Logo
Logo
×

সারাদেশ

ঈদকে সামনে রেখে ব্যস্ত সময় কাটাচ্ছে সোনারগাঁয়ের জামদানি কারিগর ও শিল্পীরা

Icon

সোনারগাঁ (নারায়ণগঞ্জ) প্রতিবেদক

প্রকাশ: ০৮ মার্চ ২০২৬, ১০:৫৯ পিএম

ঈদকে সামনে রেখে ব্যস্ত সময় কাটাচ্ছে সোনারগাঁয়ের জামদানি কারিগর ও শিল্পীরা

ছবি : সোনারগাঁয়ের জামদানি কারিগর ও শিল্পীরা

পবিত্র ঈদ উল ফিতরকে সামনে রেখে সোনারগাঁয়ে বিভিন্ন এলাকার জামদানি কারিগর ও শিল্পীরা শাড়ি তৈরি কাজে ব্যস্ত সময় কাটাচেছন। এখন শাড়ি তৈরির কাজ চলছে সোনারগাঁয়ে জামদানী শিল্পীদের ঘরে ঘরে কর্মযজ্ঞ। কেউ কাপড়ে সুতা তোলা, সুতা রঙ করা আবার কেউ শাড়ি বুনন ও নকশার কাজে সময় কাটছে। ঈদ ছাড়াও জামদানির কদর অন্যান্য কাপড়ের তুলনায় বেশি। ঈদ কাছাকাছি আসায় বেশি আয়ের আশায় বিভিন্ন জামদানি শিল্পীরা কেউ সুতা কাটছে, কেউ ব্যস্ত হাতে তাঁত টানছে, সুতা ভরছে, কেউবা সহযোগিতা করছে অন্যজনকে। নানা রকম ডিজাইনের জামদানি শাড়ি তৈরি হচ্ছে। বাজারে এ শাড়ি ঢাকাই জামদানি নামে পরিচিতি লাভ করছে।

জানা যায়, সোনারগাঁ উপজেলার প্রায় ৪টি ইউনিয়নের প্রায় চার সহস্রাধিক জামদানি তাঁত রয়েছে। এর মধ্যে মালিপাড়া, সাদিপুর, বাহ্মণবাওগাঁ, খেজুরতলা, কাজিপাড়া, চৌরাপাড়া, মুছারচর, শেকেরহাট, বাসাবো, তিলাব, বস্তল, কলতাপাড়া, কাহেনা, গনকবাড়ি, ওটমা, রাউৎগাঁও, নয়াপুর, উত্তর কাজিপাড়া, চেঙ্গাইন, খালপাড় চেঙ্গাইন, ভারগাঁও, কান্ধাপাড়া, ফিরিপাড়া, গণকবাড়ি, বাইশটেকি, আদমপুর, বাংলাদেশ লোক ও কারুশিল্প ফাউন্ডেশনের কারুপল্লী এলাকায় উল্লেখযোগ্য। বর্তমানে ঈদকে সামনে রেখে এসব গ্রামের তাঁতী পরিবাররা সবাই জামদানি তৈরিতে ব্যস্ত। একটু ফিরে তাকানোর যেন সময় ফুরুসুৎ নেই তাঁতীদের। এখানকার জামদানি তাঁতীদের অধিকাংশ শিশু থেকে মধ্য বয়স্ক। তবে কম বয়সী তাঁতীরাই জামদানি শিল্পের সাথে বেশি জড়িত। জামদানি শিল্পীদের মধ্যে অর্ধেকের বেশি রয়েছে নারী। এ নারীদের হাতের নিখুঁত শৈল্পিকতায় তৈরি হয় জামদানি।

