কক্সবাজার
জলবায়ু উদ্বাস্তু পুনর্বাসন প্রকল্প থেকে ৪৪০৯ জনের নাম বাতিল
কক্সবাজার প্রতিনিধি :
প্রকাশ: ১৫ জুলাই ২০২৫, ০৫:২৭ পিএম
কক্সবাজারের বাঁকখালী নদীর ঘেঁষে খুরুশকুল এলাকায় গড়ে উঠো জলবায়ু উদ্বাস্তু পুনর্বাসন প্রকল্পে পুনর্বাসনের জন্য বরাদ্দ হওয়া প্রভাবশালী ৪ হাজার ৪০৯ জনের তালিকা বাতিল করা হয়েছে। আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে এ বরাদ্দের তালিকায় স্থানীয় প্রভাবশালীর সংখ্যাই বেশি, যার অধিকাংশ তৎকালীন শাসক দলের নেতা।
সোমবার প্রধান উপদেষ্টার কার্যালয়ের পরিচালক ডা. মোহাম্মদ মহিবুল হাসান স্বাক্ষরিত এক প্রজ্ঞাপনে এমন তথ্য জানা গেছে।
এতে বলা হয়েছে, কক্সবাজারের খুরুশকুলে জলবায়ু উদ্বাস্তু পুনর্বাসন প্রকল্পে নির্মিত বহুতল ভবনের উপকারভোগী বাছাই, সরকারি ফ্ল্যাট হস্তান্তর ও রক্ষাণাবেক্ষণ নীতিমালা, ২০২৫ অনুযায়ী এ প্রকল্পে পুনর্বাসনের জন্য ২০১১ সালে প্রণীত ৪ হাজার ৪০৯ জনের তালিকা ত্রুটিপূর্ণ, প্রশ্নবিদ্ধ ও পক্ষপাতদুষ্ট হওয়ায় বাতিল করা হয়েছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, ২০১৭ সালের কক্সবাজার শহরের কাছে খুরুশকুল এলাকায় এই বিশেষ আশ্রয়ণ প্রকল্পের কাজ শুরু হয়। সে সময়ের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এই প্রকল্পের কাজ উদ্বোধন করেন। ২৫৩ একর জমিতে পুনর্বাসন, বাফার, শুঁটকি মহল এবং পর্যটন-এই চারটি জোন মিলিয়ে হচ্ছে এই প্রকল্প। এরমধ্যে পুনর্বাসন জোনে ১১২ একর জমিতে ১২৯টি পাঁচতলা ভবন তৈরি হচ্ছে। প্রতিটি পাঁচতলা ভবনে রয়েছে ৪৫৬ বর্গফুট আয়তনের ৩২টি করে ফ্ল্যাট।
সে সময় বলা হয়েছিল, সরকারের নিজস্ব অর্থায়নে ১৮০০ কোটি টাকা ব্যয়ের এ প্রকল্পের পুরো কাজ শেষ হলে এসব ভবনে বসবাসের সুযোগ পাবে ৪ হাজার ৪০৯টি জলবায়ু উদ্বাস্তু পরিবার, যারা কক্সবাজার বিমানবন্দরের পালে ফদনার ডেইল, কুতুবদিয়া পাড়া ও সমিতি পাড়ায় মানবেতর জীবন কাটাচ্ছেন বহু বছর ধরে। ১৯৯১ সালের ঘূর্ণিঝড়ের পর বাস্তুহারা মানুষ বিভিন্ন জায়গা থেকে এসে কক্সবাজার বিমানবন্দরের পাশে এসব এলাকায় সরকারি খাস জমিতে আশ্রয় নেয়। পরে বিভিন্ন সময়ে প্রাকৃতিক দুর্যোগে ক্ষতিগ্রস্ত আরও অনেক পরিবার যোগ দেয় তাদের সঙ্গে।
২০১৪-২০১৫ অর্থবছরে জলবায়ু উদ্বাস্তুদের আবাসনের জন্য খুরুশকুলে নতুন এই বিশেষ আশ্রয়ন প্রকল্প গ্রহণ করা হয়। ভূমি উন্নয়নের কাজ শেষে শুরু হয় ভবন নির্মাণ। প্রকল্পের ১২৯টি আবাসিক ভবনের মধ্যে ১২২টির নির্মাণকাজ ইতোমধ্যে সম্পন্ন হয়েছে। সশস্ত্র বাহিনী বিভাগের মাধ্যমে করা প্রথম পর্যায়ের ২০টি ভবনের মধ্যে ১৯টির কাজ শেষে ২০২০ সালের ২৩ জুলাই ৬০০ পরিবারকে ১০০১ টাকার নামমাত্র মূল্যে ফ্ল্যাটের চাবি বুঝিয়ে দেওয়া হয়েছে।
