বাড়িতে এলেও চুরি-ছিনতাই করতেন সিরিয়াল কিলার সবুজ
অনলাইন ডেস্ক
প্রকাশ: ২৩ জানুয়ারি ২০২৬, ০৫:৩৬ পিএম
ঢাকার সাভারে গত ৭ মাসে ৬ খুনের ঘটনায় সিরিয়াল কিলার সবুজ শেখ ওরফে মশিউর রহমান সম্রাট তার বাবা-মাকে কোনো ভরণপোষণ দিতেন না। নিজেই বিয়ে করছিলেন। তার একটি ছেলেও ছিল। তবে কোনো দিন সেই স্ত্রী ও সন্তানকে দেখার সুযোগ হয়নি সবুজের বাবা-মায়ের, এমনকি এলাকাবাসীরও। সবুজ ঢাকায় থাকলেও মাঝে মধ্যে ফিরতেন পৈতৃক ভিটায়। এলাকায় ফিরেও চুরি-ছিনতাই করতেন বলে জানান স্থানীয়রা।
সিরিয়াল কিলার মশিউর রহমান সম্রাটের আসল নাম সবুজ শেখ। তিনি মুন্সীগঞ্জ জেলার লৌহজং উপজেলার হলুদিয়া ইউনিয়নের মৌছামান্দ্রা গ্রামের পান্না শেখের ছেলে।
সরেজমিনে বৃহস্পতিবার বিকেলে সবুজের পৈতৃক বাড়ি লৌহজং উপজেলার মৌছামন্দ্রা গ্রামে গিয়ে দেখা যায়, বাড়িটিতে একেবারে সুনসান নীরবতা। কাপড় দিয়ে ঘেড়া একটি টিন ও কাঠ দিয়ে নির্মিত পাটাতন ঘরে বসবাস করেন সবুজের মা মমতাজ বেগম ও বাবা পান্না সেখ। বাড়ির গেটের সামনে রয়েছে একটি ছাগলের ঘর। বেশ কিছু ছাগল লালন-পালন করেন পান্না সেখ। মিডিয়ার ভয়ে পান্না সেখ দিনের বেলায় থাকেন আত্মগোপনে। সবুজের মা মমতাজ বেগম অনেকটা মানসিক ভারসাম্যহীন।
প্রতিবেশীরা জানান, ব্রেইন টিউমারসহ বিভিন্ন রোগে আক্রান্ত মমতাজ বেগম। ছেলের একাধিক খুনের কথা শুনে আরও বেশি অসুস্থ হয়ে পড়েছেন।
সবুজের মা মমতাজ বেগম বলেন, কোনো দিন একটি টাকাও বাবা-মাকে দেয়নি সবুজ। বিয়ে করেছে নিজের ইচ্ছায়। বউ-বাচ্চাও কোনো দিন দেখায়নি।
স্থানীয়রা জানান, সবুজের চার বোনের মধ্যে তিনজনের বিয়ে হয়ে গেছে, একজন এখনো অবিবাহিত। তবে তিনিও বাবা-মায়ের সাথে বসবাস করেন না। ৪ বোন ৩ ভাইয়ের মধ্যে সবুজ দ্বিতীয়। তিন ভাইয়ের মধ্যে সবার বড় সবুজ। এক ভাই ঢাকায় রঙের কাজ করেন, ছোট ভাই অটোরিকশা চালান।
স্থানীয়রা অভিযোগ করেন, সবুজ ছিনতাই, অটোরিকশা ও সাইকেল চুরির মতো বিভিন্ন অপরাধে জড়িত। মাঝে মধ্যে এলাকায় এসে চুরি-ছিনতাই করে পালিয়ে যেতেন। সর্বশেষ এক মাস আগে দুই দিন বাড়িতে থেকে আবার চলে যান।
স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা য়ায়, সবুজের বাবা তার পৈতৃক বাসস্থানে খুব কম সময়ই বসবাস করেছেন। তবে বৃদ্ধ বয়সে প্রায় ১০ বছর আগে এলাকায় ফিরে বসবাস করতে শুরু করছেন। বর্তমানে বাড়িতে বেশ কিছু ছাগল পালন আর শ্রমিকের কাজ করে চলে তার সংসার।
