Logo
Logo
×

সারাদেশ

গভীর রাতে জেলেপল্লীতে মানবিক ডিসি

Icon

নিজস্ব প্রতিবেদক

প্রকাশ: ০৮ জানুয়ারি ২০২৬, ১০:৫৩ এএম

গভীর রাতে জেলেপল্লীতে মানবিক ডিসি

গভীর রাত। সাগরের গর্জন থেমে গেলেও শীতের কামড়ে কাঁপছিল চট্টগ্রামের রানী রাসমনির ঘাট জেলেপল্লীর মানুষ। অন্ধকারে মোড়া সাগরপাড়ে অপেক্ষার প্রহর গুনছিল দরিদ্র জেলে পরিবারগুলো—কখন কেউ তাদের কষ্ট বুঝবে। ঠিক তখনই, রাতের নিস্তব্ধতা ভেঙে তাদের পাশে এসে দাঁড়ালেন জেলার অভিভাবক। কোনো মাইক, কোনো আনুষ্ঠানিকতা নয়—নিজের হাতে শীতার্ত মানুষের গায়ে কম্বল জড়িয়ে দিলেন চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ জাহিদুল ইসলাম মিঞা।

সাগরে মাছ ধরা ছেড়ে সম্প্রতি অটোরিকশা চালানো স্থানীয় সাগর দাসের স্ত্রী বেবি দাসও অন্যদের মতোই অপেক্ষা করছিলেন শীত নিবারণের একটি কম্বলের জন্য।

স্বামীর অভাবের সংসারে সামান্য স্বচ্ছলতা ফেরাতে বেবি দাস স্থানীয়ভাবে ছোটখাটো সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে গান গেয়ে থাকেন।

শ্যাঁ শ্যাঁ করা নীরবতা ভেঙে গাড়ির বহর থেকে নামলেন—সারাদেশে ‘মানবিক ডিসি’ হিসেবে পরিচিত চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ জাহিদুল ইসলাম মিঞা। কোনো ধরনের আনুষ্ঠানিকতা ছাড়াই কাঁপতে থাকা বেবি দাসের গায়ে নিজের হাতে শীতের কম্বল জড়িয়ে দেন জেলার অভিভাবক। এভাবে অপেক্ষমাণ সবাইকেই তিনি নিজ হাতে কম্বল পরিয়ে দেন।

আজ ( বুধবার) সন্ধায় ৩৫ বছর বয়সী বেবি দাসের সঙ্গে কথা হলে প্রথমেই তাকে জিজ্ঞেস করা হয়—এর আগে কখনো তাদের এই প্রত্যন্ত সাগরপাড়ে কোনো জেলা প্রশাসক এসেছিলেন কি না। স্পষ্ট উত্তর দেন তিনি—এর আগে কখনো কোনো জেলা প্রশাসককে তার এলাকায় আসতে দেখেননি।

ডিসির হাতে কম্বল পাওয়ার মুহূর্ত স্মরণ করতে গিয়ে আবেগে আপ্লুত হয়ে পড়েন বেবি দাস। তিনি বলেন, আমি গভীর শীতে কাঁপছিলাম। ডিসি স্যার মোটা একটা কম্বল পরিয়ে দেওয়ার পর হঠাৎ সারা শরীরে গরম অনুভব হলো। আমাদের মতো গরিব মানুষদের আগে কেউ এভাবে ভাইয়ের মতো করে নিজ হাতে কম্বল পরিয়ে দেয়নি।

উত্তর কাট্টলী জেলেপাড়ার ৫১ বছর বয়সী সমীরণ দাসও জেলেপল্লীতে জেলা প্রশাসকের মতো ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার আগমনে ভীষণ উচ্ছ্বসিত। তিনি বলেন, চট্টগ্রাম শহরতলীতে বসবাস করলেও আমাদের দিকে তাকানোর যেন কেউ নেই। জীবনে কখনো কোনো ডিসিকে আমাদের এই সাগরপাড়ে আসতে দেখিনি। গতকাল রাত দেড়টায় ডিসি স্যার নিজে এসে কম্বল বিতরণ করেছেন।

পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠীর প্রতিনিধি হিসেবে ডিসি স্যারের সঙ্গে অল্প সময় কথা বলতে পারায় গর্বিত সমীরণ দাস আরও বলেন, সাগরপাড়ে পানি উন্নয়ন বোর্ডের নিয়ন্ত্রণাধীন কিছু পরিত্যক্ত জমি যদি আমাদের জেলে সম্প্রদায়কে কিস্তিতে বা স্বল্পমূল্যে লিজ দিয়ে বসবাসের সুযোগ দেওয়া হয়, তাহলে আমাদের অনেক উপকার হবে।

