গণভোটে জনসম্পৃক্ততা বাড়াতে ব্যতিক্রমী উদ্যোগ ডিসির
চট্টগ্রাম প্রতিনিধি :
প্রকাশ: ১৩ জানুয়ারি ২০২৬, ১০:৪৭ পিএম
ছবি : সংগৃহীত
জনগণের মধ্যে গণভোট ও জাতীয় নির্বাচনের বিষয়ে সচেতনতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে চট্টগ্রামের জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ জাহিদুল ইসলাম মিঞা সরাসরি জনগণের দোরগোড়ায় গিয়ে প্রচারণা চালাচ্ছেন।
আজ মঙ্গলবার (১৩ জানুয়ারি)চট্টগ্রামের সাতকানিয়া পৌরসভার বিভিন্ন বাড়ি ও দোকানে তিনি নিজ হাতে লিফলেট বিতরণ করেন। এতে সাধারণ ভোটারদের মধ্যে ভোটদান বিষয়ে উৎসাহ ও উদ্দীপনা বৃদ্ধি পেয়েছে বলে জানিয়েছে স্থানীয় সূত্রগুলো।
সাতকানিয়া পৌরসভার সৌদি প্রবাসী খান আলমের স্ত্রী জান্নাতুল নাঈমের বাড়িতে সদলবলে উপস্থিত হন জেলার শীর্ষ এই কর্মকর্তা। এ সময় বাড়িতে উপস্থিত জান্নাতুল নাঈমের পিতা জাফর আলমের হাতেও তিনি লিফলেট তুলে দেন।
ডিসিকে লিফলেট হাতে বাড়িতে পেয়ে উচ্ছ্বসিত হয়ে ওঠেন মধ্যবয়সী গৃহবধু জান্নাতুল নাঈম। টেলিফোনে এই প্রতিবেদকের সঙ্গে আলাপকালে তিনি বলেন, “ডিসি স্যারকে আমার বাড়িতে দেখে খুব ভালো লেগেছে। তিনি আমাদের গণভোটের লিফলেট দিয়েছেন এবং সবাইকে ভোটকেন্দ্রে গিয়ে নিজের পছন্দমতো ভোট দিতে বলেছেন।”
তার পিতা জাফর আলম বলেন, “ডিসি স্যার তাঁর হাতে থাকা লিফলেট পড়ে আমাদের শুনিয়েছেন।”
এক প্রশ্নের জবাবে তিনি আরও বলেন, “ডিসি স্যার প্রথমে আমাদের গণভোটে ভোট দিতে বলেছেন, পরে সংসদীয় নির্বাচনে ভোট দিতে বলেছেন।” জেলা প্রশাসক কোনো নির্দিষ্ট পক্ষে ভোট দিতে প্ররোচিত করেছেন কি না—এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, “না, না। তিনি সবাইকে নিজের পছন্দমতো ভোট দিতে বলেছেন।”
ছদাহা ইউনিয়নের গ্রাম পুলিশের দফাদার আহমদ কবির বলেন, “আমি প্রায় ২৫ বছর ধরে চাকরি করছি। এর আগে কখনো দেখিনি কোনো জেলা প্রশাসক ভোটের প্রচারণায় এভাবে বাড়ি বাড়ি গিয়ে লিফলেট বিতরণ করছেন।”
সাতকানিয়ার দক্ষিণ কাঁঞ্চনা নূর আহমদ চৌধুরী উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক জয়নাল আবেদীন বলেন, “আমি তো কল্পনাই করিনি জেলা প্রশাসক আমার বাসায় আসবেন। ভোটের প্রচারণা ও নির্বাচনে অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে একজন জেলা প্রশাসক আমার বাড়িতে আসবেন—এটা আমার কল্পনার বাইরে ছিল। তাঁর এই উদ্যোগ দেখে আমি সত্যিই বিস্মিত।”
ভোটারদের মধ্যে উৎসাহ ও উদ্দীপনা বাড়বে কি না—এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, “শতভাগ বাড়বে, ইনশাআল্লাহ। আজ উনি আমাদের বাড়িতে এসেছেন—এটা একেবারেই অকল্পনীয়। এর আগে এমন কেউ কখনো আসেনি।”
সরকারি কর্মকর্তা ও অংশীজনদের সঙ্গে মতবিনিময় সভা শেষে জেলা প্রশাসক সরাসরি মাঠপর্যায়ে গিয়ে এভাবেই গণভোটের প্রচারণায় অংশ নেন। তিনি বাড়ি বাড়ি গিয়ে লিফলেট বিতরণ করেন এবং গ্রাম পুলিশ, স্থানীয় জনগণ ও ব্যবসায়ীদের সঙ্গে তাৎক্ষণিক মতবিনিময়ের মাধ্যমে দোকানে দোকানে প্রচারণা চালান।
এই উদ্যোগ স্থানীয় জনগণের মধ্যে ব্যাপক সাড়া ফেলেছে এবং গণভোট সম্পর্কে আগ্রহ সৃষ্টি করেছে। স্থানীয় জনগণের মতে, এর মাধ্যমে আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোট শান্তিপূর্ণ, নিরপেক্ষ ও অংশগ্রহণমূলকভাবে সম্পন্ন করার বিষয়ে চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসনের দৃঢ় অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত হয়েছে।
