কিশোরীকে হত্যা করেছিলেন সৎবাবা, আদালতে জবানবন্দি
নরসিংদী প্রতিবেদক
প্রকাশ: ০৭ মার্চ ২০২৬, ০৫:৪২ পিএম
নরসিংদীতে আলোচিত কিশোরী আমেনা ধর্ষণ ও হত্যার ঘটনায় জড়িত থাকার চাঞ্চল্যকর তথ্য দিয়ে আদালতে জবানবন্দি দিয়েছেন সৎ বাবা আশরাফ আলী। এ ঘটনায় এখন পর্যন্ত আমেনার সৎ বাবাসহ ৯ জনকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। শনিবার (৭ মার্চ) দুপুরে পুলিশ সুপার কার্যালয়ে এক সংবাদ সম্মেলনে এই তথ্য জানান পুলিশ সুপার আব্দুলাহ আল-ফারুক।
এর আগে (৬ মার্চ) বৃহস্পতিবার বিকেলে নরসিংদীর মাধবদী থেকে সন্দেহের তালিকায় থাকা সৎ পিতা আশরাফ আলীকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য থানায় নিয়ে আসে পুলিশ। পরে প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে নিজের সৎ মেয়েকে একাই গলায় ওড়না প্যাঁচিয়ে শ্বাসরুদ্ধ করে হত্যা করে এবং ধর্ষক নূর মোহাম্মদ নূরাসহ অন্যান্যদের ফাঁসানোর চেষ্টা চালিয়ে মিথ্যা নাটকের কথা জানায়।
এসময় পুলিশ সুপার আব্দুল্লাহ আল-ফারুক আরো জানায়, ধর্ষণ ও হত্যা মামলার মূল আসামি নূর মোহাম্মদ ওরফে নূরা (২৮) আমেনার সাথে পূর্ব হতে প্রেমের সম্পর্ক থাকার সূত্র ধরে শারীরিক সম্পর্কে লিপ্ত ছিল। অপরদিকে আসামি হযরত আলী, এবাদুল, জামান ও গাফফার আমেনা হত্যাকাণ্ডের ১৫ দিন পূর্বে হযরত আলীর কোতালিরচরের নিজ বাড়িতে দলবদ্ধভাবে আমেনাকে ধর্ষণ করে। সৎ বাবা আশরাফ আলী আদালতে ১৬৪ ধারা জবানবন্দিতে বলেন, আশরাফ আলী (৪৫) তার সৎ মেয়ে আমেনাকে সাথে নিয়ে গত ২৫ ফেব্রুয়ারি রাতে পূর্ব পরিকল্পনা মোতাবেক সুমন নামে এক সহকর্মীর বাড়ির উদ্দেশ্যে রওয়ানা হয়।
রাত সাড়ে ৮টার দিকে পথিমধ্যে একটি সরিষা ক্ষেতে আমেনা সামনের দিকে হাটতেছিল, এসময় পিছন দিক থেকে আশরাফ ওড়না দিয়ে আমেনার গলায় ফাঁস দিয়ে শ্বাসরোধে হত্যা করে। পরে ওই ওড়না দিয়েই আমেনা দু’হাত পিছনদিকে বেধে রাখে। পরে সে ঘটনাস্থল থেকে চলে এসে তার পরিবারকে জানায়, নূরা এবং অন্যান্যরা তার কাছ থেকে আমেনাকে ছিনিয়ে নিয়ে যায়। এসময় নিজেকে বাঁচাতে পরিকল্পনার অংশ হিসেবে নূরাসহ অন্যান্যদের উপর আমেনাকে ছিনিয়ে নিয়ে হত্যার দায় চাপানোর মিথ্যা নাটক সাজায়। আমেনার সৎ বাবা আশরাফ আলীর কথাবার্তা সন্দেহজনক হওয়ায় ও আসামিদের জবানবন্দির ফলে তাকে বৃহস্পতিবার গ্রেপ্তার করা হয়।
