Logo
Logo
×

সারাদেশ

জজ কোর্টের ড্রাইভারের আতঙ্কে আতঙ্কিত থাকে এলাকার মানুষ, চলে মামলা বানিজ্য

Icon

সাব্বির হোসেন, কিশোরগঞ্জ প্রতিনিধি :

প্রকাশ: ০৭ অক্টোবর ২০২৫, ০৫:১০ পিএম

জজ কোর্টের ড্রাইভারের আতঙ্কে আতঙ্কিত থাকে এলাকার মানুষ, চলে মামলা বানিজ্য

ছবি : সংগৃহীত

কিশোরগঞ্জের জেলা জজ কোর্টের জজের গাড়ি চালক মো. সাইফুল ইসলামের বিরুদ্ধে দখলবাজি এবং মামলা বাণিজ্যের অভিযোগ উঠেছে। ক্ষমতার দাপটে দখল করেছেন এলাকার অনেকের জমি। বাদ পরেনি পরিবারের সদস্যরাও। ক্ষমতার অপব্যবহার করে সাধারণ মানুষ এবং পরিবারের অনেককেই ফাঁসিয়েছেন মিথ্যা মামলায়। সাইফুলের আমলনামা এখানেই শেষ নয়। তার ছোটভাই সিরাজুল ইসলাম প্রবাস থেকে ফেরার পর সম্পদের ভাগ দাবি করলে তার বিরুদ্ধেও করা হয় মামলা। গত ৫ বছরে  ৯টি মামলার আসামি হয়েছেন সিরাজুল ইসলাম। কেউ তার বিরুদ্ধে কথা বললেই তাকে মামলায় ফাঁসান সাইফুল- এমন অভিযোগ উঠেছে তার বিরুদ্ধে।

সাইফুলের জুলুমের শিকার হওয়া মানুষদের সংখ্যা যেন দিন দিন বেড়েই চলছে। কিন্তু মামলার ভয়ে কেউ মুখ খুলতেই সাহস করে না। যার কারণে সাইফুলও দিন দিন ক্ষমতার অপব্যবহার করে দখলের রাজত্ব চলমান রেখেছে। তার কারণ তিনি চাকরি করেন জজ কোর্টে। আর এই চাকরির পাওয়ারে সাইফুল যেন হয়ে উঠেছেন এলাকার অঘোষিত ডন। তার আতঙ্কে আতঙ্কিত থাকে এলাকার মানুষ। চাকরির প্রভাব খাটিয়ে বিভিন্ন কারণে এলাকায় অন্তত ৩৫ জনকে মামলায় ফাঁসিয়েছেন। অধিকাংশ মামলায় বাদী করেছেন স্ত্রী, বোন এবং শ্যালিকাকে। অভিযোগ উঠেছে, সাইফুল তার ক্ষমতাকে কাজে লাগিয়ে নিজের সৎ বোন ছালেহার পুকুর, জায়গা-জমিও দখল করেছেন। আর এটা নিয়ে প্রতিবাদ করতে গিয়ে সাইফুলের নির্যাতনের শিকার হয়েছে ছালেহা ও তার সন্তানরা। খেতে হয়েছে মামলা।

জানা যায়, ১৯৯৬ সালে ড্রাইভার পদে সরকারি চাকুরিতে যোগদান করেন সাইফুল। ২০০০ সালে তার পারিবারিক একটি বিরোধ মেটাতে যান তৎকালীন স্থানীয় ইউপি চেয়ারম্যানসহ কয়েকজন ব্যক্তি। সালিশের সিদ্ধান্ত তার পক্ষে না যাওয়ায় ওই সময়েই সালিশান ব্যক্তিদের বিরুদ্ধেই বাড়িঘরে হামলার অভিযোগ এনে ঠুকে দেন মামলা। এখান থেকেই মামলাবাজি শুরু হয় সাইফুলের। এরপর সহোদর ভাই সিরাজুল ইসলামের বিরুদ্ধে ৯ টি এবং সৎ বোনের ছেলে দিনমজুর খাইরুল ইসলামের বিরুদ্ধে করেছেন ১০ টি মামলা। বেশিরভাগ মামলায় অভিযোগ প্রমাণিত না হওয়ায় খালাসও পেয়েছেন তারা। আবার জায়গা-জমির বৈধ কাগজপত্র থাকার পরও মিথ্যা মামলায় জেলে পাঠিয়ে সেই জমি দখল করে নিয়েছেন সাইফুল। তার অত্যাচারে অতিষ্ঠ হয়ে জেলা প্রশাসক, পুলিশ সুপার ও উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার কাছে লিখিত অভিযোগ করেছেন ভুক্তভোগী খাইরুল ইসলাম। এলাকাবাসীর উদ্যোগে করা হয় মানববন্ধন। এসবেও কোন প্রতিকার পায়নি অসহায় পরিবারটি। তাদের বাড়ি কিশোরগঞ্জ সদর উপজেলার মুসলিমপাড়া গ্রামে।

সাইফুলের সৎ বোন স্বামী হারা ছালেহা বেগম অভিযোগ করে বলেন, ‘সাইফুল আমার সৎ ভাই’ আমার পৈতৃক সম্পত্তি জোর করে দখল করতে চায়। আমি সম্পত্তি দিতে রাজি না হওয়ায় আমার ছেলে, মেয়ের জামাইকে মামলায় ফাসিয়ে জেল খাটিয়েছে। সন্ত্রাসী বাহিনী দিয়ে আমার জায়গা দখল করেছে। আমার উপর অনেক নির্যাতন করেছে। সে জজ কোর্টে চাকরি করে। সেই ক্ষমতায় বহু বছর ধরে এভাবে নির্যাতন করতেছে। আমি আমার জায়গা ফেরত পেতে চাই।' 

