ছবি : সংগৃহীত
রাজধানীর বুকে নীল জলরাশি আর আলোঝলমলে সড়কের যে হাতিরঝিল একসময় ছিল পরিবার ও বিনোদনের নিরাপদ আশ্রয়, আজ তা ক্রমেই আতঙ্কের নাম হয়ে উঠছে। পর্যাপ্ত সড়কবাতির অভাব, অধিকাংশ সিসি ক্যামেরা অচল, সীমিত নিরাপত্তাকর্মী, অপরিষ্কার ও দুর্গন্ধযুক্ত পানি এবং মশার উপদ্রব—সব মিলিয়ে সন্ধ্যার পর হাতিরঝিল এখন এক অনিরাপদ ও ভীতিকর এলাকায় পরিণত হয়েছে।
জিয়া উদ্যানসহ বিভিন্ন পার্ক ও বিনোদনকেন্দ্র জাঁকজমকপূর্ণভাবে তৈরি হলেও সময়ের সঙ্গে সঙ্গে অযত্ন অবহেলায় নষ্ট হয়ে গেছে। একই পথে গেছে নগরবাসীর জন্য বিনোদনের বড় আয়োজন হিসেবে গড়ে তোলা হাতিরঝিলও।
নান্দনিক নকশা আর প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের জন্য যে স্থান ঢাকার গর্ব হওয়ার কথা ছিল, আজ তা অব্যবস্থাপনায় দর্শনার্থীশূন্য হয়ে পড়ছে। অবহেলায় হারিয়ে যাচ্ছে সৌন্দর্য।
সন্ধ্যার পরই ফাঁকা হয়ে যায়
সরেজমিনে দেখা যায়, দিনের আলো থাকতে কিছু মানুষ থাকলেও সূর্য ডোবার সঙ্গে সঙ্গেই ঝিলপাড় ফাঁকা হতে শুরু করে। ল্যাম্পপোস্টগুলোর ৮০ থেকে ৯০ শতাংশ নষ্ট থাকায় অধিকাংশ এলাকা অন্ধকারে ডুবে যায়। কোথাও কোথাও বাতি থাকলেও তা প্রয়োজনের তুলনায় একেবারেই অপ্রতুল।
এই অন্ধকারেই ছিনতাই, মাদক কারবার ও সন্দেহজনক লোকজনের আনাগোনা বাড়ছে বলে অভিযোগ স্থানীয় বাসিন্দা ও নিয়মিত দর্শনার্থীদের। ছুরি বা দেশীয় অস্ত্র দেখিয়ে মোবাইল ফোন ও মানিব্যাগ ছিনিয়ে নেওয়ার ঘটনাও ঘটছে প্রায়ই। ভোরে হাঁটতে আসা মানুষজনও নিরাপদ বোধ করেন না।
‘ভূতুরে’ হয়ে ওঠা হাতিরঝিল
দিনের বেলায় হাতিরঝিল ঢাকার এক টুকরো স্বস্তির জায়গা হলেও রাত নামলেই দৃশ্যপট বদলে যায়। অন্ধকার, নির্জনতা আর ভাঙা বাতির কারণে অনেকের কাছেই হাতিরঝিল তখন ‘ভূতুরে’ এলাকা মনে হয়। হঠাৎ দূর থেকে ভেসে আসে পানিতে কিছু পড়ার শব্দ কিংবা মোটরসাইকেলের বিকট আওয়াজ—সব মিলিয়ে তৈরি হয় এক অস্বস্তিকর পরিবেশ।
নগর পরিকল্পনাবিদদের মতে, কোনো জায়গা ভূতুরে হয়ে ওঠে মানুষের অনুপস্থিতিতে নয়, বরং আলো, নিরাপত্তা ও নজরদারির অভাবে। হাতিরঝিলও তার ব্যতিক্রম নয়।
নষ্ট সিসি ক্যামেরা, অপরাধীদের আনাগোনা
হাতিরঝিলের সবচেয়ে উদ্বেগজনক দিক হলো—অধিকাংশ সিসি ক্যামেরা নষ্ট বা অচল। এ কারণে অপরাধ ঘটলেও তা শনাক্ত করা কঠিন হয়ে পড়ছে।
স্থানীয়দের অভিযোগ, সিসি ক্যামেরা কার্যকর না থাকায় অপরাধীরা আরো বেপরোয়া হয়ে উঠছে।