বাংলাদেশ বিশ্বে জামদানি শিল্পের একমাত্র দেশ হিসেবে ব্যাপক পরিচিতি। তবে জামদানি শিল্পের সোনালী দিন এখন আর নেই। সম্ভাবনা যতটুকু আছে তাও যেন হয়ে আসছে সংকুচিত। তবুও দিনদিন এ শিল্পে ধ্বস নামতে শুরু করেছে। জামদানী উৎপাদনকারী শিল্পীরা হতাশাগ্রস্ত। তারা দাম পাচ্ছে না। জামদানি শিল্পীদের লাভের গুড় এখন খাচ্ছে পিঁপড়ায়। অধিকাংশ তাঁতীই মহাজনদের কাছে দেনার দায়ে বাঁধা। মহাজনদের দাদন গুনছে, পাচ্ছে শুধু মজুরি। সরাসরি তারা শাড়ি বাজারে নামাতে পারছে না। তাঁতীরা মহাজনদের কাছ থেকে সূতা নিয়ে যায়, তাদের দেয়া নক্সা অনুযায়ী শাড়ি তৈরি করে আনে। শাড়ি প্রতি মজুরি হিসেবে সপ্তাহের পর সপ্তাহ ধরে হাড়ভাঙ্গা খাটুনির পর মজুরি পায় কম। ফলে শিল্পীরা উৎসাহ হারিয়ে ফেলেছে জামদানি তৈরিতে ।

সূত্র জানায়, জামদানিই হচ্ছে বাংলার হারিয়ে যাওয়া মসলিনের বিকল্প প্রতিরূপ। অতীতের মসলিনের মতই, আজকের জামদানি শাড়ির শিল্প সৌন্দর্য্যরে খ্যাতি বিশ্বজোড়া। কেবল দেশের বাজারেই নয় বিশ্ব বাজারেও জামদানির ব্যাপক চাহিদা গড়ে উঠেছে।

এদিকে আসন্ন ঈদকে সামনে রেখে সোনারগাঁয়ে বিভিন্ন এলাকায় জামদানি শিল্পী ও কারিগরদের বাড়িতে গেলে দেখা মেলে জামদানি তৈরির কাজের গতি। তারা এখন সবাই ব্যস্ত। কারিগরদের আয়ও বেড়েছে। ঈদকে সামনে রেখে জামদানি শাড়ীর চাহিদা বেড়ে গেছে আগের তুলনায় অনেক বেশি। একারণে কারিগরদের রাতদিন কাজ করতে হচ্ছে। এসব শাড়ী বিশ্বের বিভিন্ন দেশ ও ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন অভিজাত  দোকানে সরবরাহ করা হচ্ছে। কেউ সরাসরি কাপড় উৎপাদন করে, কেউ তাঁতী, কেউ সুতা বিক্রেতা, আবার কেউ কাপড় রফতানির কাজে জড়িত। তাঁতিরা সবাই যে যার কাজে ব্যস্ত। ঈদ উপলক্ষ্যে বিপুল পরিমাণ বিক্রির লক্ষ্য নিয়ে পুরুষের পাশাপাশি নারীরাও শাড়ি বুনার কাজ করছেন।

জামদানি কারখানার মালিকরা জানান, আগে জামদানি শিল্পীরা শুধু শাড়ি তৈরিতেই সীমাবদ্ধ ছিলেন। তবে বর্তমানে জামদানি শিল্পে এসেছে নতুনত্ব। বর্তমানে শাড়ি তৈরির পাশাপাশি থ্রি পিস, ওড়না, পাঞ্জাবি, পর্দার কাপড়ও তৈরি হচ্ছে। ঈদকে সামনে রেখে জামদানি শাড়ীর চাহিদা বেড়ে গেছে আগের তুলনায় অনেক বেশি। এছাড়া ক্রেতাদের চাহিদা অনুযায়ী এবার আরো উন্নত এবং নতুন নতুন ডিজাইনের শাড়ি তৈরি করছেন এখানকার কারিগররা।

জামপুর ইউনিয়নের মালিপাড়া এলাকার জামদানি কারখানার মালিক শুক্কুর আলী জানান, নানা প্রতিকুলতার মাঝেও তাঁতিরা জামদানি উৎপাদন বন্ধ করেনি। তারা বিভিন্ন ডিজাইনের জামদানির ইঞ্চি পাইড়ে, করলা পাইড়, চালতা পাইড়, ইন্দুরা পাইড়, কচু পাইড়, বেলপাতা, কলকা, দুবলাডং এ ডিজাইনের জামদানি তৈরি করছে। এসব ডিজিইন বিভিন্ন দামে বিক্রি করে থাকে। তারা জানিয়েছেন এখানে ১৮শ’ টাকার নিচে কোনো জামদানি শাড়ি তৈরি হয় না। সর্বোচ্চ ৪৫ হাজার টাকা দামের শাড়িও এখানে তৈরি হয়। তবে এখন এ দামে অর্ডার পাওয়া যায় না। সরকারী পৃষ্ঠপোষকতা পেলে জামদানি শিল্প দেশের রফতানি খাতে বিশেষ অবদান রাখতে পারতেন।