সাইফুলের ভাগিনা খায়রুল ইসলাম অভিযোগ করে বলেন, ‘সাইফুল মামা আমার জায়গা-জমি জোরপূর্বক দখল করে রেখেছে। তার ভয়ে এলাকায় কেউ মুখ খুলে না। আমার নামে একের পর এক মামলা দিচ্ছে। আমি এর বিচার চেয়ে পুলিশ সুপার, উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা এবং জেলা প্রশাসকের কাছে লিখিত অভিযোগ দিয়েছি। কিন্তু কোনো প্রতিকার পাইনি। আমি ন্যায় বিচার চাই।’

সাইফুলের আরেক ভাগিনা ছেলে নাসির উদ্দিন বলেন, ‘সাইফুল ইসলামের অপকর্মের প্রতিবাদ করতে গেলে মামলা করে। তার স্ত্রী, বোন, শ্যালীকাকে দিয়ে মামলা করায়। সে প্রায় অর্ধশতক মানুষের বিরুদ্ধে মামলা করে হয়রানী করেছে। তাই মানুষ তার বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করতেও সাহস করে না। আমরা এর ন্যায় বিচার চাই।’

স্থানীয় এলাকার বাসিন্দা আব্দুল লতিফ বলেন, ‘খায়রুল ইসলামের জায়গা তার নামে খারিজ করা। বৈধ কাগজপত্রও আছে। সেই জায়গা দখলে নিয়ে গেছে তার মামা সাইফুল। সাইফুল জেলা জজ কোর্টে চাকরি করে। সেই ক্ষমতা কাজে লাগিয়ে আমার বাবা-চাচাসহ যারা সালিশে উপস্থিত ছিল তাদের বিরুদ্ধে মিথ্যা মামলা দিয়ে হয়রানী করেছে। মানুষ তার বিরুদ্ধে কথা বলতে ভয় পায়। কথা বললেই মামলার হুমকি দেয়, পুলিশ দিয়ে হয়রানী করে।’

সাইফুলের ভাগ্নের স্ত্রী আকলিমা আক্তার বলেন, ‘সাইফুল জজ কোর্টে চাকরি করে। সেই ক্ষমতা কাজে লাগিয়ে খায়রুলের জমি দখল করে নিয়ে গেছে। সাইফুলের বিরুদ্ধে আদালতে সাক্ষ্য দেওয়ায় তার মা,বউ, ভাগ্নি ও তার শালি সকলে মিলে আমাকে মারতে এসেছিল। আমাকে যেখানে দেখে সেখানেই মারধরের হুমকি দেয়। খায়রুল প্রতিবাদ করলে তারেও মারতে যায়। এলাকাবাসীও মামলার ভয়ে কিছু বলে না।’

সাইফুল ইসলামের ছোট ভাই সিরাজুল ইসলাম বলেন, ‘বিদেশ থেকে ফেরার পর আমি যখন আমার সম্পদের ভাগ চাই, তখন একের পর এক মামলা করে আমার নামে। গত ৪ বছরে আমার বিরুদ্ধে ৯টি মামলা করেছে। মাদক, অপহরণ, শ্লীলতাহানীর মতো মামলা হয়েছে আমার নামে।  প্রতি বছর ৩-৪বার করে জেল খাটতে হয়। প্রতি মাসে ৫-৬টি হাজিরা দিতে হত। আমার ভাগের জমির প্রাপ্য অংশ আমাকে বুঝিয়ে দেওয়া হয়নি।’

অভিযোগের ব্যাপারে জানতে চাইলে ড্রাইভার সাইফুল ইসলাম বলেন, ‘আমার বিরুদ্ধে আনিত সকল অভিযোগ মিথ্যা এবং ভিত্তিহীন। আমি সবসময় ব্যস্ত থাকি। তবে তার স্ত্রী বা বোন কখন কার বিরুদ্ধে কয়টা মামলা করেছেন এ বিষয়ে কিছুই জানেন না বলে দাবি করেন সাইফুল। কাজের চাপে খুব একটা বাড়িতে যেতে পারিনা, মাঝে মধ্যে গেলেও কিছুক্ষণ থেকেই শহরে চলে আসি। এই সময়ের মধ্যে কাউকে কিছু করাও সম্ভব নয়।’

এ বিষয়ে জেলা আইনজীবী সমিতির সাধারণ সম্পাদক অ্যাডভোকেট আমিনুল ইসলাম বলেন, ‘যদি কোনো ব্যক্তি কারও বিরুদ্ধে হয়রানীমূলক মিথ্যা মামলা করে এবং সেটা যদি মিথ্যা মামলা প্রমাণীত হয়, তাহলে ভুক্তভোগী ব্যক্তি মিথ্যা মামলাকারীর বিরুদ্ধে মানহানী, ক্ষতিপূরণের দাবিতে মামলা করতে পারেন।

Swapno

Abu Al Moursalin Babla

Editor & Publisher

Major(Rtd)Humayan Kabir Ripon

Managing Editor

Email: [email protected]

অনুসরণ করুন