ফজর ধর্ষণ করে, পরে ভিডিও করে তার ভাই: ভুক্তভোগী নারী
কুমিল্লা প্রতিনিধি :
প্রকাশ: ৩০ জুন ২০২৫, ০৯:৪৪ এএম
ছবি - অভিযুক্ত ফজর আলী
কুমিল্লার মুরাদনগর উপজেলায় ধর্ষণের শিকার ওই নারী অভিযোগ করেছেন, ফজর আলী রাতের বেলায় এসে দরজা ভেঙে তাকে ‘যৌন নির্যাতন’ করেছেন। এর কিছু পরেই তার ভাই এসে তাদের মারধর ও ভিডিও করেন।
ধর্ষণ ও ভিডিও করে তা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে দেওয়া ও মারধরের ঘটনার বিচারও চেয়েছেন ওই নারী।
ওই নারী বলেন, বৃহস্পতিবার রাত সাড়ে ১১টার দিকে খালি বাড়িতে ফজর আলী আমার ঘরের দরজা খোলার জন্য ডাক দেয়। আমি না খোলায় সে দরজাটা ভেঙে ফেলে। ভেতরে ঢুকে আমার উপর অত্যাচার করে।
“এর মধ্যেই সাত-আটজন লোক আমার ঘরে ঢুকে ফজর আলীকেও মারছে, আমাকেও মারছে। তার ছোট ভাই শাহ পরানই ইন্ধন দিয়েছে। পরদিন (শুক্রবার) আমি থানায় একটা মামলা করেছি।”
ওই নারী দিন ১৫ আগে বাবার বাড়ি বেড়াতে আসেন, তার স্বামী প্রবাসী। সুদে টাকা ধার নেওয়ার সূত্রে ফজর আলীর সঙ্গে আগে থেকেই তার পরিবারের যোগাযোগ ছিল। সে কারণেই পরিচয়, এর বাইরে ‘আর কোনো সম্পর্ক’ নেই বলেও দাবি করেন ওই নারী।
এদিকে এদিন কুমিল্লা জেলা পুলিশের সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছে, বৃহস্পতিবার রাতে মুরাদনগরের একটি গ্রামে এক প্রবাসীর স্ত্রীকে ধর্ষণের অভিযোগে ফজর আলী নামে এক ব্যক্তি আটক ও পিটুনির শিকার হয়। পরে ফজর সেখান থেকে পালিয়ে যান। ঘটনাস্থলে কিছু ব্যক্তি ভুক্তভোগীর ভিডিও ধারণ করে সোশাল মিডিয়ায় ছড়িয়ে দেন। পরে মুরাদনগর থানা পুলিশ ঘটনাস্থলে উপস্থিত হয়ে ‘আইনানুগ ব্যবস্থা’ গ্রহণ করে।
কুমিল্লার বিভিন্ন স্থানে অভিযান চালিয়ে অনিক, সুমন, রমজান ও বাবু নামের চারজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।
কুমিল্লার বিভিন্ন স্থানে অভিযান চালিয়ে অনিক, সুমন, রমজান ও বাবু নামের চারজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।
মুরাদনগর থানার ওসি জাহিদুর রহমান বলেন, ফজর আলীকে আসামি করে শুক্রবার মামলা করেছেন এক হিন্দু নারী। বাদীর মেডিকেল পরীক্ষা করা হয়েছে।
এ ঘটনার ভিডিও ভাইরাল হওয়ার পর তা নিয়ে ব্যাপক সমালোচনা ও প্রতিবাদের মধ্যে ঢাকার সায়েদাবাদ এলাকা থেকে শনিবার ভোরে ফজর আলীকে গ্রেপ্তার করা হয়।
এছাড়া কুমিল্লার বিভিন্ন স্থানে অভিযান চালিয়ে অনিক, সুমন, রমজান ও বাবু নামের চারজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। ভিডিও ছড়িয়ে দেওয়ার অভিযোগের আলাদা মামলায় তাদের কারাগারে পাঠিয়েছে পুলিশ।
‘মেয়েকে মারল আবার ভিডিও করল কেন’
মুরাদনগরের এ ঘটনার একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়েছে। তারপরই তোলপাড় শুরু হয়।
ভিডিওতে দেখা যায়, বিবস্ত্র অবস্থায় ওই নারীকে বেশ কয়েকজন যুবক মারধর করছেন। নারীটি অনেক আকুতি-মিনতি কান্নাকাটি করলেও যুবকরা তাকে মারতে থাকে এবং ভিডিও ধারণ করতে থাকে।