ইতোপূর্বে ধর্ষণে জড়িত প্রেমিক নূর মোহাম্মদ ওরফে নূরা, এবাদুল্লাহ, হযরত আলী ও গাফফার এবং ধর্ষণের ঘটনায় সালিশ দরবার করে আমেনার পরিবারকে এলাকা ছাড়া করার অভিযোগে আহাম্মদ আলী মেম্বার ওরফে আহাম্মদ দেওয়ান, তার ছেলে মো. ইমরান দেওয়ান, প্রতিবেশী মো. আইয়ুব ও ইছহাক ওরফে ইছাকে গ্রেপ্তার করা হয়। তাদের প্রত্যেককে বিজ্ঞ আদালতের মাধ্যমে জেলহাজতে প্রেরণ করা হয়েছে। তারা সবাই বর্তমানে ৮ দিনের রিমান্ডে রয়েছে।
আশরাফ জবানবন্দিতে আরো উল্লেখ করেন, ১০ ফেব্রুয়ারি নূর মোহাম্মদ নূরাসহ একাধিক আসামি আমেনাকে গণধর্ষণ করে। এরই প্রেক্ষিতে স্থানীয় সাবেক মেম্বারের বিচার কার্য, তাদের এলাকা ছেড়ে দিতে বলা ও আমেনা বিভিন্ন অসামাজিক কর্মকাণ্ডের কারণে তিনি দীর্ঘদিন যাবৎ বিরক্ত ছিলেন এবং সামাজিকভাবে বিভিন্ন সময়ে হেয় প্রতিপন্ন হওয়াসহ নানা কারণেই সৎ মেয়ের উপর ক্ষিপ্ত হওয়ার কথা জানায় আশরাফ আলী। পরবর্তীতে মেয়েকে দুনিয়া থেকে সরিয়ে দিতে পারলে অপমান থেকে মুক্তি পাবার আশায় মেয়েটিকে পরিকল্পিতভাবে হত্যা করেছে।
হত্যার দায় স্বীকার করা আমেনার সৎ বাবা আশরাফ আলি শেরপুর জেলার নালিতাবাড়ী থানার মোয়াকুড়া এলাকার কুব্বাত আলীর ছেলে। সাত মাস পূর্বে আমেনা মাকে বিয়ে করে আশরাফ। তিনি বর্তমানে নরসিংদীর মাধবদীর কোতয়ালীরচর দড়িকান্দি এলাকার মতির বাড়িতে সপরিবারে ভাড়ায় বসবাস করে রাজমিস্ত্রীর কাজ করতো।
উল্লেখ্য, ২৬ ফেব্রুয়ারি বৃহস্পতিবার সকালে মহিষাশুরা ইউনিয়নের কোতালিরচর দড়িকান্দী এলাকার একটি সরিষা খেত থেকে আমেনার মরদেহ উদ্ধার করা হয়। এসময় আমেনার সৎবাবা জানায়, বুধবার রাতে বখাটে চক্রটি তরুণী আমেনাকে তার বাবার সামনে থেকেই ছিনিয়ে নিয়ে যায়। পরে তাকে পুনরায় গণধর্ষণের পর নির্মমভাবে হত্যা করে। পরে নিহত আমেনার মা ফাহিমা বেগম বাদী হয়ে নূরাকে প্রধান করে ৯ জনের নামে মামলা দায়ের করেন। আলোচিত এই ঘটনায় নূরাসহ মোট ৮ আসামিকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। পহেলা মার্চ ৭ আসামিকে ৮ দিনেন রিমান্ড মঞ্জুর করে আদালত। তাদের জিজ্ঞাসাবাদে ধর্ষণের কথা স্বীকার করলেও হত্যার রহস্য উদ্ঘাটন করতে বাবার উপর নজরদারি করে গোয়েন্দা পুলিশ। তাকে গ্রেপ্তারের পর মেলে এই চাঞ্চল্যকর তথ্য।



