপুল পরিমান অবৈধ সম্পদের মালিক হয়েছেন। বটিয়াঘাটি উপজেলায় এসিল্যান্ড( সহকারী কমিশনার ভূমি) থাকা অবস্থায় মোটা অঙ্কের ঘুষের বিনিময়ে সরকারী জমি দুর্নীতির মাধ্যমে বরাদ্ধ দিয়েছেন। আর ঘুষের টাকায় জোহার সাহারা এলাকায় নিসর্গ সমবায় সমিতিতে৫ কাঠা পরিমানের কোটি টাকারও বেশি মূল্যের প্লট কিনেন। বটিয়াঘাটায় বিপুল পরিমান ঘুষ নিয়ে সরকারী জমিতে রিসোর্ট করার জন্য আলাউদ্দিন নামের এক ব্যক্তিকে লিজ দিয়েছেন। সরকারী চাকুরীতে থেকে তিনি জমি কেনা বেচার দালাল করতেন। এম এন হোমস নামে একটি প্রতিষ্ঠান গড়ে ওই প্রতিষ্ঠানের নামে ব্রাক ব্যাংকে একটি হিসেব খোলেন। ঘুষ ও দুর্নীতির মাধ্যমে অর্জিত টাকা ওই হিসেবে লেনদেন করতেন। নিজের শাশুড়ীর নামে এফডিআর এবং সঞ্চয়পত্র খুলে সেখানে বিপুল পরিমান অর্থ সঞ্চয় করেছেন নুরুল করিম। ফেনির ছাগল নাইয়া গ্রামের বাড়িতে ৪ কোটি টাকা ব্যায়ে বিলাশবহুল বাড়ি নির্মান করেছেন এ নুরুল করিম ভূইয়া।
অন্যদিকে মিনারা নাজমীন খুলনা ডিসি অফিসে কর্মরত থাকা অবস্থায় দুর্নীতি ও অনীয়মের অভিযোগে দুই বার স্ট্যান্ডরিলিজ হয়েছিলেন। খুলনায় ডিসি অফিসে কর্মরত থাকাকালীন শাহিরাজ নামের একজন কর্মচারীর মাধ্যমে ঘুষ দুর্নীতি করতেন মিনারা নাজমীন। এম এম হোমস নামে একটি প্রতিষ্ঠানের নামে ব্রাক ব্যাংকে হিসেব খুলে ওই হিসেবে ঘুষ ও দুর্নীতির অর্থ লেনদেন করেছেন। নারায়নগঞ্জের বন্দরে উপজেলা নির্বাহনী কর্মকর্তা থাকাকালীন বিপুল পরিমান অর্থের মালিক হয়েছেন। দীর্ঘ ৮ বছর তিনি আমেরিকায় ছিলেন উচ্চ শিক্ষার নামে। সেখানে তার বড় ছেলেকে পড়াশুনা করাচ্ছেন। একজন সরকারী কর্মকর্তার সন্তানের আমেরিকায় পড়াশুনার যে খরচ তা কিভাবে আসে নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে।
দুদকের এক কর্মকর্তা জানান, সদ্য গাজিপুরের ডিসি নিয়োগ পাওয়া স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের উপ সচিব নুরুল করিম ভূইয়া আওয়ামীলীগের শাষনামলে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বেসরকরী বিনিয়োগ ও শিল্প বিষয়ক উপদেষ্টা সালমান এফ রহমানের( বর্তমানে কারাগারে) নির্বাচনি এলাকা দোহারের উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ছিলেন। একইভাবে তার স্ত্রী মিনারা নাজমীন ছিলেন নারায়নগঞ্জের বন্দর উপজেলার নির্বাহী কর্মকর্তা। এছাড়া নুরুল করিম একাধিক উপজেলায় ঊপজেলা ভূমি কর্মকর্তা ছিলেন। মূলত আওয়ামীলীগের সময়ে ভূমি কর্মকর্তা ও উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা থাকাকালীন ঘুষ, দুর্নীতির মাধ্যমে বিপুল পরিমান অবৈধ সম্পদের মালিক হওয়ার অভিযোগ পায় দুদক। এ দম্পতি আওয়ামীলীগের শানসামলে স্কলারশীফ নিয়ে দেশের বাইরে যায়। উচ্চ ডিগ্রি অর্জনে সরকারের অর্থে বিদেশে গেলেও তারা সেখানে আয়েশী জীবন যাপন করেন। দেশে থাকা অবস্থায় বিপুল পরিমান অবৈধ অর্থ বিদেশে পাচার করেন। ৫ আগষ্ট আওয়ামীলীগ সরকার ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর তারা দেশে ফিরেন। দেশে ফিরে তারা নানা ধরনের মামলা বানিজ্যে জড়িয়ে পড়েন। এছাড়া সম্পতিগত বিরোধে উপ সচিব মিনারা নাজমীন তার আপন ভাইকে মামলায় জড়িয়ে সরকারী ক্ষমতার অপব্যবহারের মাধ্যমে জেল খাটান এবং একাধিক মামলায় জড়ান। এসব কাজে স্বামী আরেক মন্ত্রনালয়ের উপ সচিব নুরুল করিম ভূইয়া সহযোগিতা করেন। এ বিষয়ে দুর্নীতি দমন কমিশনে(দুদক) ভুক্তভোগী একটি অভিযোগ করেছেন।
ওই কর্মকর্তা আরও জানান,আগের অনুসন্ধানের সঙ্গে নতুন করে আসা অভিযোগ নথিতে যুক্ত করে অনুসন্ধান করছে দুদক। অনুসন্ধান শেষে উপ সচিব এ দম্পতির বিরুদ্ধে অনুসন্ধান সংশ্লিস্ট কর্মকর্তার অনুসন্ধান প্রতিবেদনের পেক্ষেিত পরবর্তী ব্যবস্থা নেয়া হবে।
সূত্র জানিয়েছেবিএসএস ২৫ ব্যাচে প্রশাসনিক ক্যাডারে সুপারিশপ্রাপ্ত হন নুরুল করিম ভূইয়া এবং তার স্ত্রী মিনারা নাজমীন। অভিযোগ রয়েছে মিনারা নাজনীনের বাড়ি খুলনা সদর উপজেলায়। তার বাবার নাম এম এ কুদ্দুস। আর মায়ের নাম হোসনে আরা বেগম। কিন্তু মিনারা নাজমীন নিজেকে নওগা জেলার বাসিন্দা দেখিয়ে ২৫ তম বিএসএস পরীক্ষায় অংশ নেন এবং প্রশাসন ক্যাডারে নিয়োগ পান। কিন্তু মিনারা নাজমীনের জম্মস্থান, পড়াশুনা সবকিছু খুলনায়। নওগার বাসিন্দা হিসেবে চাকুরী নেওয়ার কারণে নিজ জেলায় মিনারা নাজনীন পোস্টিং পান
এবং সেখানে দীর্ঘ সময় চাকুরী করেন। নুরুল করিম ভূইয় সার্ভিস তর্থে স্ত্রী হিসেবে মিনারা নাজমীনের নিজ জেলা নওগা উল্লেখ রয়েছে।



