Logo
Logo
×

সারাদেশ

নরসিংদীতে মানবধর্মের জয়গানে মুখর সাতশত বছরের ঐতিহ্যবাহী বাউল মেলা

Icon

নরসিংদী প্রতিনিধি :

প্রকাশ: ০১ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ০৬:৫৬ পিএম

নরসিংদীতে মানবধর্মের জয়গানে মুখর সাতশত বছরের ঐতিহ্যবাহী বাউল মেলা

ছবি : সংগৃহীত

নরসিংদী শহরের মেঘনা নদীর তীরে ভক্ত ও পুণ্যার্থীর ভিড়ে মুখরিত হয়ে উঠেছে ঐতিহ্যবাহী বাউল মেলা। নরসিংদী শহরের কাউরিয়াপাড়ার শ্রী শ্রী বাউল ঠাকুরের আখড়ায় মাঘী পূর্ণিমা ঘিরে শুরু হয়েছে সাতশ বছরের ঐতিহ্যবাহী বাউল মেলা। যা শুধু একটি ধর্মীয় উৎসব নয়, বরং মানবধর্ম, সাম্য ও আধ্যাত্মিক সাধনার এক অনন্য মিলনমেলা।

গত বুধবার থেকে শুরু হওয়া মেলায় ভারতসহ দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আসা কয়েকশ বাউল সাধকের সমাগম ঘটেছে। বাদ্যযন্ত্রের মৃদু তালে, একতারা-দোতারার সুরে আর গানের গভীর দর্শনে আখড়া প্রাঙ্গণ দিন-রাত মুখর। বাউলরা গাইছেন মানবতার জয়গান-মানুষের ভেতরের মানুষকে জাগিয়ে তোলার আহ্বান। তাদের মতে, এই গান কেবল বিনোদন নয়, এটি শত শত বছর ধরে প্রবাহিত এক আধ্যাত্মিক সাধনার ধারাবাহিকতা।

বাউল সাধকরা জানান, এ আখড়ায় বাউল ঠাকুরের অন্তর্ধান হয়েছিল। বাউল আখড়ায় জগন্নাথ দেবতার মন্দির রয়েছে। মন্দিরে মহাবিষ্ণুর পূর্ণাঙ্গ প্রতিমা, জগন্নাথ দেবতার প্রতিমা, মা গঙ্গার গট, নাগ দেবতার বিগ্রহ ও শিবলিঙ্গ রয়েছে, যা বাউল ঠাকুর নিজে প্রতিস্থাপন করে গেছেন বলে কথিত রয়েছে। পাশে রয়েছে বাউল ঠাকুর ও মাতাজির সমাধি মন্দির। আখড়ার কেন্দ্রে রয়েছে একটি বিশাল আটচালা বৈঠক ঘর। এখানেই সকাল থেকে গভীর রাত পর্যন্ত দেশ-বিদেশের বাউল সাধকরা মিলিত হন। তবে এ বৈঠক প্রচলিত অর্থে বৈঠক সভা নয়। এখানে কথা কম, অনুভব বেশি। সাধকের গাওয়া গানের মর্মার্থ অনুধাবন করাই বৈঠকের মূল উদ্দেশ্য। বৈঠক ঘরে গান গাইছিলেন তিশা বাউল। তিনি বলেন, আমাদের গাওয়া গান সাধারণ বাউল সংগীত নয়। এগুলো মানুষের আত্মশুদ্ধি ও মানবকল্যাণের গান। এই সাধনাই আমাদের পথ দেখায়। আমরা মানুষসহ সর্বজীবের মঙ্গল কামনায় প্রার্থনা করি। বিশ্বের সকল মানুষ যেনো শান্তিতে থাকে তার জন্য প্রার্থনা করি। আমরা গানে গানে মানববন্ধনা করি।

মেলায় ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে শত শত নারী-পুরুষ অংশ নিয়েছেন মহাযজ্ঞে। এখানে সবাই এক পরিচয়ে পরিচিত-মানুষ। সবাই আখড়ায় ঘি প্রদীপ, মোমবাতি ও আগরবাতি জ্বালিয়ে মনোবাসনা পূরণে প্রার্থনা করছেন। ছোটবেলা থেকে নিয়মিত মেলায় আসা ভক্ত কাজল সাহা বলেন, এই মেলা আমাদের শিকড়ের সঙ্গে জড়িয়ে আছে। যজ্ঞের দিন ঘি বাতি দিয়ে পূজা করি। সারা বছর এই সময়টার জন্য অপেক্ষা করি। এখানে সব ধর্মের মানুষ একসঙ্গে আসে, এটাই সবচেয়ে বড় আনন্দ।

আরেক ভক্ত আকাশ চক্রবর্তী বলেন, পরিবারের সাথে ছোট থেকেই এই মেলায় এসেছি। এখানে এসে ঘি বাতি জ্বালিয়ে ঠাকুরের কাছে পরিবার ও দেশের কল্যাণে প্রার্থনা করেছি। পাশাপাশি মেঘনা নদীর তীরে মেলায় ঘুরে আনন্দ উপভোগ করেছি।

বাউল মেলার তত্ত্বাবধায়ক সাধন চন্দ্র বাউল বলেন, প্রতি বছর মাঘী পূর্ণিমায় এই যজ্ঞের মাধ্যমে সকল জীবজগতের কল্যাণ কামনা করা হয়। আমরা মানুষকেই বড় করে দেখি। আমাদের সাধনা মানুষের মন থেকে মলিনতা দূর করা। ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে ভারতসহ দেশের বিভিন্ন জেলা থেকে সবাই এখানে আসে-এটাই বাউল দর্শনের আসল শক্তি।

ধর্মীয় ও আধ্যাত্মিক পরিবেশের পাশাপাশি মেঘনা নদীর তীরে বসেছে রঙিন গ্রামীণ মেলা। নাগরদোলা, চড়কি শিশু-কিশোরদের টানছে। সারি সারি দোকানে বিক্রি হচ্ছে মাটির পুতুল, হাড়ি-কলসসহ নানা তৈজসপত্র। মিষ্টির দোকানে জিলেপি, বাতাসা আর গ্রামীণ খাবারের সমারোহ মেলার আনন্দকে আরও বাড়িয়ে দিয়েছে। সন্ধ্যা নামলে আলো আর মানুষের কোলাহলে নদীর পাড় যেন উৎসবের শহরে পরিণত হয়। এই বাউল মেলা কেবল একটি বার্ষিক আয়োজন নয়; এটি নরসিংদীর সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের জীবন্ত দলিল। এখানে মানুষ আসে প্রার্থনা করতে, গান শুনতে, আবার নিজেদের ভেতরের শান্তিকে খুঁজে পেতে।

Swapno

Abu Al Moursalin Babla

Editor & Publisher

Major(Rtd)Humayan Kabir Ripon

Managing Editor

Email: [email protected]

অনুসরণ করুন