উল্লেখ্য, ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোট উপলক্ষে নির্বাচনকালীন আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি জোরদার এবং জনগণের মধ্যে সচেতনতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে আজ মঙ্গলবার চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসনের উদ্যোগে একাধিক কর্মসূচি অনুষ্ঠিত হয়।
আজ দুপুরে চট্টগ্রাম বিমানবন্দর সংলগ্ন এলাকা থেকে সাতকানিয়া উপজেলার উদ্দেশ্যে গাড়িবহরসহ একটি সচেতনতামূলক যৌথ মহড়া পরিচালনা করা হয়। এই মহড়ার মাধ্যমে নির্বাচনকালীন নিরাপত্তা ব্যবস্থা, সমন্বিত কার্যক্রম ও মাঠপর্যায়ের প্রস্তুতির বিষয়গুলো তুলে ধরা হয়।
পরবর্তীতে সাতকানিয়া উপজেলায় সংসদীয় আসন চট্টগ্রাম-১৪ ও চট্টগ্রাম-১৫-এর নির্বাচন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা ও অংশীজনদের নিয়ে একটি মতবিনিময় সভা অনুষ্ঠিত হয়। সভায় উপস্থিত ছিলেন জেলা প্রশাসক ও রিটার্নিং অফিসার মোহাম্মদ জাহিদুল ইসলাম মিঞা, চট্টগ্রামের পুলিশ সুপার মোহাম্মদ নাজির আহমেদ খান, স্থানীয় সরকার বিভাগের উপপরিচালক গোলাম মাঈনউদ্দিন হাসান, অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট সৈয়দ মাহবুবুল হক, ৯ ফিল্ড রেজিমেন্ট আর্টিলারির অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল মাহমুদুন নবীসহ সংশ্লিষ্ট উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ও সহকারী রিটার্নিং কর্মকর্তাবৃন্দ।
সভায় জেলা প্রশাসক বলেন,“এই নির্বাচন আয়োজনের মধ্য দিয়ে আমাদের রাষ্ট্রকে কিছু ফিরিয়ে দেওয়ার সুযোগ এসেছে। যেসব ভাইবোনের আত্মত্যাগ ও রক্তের বিনিময়ে আমরা স্বাধীনতা পেয়েছি এবং নতুন বাংলাদেশে নিঃশ্বাস নিতে পারছি—তাদের আদর্শকে পাথেয় করে এখন সময় রাষ্ট্র ও জনগণের প্রতি আমাদের প্রতিদান দেওয়ার।”
তিনি আরও বলেন,“আমাদের সত্যের পক্ষে ও নিরপেক্ষতার পথে থাকতে হবে। সর্বাত্মক প্রচেষ্টার মাধ্যমে আমরা যেন উৎসবমুখর পরিবেশে একটি স্বচ্ছ, গ্রহণযোগ্য ও আন্তর্জাতিক মানসম্পন্ন নির্বাচন উপহার দিতে পারি—এটাই আমাদের লক্ষ্য।”
পরে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ জাহিদুল ইসলাম মিঞা বলেন, জেলার ঝুঁকিপূর্ণ ভোটকেন্দ্রগুলো ইতোমধ্যেই চিহ্নিত করা হয়েছে এবং সব ভোটকেন্দ্রকে সিসিটিভি ক্যামেরার আওতায় আনা হয়েছে।
সাতকানিয়া উপজেলায় ভোটার উদ্বুদ্ধকরণ কর্মসূচি ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর মহড়া শেষে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে তিনি বলেন,“ইতোমধ্যেই প্রতিটি ভোটকেন্দ্রকে সিসিটিভির আওতায় আনা হয়েছে। যেসব বিষয় ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে বিবেচিত হবে, সে অনুযায়ী বিভিন্ন বাহিনীর সদস্য মোতায়েন থাকবে এবং কঠোর মনিটরিং করা হবে।”
তিনি আরও বলেন,“সাধারণ মানুষের মধ্যে উৎসবমুখর পরিবেশে আন্তর্জাতিকভাবে গ্রহণযোগ্য একটি নির্বাচন আয়োজনের জন্য যা যা করণীয়, আমরা তা করছি।” পুলিশ সুপার তাঁর পাশে রয়েছেন উল্লেখ করে জেলা প্রশাসক বলেন,“বাংলাদেশের সব বাহিনী—সেনাবাহিনী, পুলিশ ও আনসারসহ সংশ্লিষ্ট সব কর্মকর্তা আজ এখানে উপস্থিত আছেন।”
তিনি বলেন,“মানুষের মধ্যে আস্থার জায়গা ফিরিয়ে আনতে আমরা সবাই একসঙ্গে কাজ করছি। আপনাদের সহযোগিতায় আমরা আন্তর্জাতিকভাবে গ্রহণযোগ্য ও উৎসবমুখর পরিবেশে একটি সুন্দর নির্বাচন উপহার দিতে পারব বলে বিশ্বাস করি।”
গণভোট প্রসঙ্গে জেলা প্রশাসক বলেন,“মানুষ তাদের পছন্দমতো ভোট দেবেন। তবে গণভোটের বিষয়ে যে নির্দেশনা ও মানদণ্ড রয়েছে, সেগুলো ভোটারদের জানানো হচ্ছে।”
এ সময় চট্টগ্রামের পুলিশ সুপার মোহাম্মদ নাজির আহমেদ খানসহ সেনাবাহিনী, আনসার ও জেলার ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।



