শহীদ ওয়াসিম আকরামের পিতা-মাতার প্রত্যাশা : স্বপ্নের বৈষম্যহীন বাংলাদেশ
কক্সবাজার প্রতিনিধি :
প্রকাশ: ১৬ জুলাই ২০২৫, ০২:৫০ পিএম
শহীদ ওয়াসিম আকরাম, জুলাই গণঅভ্যত্থানের অন্যতম মহানায়ক। জুলাই-আগস্ট অভ্যুত্থানে দ্বিতীয় শহীদ তিনি। যাঁর রক্তের স্রোতধারায় পতন ঘটে দীর্ঘ স্বৈরশাসনের। গত বছর ১৬ জুলাই বিকালে চট্টগ্রামের ষোলশহর এলাকায় পুলিশ ও সরকারি দলের দূর্বৃত্তদের ছোঁড়া গুলিতে তিনি নিহত হন। তাঁর মৃত্যুর মধ্য দিয়ে আন্দোলন সারাদেশে দাবালনের মতো ছড়িয়ে পড়ে। আর ঠিক ২০ দিন পরই ফ্যাসিবাদী সরকারের পতনের মাধ্যমে অভ্যদোয় হয় নতুন এক বাংলাদেশের। কিন্তু দীর্ঘ এক বছর ধরে সন্তান হারানোর শোকস্মৃতি বয়ে বেড়াচ্ছে ওয়াসিমের বাবা-মা। তাদের প্রত্যাশা, ওয়াসিম সহ সকল শহীদের হত্যার বিচারের পাশাপাশিই আত্মদানের স্বপ্নের বৈষম্যহীন বাংলাদেশ প্রতিষ্টা পাবে।
শহীদ ওয়াসিম আকরামের প্রথম মৃত্যু বার্ষিকীর ঠিক আগের দিন মঙ্গলবার দুপুরে আলাপকালে পিতা শফিউল আলম ও মা জোসনা বেগম এমন স্বপ্নের প্রত্যাশা করেছেন।
কক্সবাজারে পেকুয়া উপজেলার সদর ইউনিয়নের মেহেরনামা গ্রাম। সরেজমিনে দেখা গেছে, সেখানকার শান্ত-স্নিগ্ধ গরিবেশের কবরে শুয়ে আছেন শহীদ ওয়াসিম। মেহেরনামার প্রকৃতির কোলে বেড়ে উঠা ওয়াসিম স্কুলজীবন থেকে ছাত্রদলের রাজনীতিতে জড়িয়ে পড়েন। বিগত ২০১৭ সালে মেহেরনামা উচ্চ বিদ্যালয় থেকে এসএসসি পাশের পর ভর্তি চট্টগ্রামের বাকলিয়া ডিগ্রী কলেজে। গত ২০১৯ সালে এইচএসসি পাশের পর ভর্তি হন চট্টগ্রাম সরকারি কলেজ; সেখান থেকে গতবছর তিনি অনার্স পাশ করেন। পড়ালেখার পাশাপাশি ওয়াসিম সর্বশেষ ছাত্রদলের চট্টগ্রাম সরকারি কলেজ আহবায়ক কমিটির সদস্য, পেকুয়া উপজেলার আহবায়ক কমিটির সদস্য ছিলেন। সংগঠনের প্রতিটি কর্মসূচীতে যেমন অংশ নিতেন; তেমনি জুলাই-আগস্ট অভ্যুত্থানের সম্মুখ সারিতে থেকে লড়াইয়ে ছিলেন।
গত বছর জুলাইয়ের প্রথম দিক থেকে যখন সারাদেশে ছাত্র-জনতার আন্দোলন তুঙ্গে উঠে তাতে চট্টগ্রামও অগ্নিগর্ভ রূপ ধারণ করে। এমন পরিস্থিতিতে গত বছর ১৬ জুলাই চট্টগ্রামের ষোলশহর এলাকায় পুলিশ ও দূর্বৃত্তদের সাথে সংঘর্ষে গুলিবিদ্ধ হয়ে ওয়াসিম নিহত হন।
ওয়াসিমের শৈশব-কৈশোরের বন্ধু, সহপাঠী ও দলীয় নেতাকর্মিরা বলেন, ওয়াসিম আজ নিজ সংগঠনের নেতাকর্মিদের পাশাপাশি মুক্তিকামী মানুষের কাছে চেতনার অগ্নিমশাল। তাঁর শৈশব-কৈশোরের বন্ধু ও নিজ এলাকার নেতাকর্মিরা বলছেন, খুবই বন্ধুবৎসল আর অমায়িক মানুষ ছিলেন। কারও সঙ্গে কোনদিন রূঢ় ব্যবহার করেননি। ছাত্র রাজনীতির পাশাপাশি ক্রীড়া ও সংস্কৃতি অনুরাগীও ছিলেন তিনি। ওয়াসিমের মৃত্যুতে এখনো তাদের হৃদয়ে রক্তক্ষরণ ঘটে।