জামদানি কারিগর সুইটি ও আসাদুল ইসলাম জানান, একটি শাড়ি তৈরিতে এক সপ্তাহ থেকে দুই তিন মাস পর্যন্ত সময় লেগে যায়। সময় আর কাজের উপর দাম নির্ভর করে। এ বস্ত্রের জমিন একাধিক রংঙের হয়ে থাকে। জামদানি তাঁতীদের কোন প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা নেই। তাদের রয়েছে বংশানুক্রমিক হাতে কলমে অর্জিত জ্ঞান। এ শাড়ি যে কেউ তৈরি করতে পারে না। ভারতসহ পাশ্ববর্তী দু’একটি দেশ বহু বার চেষ্টার পরও এ শিল্প রপ্ত করতে পরেনি। দিন দিন জামদানি শিল্পীদের সংখ্যা কমে যাচ্ছে। যারা মাথার ঘাম পায়ে ফেলে শাড়িগুলো তৈরি করে তাদের নিজের শরীরে কখনো জড়াতে পারে না এ জামদানী। আমরা স্বপ্ন দেখি একদিন এ শিল্প একদিন সমৃদ্ধ হবে।

বাংলাদেশ লোক ও কারুশিল্প ফাউন্ডেশনের কারুপল্লীতে জামদানি কারিগর আবু তাহের জানান, এখন আর জামদানি কারিগররা ভাল নেই। সমস্যা জামদানি কারিগরগো। আমাগো যেই যেই সমস্যা আছে, সেই সমস্যাগুলাইন দূর কইরা সরকার সহযোগীতা করলে জামদানি শিল্প বাঁইচ্যা থাকবো।

জামদানি তাঁত মালিক ওয়াহিদুর রহমান বলেন, পুঁজির অভাবে চাহিদা অনুযায়ী শাড়ি তৈরি করতে পারছে না। তবে পাইকারী ব্যবসায়ী ও ব্যক্তিগতভাবে সৌখিন ক্রেতাদের অর্ডার পাওয়ায় কারনে ব্যবসা টিকে রাখতে পারছেন। এ শিল্পের প্রসারের জন্য স্বল্প সুদে ঋণ প্রয়োজন।

সোনারগাঁ জামদানি তাঁতী সমিতির সভাপতি মো. সালাউদ্দিন বলেন, বর্তমানে জামদানি শিল্পীদের খারাপ সময় যাচ্ছে। ভারতে জামদানি শাড়ি রপ্তানি করতাম। রাজনৈতিক কারনে বর্তমানের সম্ভব হচ্ছে না। জামদানী শিল্পে লাভের গুড় পিঁপড়ায় খাচ্ছে। সহজ সরল নারী, অসচ্ছল ও নিরীহ প্রকৃত জামদানি তাঁতিদের  আর্থিক দূর্বলতার সুযোগকে ষোল আনাই কাজে লাগাচ্ছেন এক শ্রেণীর দাদন ব্যবসায়ী মহাজনরা। এ শিল্পকে সরকার ইইএফ ফান্ডের আওতায় আনতে পারলে দাদন ব্যবসায়ীদের দৌরাত্ম  থাকবে না। সরকার জামদানি শিল্পে সরকারী পৃষ্ঠপোষকতা দিলে এ শিল্পটিকে বাঁচানো সম্ভব।

সোনারগাঁ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা আসিফ আল জিনাত বলেন, জামদানী সোনারগাঁয়ের ঐতিহ্য। মসলিনের পরেই তার অবস্থান। ঐতিহ্যবাহী জামদানি শিল্পকে টিকিয়ে রাখতে সহজ শর্তে ব্যাংক ঋণের ব্যবস্থা করার চেষ্টা করা হবে।

Swapno

Abu Al Moursalin Babla

Editor & Publisher

Major(Rtd)Humayan Kabir Ripon

Managing Editor

Email: [email protected]

অনুসরণ করুন