ডিসিকে সত্যিকারের মানবিক জেলা প্রশাসক আখ্যা দিয়ে তিনি বলেন, মানবিক কাজ করলে সব মানুষের ভালোবাসা নাও পাওয়া যেতে পারে, তবে সৃষ্টিকর্তার ভালোবাসা ঠিকই পাওয়া যায়।

এ বিষয়ে আকমল আলী ঘাট জেলেপল্লীর জেলে নেতা দুলাল দাস এবং রানী রাসমনির ঘাট জেলেপল্লীর জেলে নেতা খেলন দাসেরও দাবি,শহর থেকে এত দূরের জেলেপল্লীতে গভীর রাতে জেলা প্রশাসক নিজে এসে তাদের পাশে দাঁড়ানো অভাবনীয়। আগে কখনো এমন দেখেন নাই তারা। এভাবে জেলা প্রশাসক গভীর রাতে দুর্গম জেলেপল্লীতে উপস্থিত হয়ে অসহায় জেলে পরিবার, নারী ও শিশুদের হাতে কম্বল তুলে দেন এবং তাদের খোঁজখবর নেন। শহর থেকে দূরের এসব জেলেপল্লীতে গভীর রাতে মানবিক ডিসির উপস্থিতিতে শীতার্ত পরিবারগুলোর মাঝে স্বস্তি নেমে আসে বলে জানান স্থানীয়রা।

এ সময় জেলেপল্লীর বাসিন্দারা তাদের সন্তানদের ভালো স্কুল করার আবেদন জানান। বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করে জেলা প্রশাসক তাৎক্ষণিকভাবে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের নির্দেশ দেন। একই সঙ্গে তিনি প্রত্যেক জেলের কাছ থেকে তাদের সন্তানদের নিয়মিত স্কুলে পাঠানোর প্রতিশ্রুতি গ্রহণ করেন।

জেলেদের উদ্দেশ্যে জেলা প্রশাসক বলেন, জেলেদের জীবনমান পরিবর্তন করতে হবে। বাবা–দাদাদের পুরোনো জীবনধারায় আর চলা যাবে না। সময়ের সঙ্গে তাল মিলিয়ে জীবিকার ধরন পরিবর্তন করে স্বনির্ভর হতে হবে।

তিনি আরও বলেন, জেলেদের টেকসই জীবনমান নিশ্চিত করতে সরকার প্রয়োজনীয় সব সহযোগিতা প্রদান করবে।

জেলেরা জানান, গভীর রাতে জেলা প্রশাসককে একেবারে কাছে পেয়ে তারা কৃতজ্ঞ ও আবেগাপ্লুত। শীতার্ত পরিবারগুলোর কষ্ট লাঘবের পাশাপাশি ভবিষ্যৎ নিয়ে আশার কথা বলায় তারা জেলা প্রশাসকের প্রতি আন্তরিক কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন।

পরবর্তীতে জেলা প্রশাসক সার্কিট হাউজ সংলগ্ন এলাকায় অসহায় ও দরিদ্র মানুষের মাঝে কম্বল বিতরণ করেন। এ সময় নূর কায়াস নামে এক নারী তার তিন সন্তানসহ রাস্তায় অবস্থান করছিলেন। তার এক শিশু প্রচণ্ড শীতে কাঁপছিল। বিষয়টি নজরে এলে জেলা প্রশাসক তাৎক্ষণিকভাবে খাবারের প্রয়োজনে আর্থিক সহায়তা দেন এবং তার বড় সন্তান আছিয়ার পুনর্বাসনের বিষয়ে প্রয়োজনীয় উদ্যোগ গ্রহণের নির্দেশনা দেন।

শীতের তীব্রতা ও অসহায় মানুষের দুর্ভোগ বিবেচনায় জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ জাহিদুল ইসলাম মিঞা মঙ্গলবার (৬ জানুয়ারি) গভীর রাতে আকমল আলী ঘাট, রানী রাসমনির ঘাট ও উত্তর কাট্টলী—এই তিনটি জেলেপল্লীর দরিদ্র জেলে পরিবার এবং সার্কিট হাউজ সংলগ্ন এলাকার ভাসমান ও অসহায় মানুষের মাঝে মোট ৫০০টি কম্বল বিতরণ করেন।

শীতবস্ত্র বিতরণ কার্যক্রমে অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (সার্বিক) মো. শরীফ উদ্দীন, জেলা মৎস্য কর্মকর্তা সালমা বেগম, জেলা ত্রাণ ও পুনর্বাসন কর্মকর্তা মো. ছাইফুল্লাহ মজুমদারসহ জেলা প্রশাসনের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।

Swapno

Abu Al Moursalin Babla

Editor & Publisher

Major(Rtd)Humayan Kabir Ripon

Managing Editor

Email: [email protected]

অনুসরণ করুন