বুধবার ওয়াসিমের প্রথম শাহাদাত বার্ষিকী; একদিন আগেই তাঁর কবর দেখতেন যান বাবা শফিউল আলম। সেই সময় সৌদি আরবে প্রবাসে থাকা বাবার সঙ্গে তাঁর সর্বশেষ কথা হয় গত বছরের ১৩ জুলাই।
শহীদ ওয়াসিমের পিতা শফিউল আলম জানান, বাড়ীতে আসার কথা বলে সেইদিন বাবার কাছ থেকে টাকা চেয়ে নেন। কিন্তু তার দুইদিন পর আন্দোলনে অংশগ্রহণকারি এক সহযোদ্ধার কাছ থেকে মোবাইল কলে জানতে পারেন জীবনের সবচাইতে কঠিন খবরটি।
গত এক বছর ধরে বুকে শোকের পাথর চাপা কষ্ট নিয়ে দিন কাটছে শহীদ ওয়াসিমের মা জোসনা বেগমের। এখনো ছবি নিয়ে স্মৃতি হাতড়ান শহীদ সন্তানের। সন্তান হত্যার বিচার চেয়ে দিন কাটছে তার।
শহীদ ওয়াসিম সহ জুলাই-আগস্ট অভ্যুত্থানে সকল শহীদের হত্যার বিচার চান তাঁর বাবা। তিনি বলেন, গণতন্ত্র পুনরুদ্ধার সহ বৈষম্যহীন বাংলাদেশের স্বপ্নে শহীদদের আত্মদান। সেই স্বপ্ন বাস্তবায়নে সরকারসহ সংশ্লিষ্ট কাজ করবেন এমনটা আশা তাঁর। তবে দেশের বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ে অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন তিনি।
এদিকে ছাত্রদল নেতা শহীদ ওয়াসিমের স্বপ্ন বাস্তবায়ন এবং স্মৃতিকে অম্লান রাখতে নানা উদ্যোগ ও পরিকল্পনার কথা বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সমন্বয়কেক পাশাপাশি নিজ সংগঠনের নেতারা। তারা বলছেন, ওয়াসিম সহ শহীদদের বিচার যেমন দ্রুত বাস্তবায়ন করতে হবে। তবে বৈষম্যহীন বাংলাদেশ বাস্তবায়িত হলেই শহীদের স্বপ্নসাধ পূরণ হবে।
বুধবার সকালে কেন্দ্রীয় ছাত্রদলের সাধারণ সম্পাদক নাছির উদ্দীন ও সিনিয়র সহসভাপতি আবু আফসান মোহাম্মদ ইয়াহিয়ার নেতৃত্বে ছাত্রদলের একটি প্রতিনিধি দল পেকুয়া মেহেরনামায় ওয়াসিমের কবর জিয়ারত করেন। এর আগে বাড়িতে গিয়ে ওয়াসিমের বাবা-মায়ের সাথে দেখা করেন তারা। এসময় পরিবারের খোঁজ খবর নেন।
কবর জিয়ারত শেষে নাছির উদ্দীন সাংবাদিকদের জানান, মৃত্যু বার্ষিকীতে ওয়াসিমকে যেভাবে স্মরণ করার কথা ছিলো সেরকম কোন আয়োজন সরকারের পক্ষ থেকে চোখে পড়েনি, যা আমাদের হতাশ করেছে।
তিনি দাবী করেন, যে স্বপ্ন বুকে ধারণ করে ওয়াসিম মৃত্যুকে আলিঙ্গন করে নিয়েছিল সেই স্বপ্ন বাস্তবায়ন হচ্ছে না৷ আমরা মনে করি, বর্তমান সরকার রাজনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকে বিবেচনা করছে ওয়াসিমকে। যার কারণে সবখানে বৈষম্যের শিকার হচ্ছে শহীদ ওয়াসিম।
এদিকে দুপুর ১ টা পর্যন্ত ছাত্রদল ছাড়া অন্যকোন রাজনৈতিক বা সামাজিক সংগঠনকে শ্রদ্ধা জানাতে দেখা যায়নি৷ চোখে পড়েনি উপজেলা প্রশাসনের কোন আয়োজনও।