রোববার সকালে ভুক্তভোগী ওই নারীর বাবার বাড়ি গিয়ে দেখা যায়, শুনশান নিরবতা। বেলা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে সেখানে আশপাশের পাড়া-প্রতিবেশীরা আসেন। তারপর সেখানে সংবাদকর্মী, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা আসেন।
ভুক্তভোগী নারীর সত্তরোর্ধ্ব বাবা একজন জেলে। খালবিলে মাছ ধরে বিক্রি করেন। মেয়ের ঘটনায় তিনি অনেকটাই নির্বাক। ঘটনার রাতে তিনি ও তার স্ত্রী একটি ধর্মীয় অনুষ্ঠানে বাড়ির বাইরে ছিলেন। বাড়িতে মেয়ে একাই ছিলেন।
ওই নারীর বাবা বলছিলেন, “ওই রাতে আমরা একটা অনুষ্ঠানে ছিলাম। চিৎকার শুনে এসে দেখি, অনেক মানুষ উঠানে। ঘরে কেউ ফজর আলীকে মারছে, কেউ আমার মেয়ের ভিডিও করছে। পরে আশপাশের লোকজন চলে এলে যারা মারছিল তারা চলে যায়। কেউ ফজর আলীকেও নিয়ে যায়। এসব আসলেই বলার মতো না।
এ সময় ভুক্তভোগী ওই নারী বলেন, শাহ পরান (ফজরের ছোট ভাই) ভাবত ফজর আলীর (৩৮) সঙ্গে তার সম্পর্ক আছে। এ কারণে কয়েকদিন আগে শাহ পরান বাড়ি এসে তার মোবাইল ফোন দেখতে চায়। তখন দিতে অস্বীকার করলে মোবাইল কেড়ে নিয়ে মাটিতে আছড়ে ফেলে চলে যান। এ ঘটনা তিনি ফজর আলীকে জানিয়েছিলেন। এ নিয়ে দুই ভাইয়ের মধ্যে ‘দ্বন্দ্ব হতে পারে’ বলে ধারণা করেন ওই নারী।
তিনি বলেন, “ফজর আলীর সঙ্গে খারাপ সম্পর্ক ছিল না, কিন্তু যে দিন রাতে এসেছে খারাপ উদ্দেশ্যেই এসেছে। না হলেও তো দিনের বেলাতেই আসত। সে আসার দুই-তিন মিনিট পরেই তারা কয়েকজন এসে মারধর শুরু করে। কিছু বলার আগেই ভিডিও করা শুরু করে। পরে আমি চিৎকার দিলে আশেপাশের বাড়ি থেকে লোকজন আসে।
“যারা ভিডিও করেছে তাদের চেহারা চিনি; কিন্তু পরিচয় জানি না। তাদের নামে থানায় মামলা করেছি। তারা অন্যায় করছে- আশা করছি বিচার পাব।”
স্থানীয় এক বাসিন্দা বলেন, “বৃহস্পতিবার রাতে ওই বাড়িতে অনেক শব্দ হচ্ছিল। সেখানে গিয়ে দেখি কিছু লোক ওই নারীকে মারধর ও ভিডিও করছে। কিন্তু কিছুক্ষণ পর যখন বুঝতে পারি, ওই নারীর ওপর নির্যাতন চালানো হয়েছে। তখন লোকজন ফজর আলীকে মারধর করেন। পরে তাকে হাসপাতালে নেওয়া হয়।”
তবে স্থানীয় একজন জনপ্রতিনিধি (ইউপি চেয়ারম্যান) দাবি করেছেন, ফজর আলীর সঙ্গে ওই নারীর সম্পর্কের বিষয়টি তিনি জানতেন। তবে তিনি ‘ধর্ষণে’ জড়িত ফজর আলীর পাশাপাশি যারা এই ঘটনার ভিডিও করেছেন তারাও সমান অপরাধী, তাদের বিচারও দাবি করেন।
ওই জনপ্রতিনিধি একজন আওয়ামী লীগ নেতাও। বিএনপি দাবি করেছে, ফজর আলী তার ‘বডিগার্ড’ ছিলেন।
ফজর আলী ও সুমনের রাজনৈতিক পরিচয়
স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, ফজর আলী নির্মাণসামগ্রী সরবরাহের কাজ করেন। তবে তার মূল পেশা হচ্ছে সুদের ব্যবসা। এলাকায় তিনি আধিপত্য বিস্তার করেই চলেন। তিনি নানা অপকর্ম করেছেন বলে স্থানীয়দের অভিযোগ।
কেউ কেউ তাকে ‘আওয়ামী লীগের ঘনিষ্ঠ’ বলেও মন্তব্য করেছেন। তবে তার পদ-পদবির বিষয়ে কেউ কিছু বলতে পারেননি। কেউ কেউ আওয়ামী লীগের মিছিলে তিনি অংশ নিয়েছেন- এমন ছবিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে থাকার কথা বলেছেন। যদিও এসব স্বতন্ত্রভাবে যাচাই করা যায়নি।
তবে ভিডিও ছড়ানোর অভিযোগে গ্রেপ্তার সুমন ছাত্রলীগের একটি ইউনিয়ন শাখার সভাপতি ছিলেন বলে স্থানীয়রা বলেছেন।