২০২৪ সালের জুলাই থেকে হাতিরঝিলের সার্বক্ষণিক নিরাপত্তার দায়িত্ব পায় আনসার বাহিনী। বর্তমানে ১১৮ আনসার সদস্য তিন শিফটে দায়িত্ব পালন করছেন বলে জানানো হলেও ৩০২ একর বিশাল প্রকল্পের তুলনায় এ সংখ্যা একেবারেই অপ্রতুল বলে মনে করছেন দর্শনার্থীরা। বিশেষ করে মগবাজার ও এফডিসি সংলগ্ন এলাকায় আনসার সদস্যদের উপস্থিতি খুব কম দেখা যায়।
মশার উপদ্রব ও অপরিষ্কার পানি
নিরাপত্তার পাশাপাশি হাতিরঝিলে বড় সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে মশার উপদ্রব। সন্ধ্যা নামলেই মশার আক্রমণে বসে থাকা তো দূরের কথা, দাঁড়িয়ে থাকাও কষ্টকর হয়ে পড়ে।
পরিবারসহ ঘুরতে আসা মাহফুজ উদ্দিন খান বলেন, ‘এত মশা যে এক মিনিটও বসা সম্ভব নয়। হাতিরঝিলে এসে যে সৌন্দর্য উপভোগ করব, সেটাই আর সম্ভব হয় না।’
ঝিলের পানি অপরিষ্কার ও দুর্গন্ধযুক্ত হয়ে পড়েছে। পানিতে ময়লা-আবর্জনা ভেসে থাকতে দেখা যায়, যা পুরো পরিবেশকে আরো অস্বস্তিকর করে তুলছে। ময়লা পানি ও পানিতে দুর্গন্ধ থাকায় হাতিরঝিল যেন এক দূষিত এলাকা।
এ বিষয়ে ফুটপাতের দোকানদার কাইয়ুম বলেন, হাতিরঝিলের পানি অত্যন্ত অপরিষ্কার। তাই এখানে প্রচুর মশা হয়। ধুপ জ্বালিয়ে তারপর দোকানদারি করতে হয়। আর তা না হলে মশার যন্ত্রণায় টেকা যায় না।
একের পর এক লাশ উদ্ধার
সাম্প্রতিক বছরগুলোতে হাতিরঝিল থেকে সাংবাদিক, নারী, তরুণসহ একাধিক মরদেহ উদ্ধারের ঘটনা এলাকাটির নিরাপত্তা নিয়ে গভীর প্রশ্ন তুলেছে।
২০২২ সালের ১৮ জানুয়ারি হাতিরঝিলে দৈনিক সময়ের আলো পত্রিকার সাংবাদিক হাবীব রহমানের রক্তাক্ত মরদেহ উদ্ধার করা হয়। ২০২৪ সালের এপ্রিলে ফয়েজ ও রবিন নামে দুই তরুণের মরদেহ উদ্ধার হয় ঝিল থেকে।
২০২৪ সালের ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পরদিন সকালে হাতিরঝিল এলাকা থেকে একাধিক লাশ উদ্ধারের ঘটনা ঘটে।
অনেক ঘটনায় আজও রহস্য উদঘাটন হয়নি।
সেনাবাহিনীর পর রাজউক, তারপর অব্যবস্থাপনা
১ হাজার ৯৭১ কোটি টাকা ব্যয়ে ৩০২ একর জমির ওপর গড়ে ওঠা হাতিরঝিল প্রকল্প উদ্বোধন হয় ২০১৩ সালে। সেনাবাহিনীর তত্ত্বাবধানে নির্মিত প্রকল্পটি ২০২১ সালের জুনে রাজউকের কাছে হস্তান্তরের পর থেকেই অব্যবস্থাপনা শুরু হয়েছে বলে অভিযোগ দর্শনার্থীদের। তাদের ভাষ্য, তখন থেকেই নিরাপত্তা শিথিল, রক্ষণাবেক্ষণে ঘাটতির বিষয়টি স্পষ্ট হয়।