এলাকাবাসী জানান, সবুজের বাবা আগে ঢাকার জুরাইন এলাকায় বসবাস করতেন। তারপর কেরাণীগঞ্জ ও সভারে বসবাস করেন। প্রায় ১০ বছর আগে সবুজের বাবা তার পিত্রালয়ে ফিরে আসলেও সবুজসহ তার অন্যান্য ছেলেরা এলাকায় ফিরে আসেননি। তবে মাঝে মধ্যে ছেলেরাও বাবার বাড়িতে বেড়াতে আসেন। প্রায় এক বছর আগে সবুজ এলাকায় একবার ফিরে আসেন একটি অটোগাড়ি ভাড়া নিয়ে। পরে ওই অটো চালকের গলায় ছুরি ঠেকিয়ে গাড়িটি ছিনতাই করার চেষ্টা করেন। এরপর তার বাবাসহ এলাকার লোকজন সবুজকে ধরে রিহ্যাবে দিয়ে দিয়েছিলেন। কেরানীগঞ্জে দিনের আলো রিহ্যাবে দেওয়া হয়েছিল তাকে। কিন্তু তাকে রিহ্যাবে দেওয়ায় সে তার বাবা ও দুই প্রতিবেশীর বিরুদ্ধে রিহ্যাব হতে পালিয়ে লৌহজং থানায় অভিযোগ দায়ের করেন। গত এক মাস আগে একবার বাড়িতে এসেছিলেন সবুজ। এসে নিজেই নিজের সঙ্গে কথা বলে সবাইকে গালাগালি করেন।
স্থানীয় অষ্টম শ্রেণির ছাত্র আবির বলেন, সবুজ মাঝে মধ্যে দেশে আসতো। আমাদের সাথে ঠিকমতোই কথাবার্তা বলতো। তবে মাঝে মাঝে তাকে নিজের সাথে নিজেই কথা বলতে দেখছি।
সবুজের প্রতিবেশী রাব্বি মিয়া বলেন, সবুজের বাবা এখানে নিয়মিত থাকতেন না। সবুজরা ঢাকায় বড় হয়েছে। মাঝেমধ্যে গ্রামে আসতো। সবুজের বাবা আগে ঢাকার জুরাইন এলাকায়, পরে কেরানীগঞ্জ, এরপর সাভার এলাকায় বসবাস করতেন। সবুজ ছোটবেলায় মাঝেমধ্যে বাবার সাথে এলাকায় ঘুরতে আসতো। তবে সবুজের বাবা প্রায় ১০ বছর আগে তার স্ত্রীকে নিয়ে গ্রামে বসবাস শুরু করেন। সবুজ গত এক বছর আগে বাড়িতে একটি অটোরিকশা ভাড়া করে নিয়ে আসেন। পরে ওই অটো চালকের গলায় ছুরি ধরে অটোরিকশা ছিনতাইয়ের চেষ্টা করলে তার বাবা তাকে রিহ্যাব সেন্টারে দিয়ে আসেন। রিহ্যাব সেন্টার থেকে ফিরে এসে সবুজ তার বাবা ও দুই প্রতিবেশীর বিরুদ্ধে লৌহজং থানায় অভিযোগ দায়ের করেন।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে স্থানীয় এক বৃদ্ধা জানান, সবুজরা ঢাকায় থাকতো। তবে মাঝেমধ্যে ওরা বাড়িতে আসতো সবুজের মা ব্রেইন টিউমারসহ এখন অনেকগুলো রোগে আক্রান্ত। সবুজ ঢাকায় ৬টা খুন করছে- এটা আমরা ইউটিউবে দেখছি। সাংবাদিকরা কয়েকদিন যাবৎ সবুজের বাসায় আসছে। ওর মা খুনের বিষয়গুলো জেনে আরো বেশি অসুস্থ হয়ে পড়ছে।
এ ব্যাপারে হলদিয়া ইউনিয়নের ৫ নং ওয়ার্ডের ইউপি সদস্য সোহেল খান বলেন, সবুজের বাবা পান্না সেখের পৈতৃক বাড়ি আমার এলাকায় হলেও তারা কেউ আমার এলাকার ভোটার না। শুনেছি তারা জুরাইন বসবাস করতো। সেখানেই সবুজ ও তার ভাইবোনদের বেড়ে ওঠা। সবুজের বাবা কিছুদিন যাবৎ আমাদের এলাকায় বসবাস শুরু করেছেন।
তিনি আরও বলেন, সবুজ বাড়ি এলেই এলাকায় চুরি ছিনতাই হতো। এখন আমরা বিষয়টি বুঝতে পেরেছি হয়তো এ ধরনের কাজ সেই করতো।
লৌহজং থানা পুলিশের ওসি মনিরুল ইসলাম বলেন, আমি যতটুকু জানতে পেরেছি সবুজ একটা সাইকো। তার বিরোদ্ধে লৌহজং থানায় কোনো মামলা নেই।