কক্সবাজারের জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ সালাহ্উদ্দিন বলেন, ‘ফ্ল্যাট বরাদ্দে নানা অনিয়ম বিষয়ে আমরা প্রধান উপদেষ্টার দপ্তরকে আগেই জানিয়েছি। এর পরিপ্রেক্ষিতে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।’
জেলা প্রশাসন সূত্রে জানা যায়, দেশে প্রথমবারের মতো নেওয়া জলবায়ু উদ্বাস্তুদের এ আবাসন প্রকল্পে প্রকৃত উদ্বাস্তু অধিকাংশেরই ঠাঁই হয়নি। বরং রাজনৈতিক প্রভাবশালী অনেকেই প্রকল্পের ফ্ল্যাট বরাদ্দ পেয়েছেন। পুনর্বাসনের জন্য ২০১১ সালের দিকে ২১ মহল্লার ৪ হাজার ৪০৯টি পরিবারকে বরাদ্দ দিয়ে চূড়ান্ত তালিকা তৈরি করা হয়। কক্সবাজার পৌরসভার ১ নম্বর ওয়ার্ডের সাবেক কাউন্সিলর এসআইএম আকতার কামাল, জেলা প্রশাসন ও বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষের প্রতিনিধিরা যৌথভাবে এ তালিকা প্রণয়ন করেন। ২০১৬ সালে ওই তালিকা হালনাগাদ করা হয়। এ সময় বাদ দেওয়া হয় এক হাজারেরও বেশি উদ্বাস্তুকে।
ফ্ল্যাট বরাদ্দ নীতিমালা অনুযায়ী, তালিকায় কক্সবাজার পৌরসভার ১ নম্বর ওয়ার্ডের ২১ মহল্লার হতদরিদ্র ভূমিহীনদের অগ্রাধিকার পাওয়ার কথা। অথচ অনুসন্ধানে দেখা যায়, এ তালিকায় যেমন আছেন তৎকালীন সরকারি দলের লোকজন, তেমনি আছেন এখনকার বড় দলের প্রভাবশালীরাও।
ফ্ল্যাট পেয়েছেন কক্সবাজার পৌরসভার ১ নম্বর ওয়ার্ডের সাবেক কাউন্সিলর আকতার কামালের বোন মিনা বেগম ও তাঁর স্বামী খালেদ মোশাররফ। এ দম্পতি কুতুবদিয়ায় থাকেন। তারা ২১ মহল্লার বাসিন্দা নন। ফ্ল্যাট বরাদ্দ পেয়েছেন ১ নম্বর ওয়ার্ড আওয়ামী লীগের তৎকালীন সভাপতি আতিক উল্লাহ, সাংগঠনিক সম্পাদক আজিজ উদ্দিন, ওয়ার্ড যুবলীগের তৎকালীন সাধারণ সম্পাদক নজরুল ইসলাম, আওয়ামী লীগ নেত্রী টিপু সুলতানা ও ২ নম্বর ওয়ার্ড স্বেচ্ছাসেবক লীগের তৎকালীন যুগ্ম সম্পাদক মো. হানিফ। এ ছাড়া ফ্ল্যাট বরাদ্দ নিয়েছেন কাউন্সিলরের ঘনিষ্ঠজন হিসেবে পরিচিত খোরশেদ, আবু তাহের, সিরাজুল করিম ও জিল্লুল করিম। এ ছাড়া ফ্ল্যাট পেয়েছেন বিএনপির ১ নম্বর ওয়ার্ড পূর্ব শাখার সভাপতি আবুল বশর, পশ্চিম শাখার সভাপতি সাবেরের মেয়ে তানিয়া।
ফ্ল্যাট বরাদ্দ নেওয়ার জন্য তালিকাভুক্ত হয়েছেন কক্সবাজার জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ও সাবেক পৌর মেয়র মুজিবর রহমান, ১ নম্বর ওয়ার্ড আওয়ামী লীগের তৎকালীন যুগ্ম সম্পাদক সরওয়ার আলম ও জেলা যুবদলের তৎকালীন আপ্যায়নবিষয়ক সম্পাদক দিদারুল ইসলাম। এ ছাড়া তালিকায় স্বামী-স্ত্রী দু’জনের নামেই ফ্ল্যাট বরাদ্দ দেওয়ার ঘটনা ঘটেছে।