গণমাধ্যমে কথা বলার অনুমতি না থাকায় নাম প্রকাশ না করে এক আনসার সদস্য দাবি করেন, ‘আগের তুলনায় এখন পরিস্থিতি অনেক ভালো। আমাদের তৎপরতার কারণে ছিনতাই কমেছে।’ তবে বাস্তব চিত্র তার সঙ্গে মেলে না।
সড়কে চলা বিভিন্ন যানবাহনের আলো ব্যতীত পুরো হাতিরঝিল অন্ধকারে ঢেকে থাকে। হাতিরঝিলে সড়ক বাতি প্রায় ৮০ থেকে ৯০ ভাগই নষ্ট। কাওরানবাজার সড়কের হাতিরঝিলের ব্রিজ থেকে আমবাগান আবাসিক এলাকার গেট পর্যন্ত মোট ১৪টি সড়ক বাতি আছে। যার মধ্যে ৩টি সচল থাকলেও বাকি ১১টিই নষ্ট হয়ে পড়ে আছে।
আরো দেখা যায়, হাতিরঝিলের সড়কের পাশে অসংখ্য ম্যানহোলের ঢাকনা খোলা অবস্থায় আছে। যেখানে মশার আবাসস্থল। ম্যানহলের ভেতরে আবর্জনার স্তুপ তৈরি হয়েছে। এছাড়া রাতের আঁধারে হাঁটতে গিয়েও বিপত্তি ঘটে।
পুলিশের হিসাব আর বাস্তবতার ফারাক
থানা-পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের জানুয়ারিতে ছিনতাইকারী গ্রেপ্তার, মার্চে বিপুল ইয়াবার চালান জব্দসহ একাধিক অপরাধের ঘটনা ঘটেছে হাতিরঝিলে। স্থানীয়রা বলছেন, অনেক ভুক্তভোগী থানায় অভিযোগই করেন না—ভোগান্তির আশঙ্কায়।
স্থানীয়দের অভিযোগ, ছিনতাইকারীরা হাতিরঝিলের সড়ক বাতির তার কেটে দেয় এবং লাইট চুরি করে নিয়ে যায়। ছিনতাই কাজে ধারালো অস্ত্র ব্যবহার করে দিনের বেলা ফ্লাইওভারের নিচে ঘুমিয়ে থাকে আর কিছু ছিনতাইকারী ফ্লাইওভারের ওপর সুরঙ্গের ভেতর লুকিয়ে থাকে।
এসব বিষয়ে হাতিরঝিল থানার ওসি গোলাম মোর্তুজা বলেন, ‘২৪ ঘণ্টায় একাধিক টহল দল কাজ করছে। অতিরিক্ত হোন্ডা মোবাইল টিম, ফ্লাইওভারের ওপর টহল টিম বাড়ানো হয়েছে। হাতিরঝিল থানার দায়িত্ব নেওয়ার পর ৬ ডিসেম্বর থেকে ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত ১৯৪ জনকে গ্রেপ্তার করতে সক্ষম হয়েছি। জানুয়ারির ১ তারিখ থেকে ২০ তারিখ পর্যন্ত হাতিরঝিল থানা এলাকা থেকে বিভিন্ন মামলার শতাধিক আসামি গ্রেফতার করা হয়েছে।’
যুগান্তরের কাছে অভিযোগ করে ওসি বলেন, ‘হাতিরঝিলে সড়ক বাতির বিষয়ে সিটি করপোরেশনে লিখিত অভিযোগ দেওয়া হয়েছে। অধিকাংশ সিসি ক্যামেরা নষ্ট থাকায় অপরাধীদের শনাক্ত করতে বেগ পেতে হয়। পুরো হাতিরঝিল অন্ধকার। লিখিত অভিযোগ দিয়েও কোনো ফল পাওয়া যায়নি।’
রামপুরার মহানগর প্রজেক্টের বাসিন্দা আকবর হোসেন ৫ বছরের মেয়েকে নিয়ে ঝিলে ঘুরতে এসে বলেন, ‘আলো কম, নিরাপত্তা নেই। প্রায়ই শুনি ছিনতাই আর মাদক কারবারের কথা। সন্তান নিয়ে আসতে ভয় লাগে।’



