তীব্র তাপদাহে নাজেহাল আফ্রিকার ‘মরুর জাহাজ’ উটও
নবীন সিং খাড়কা
প্রকাশ: ২৫ জুলাই ২০২৬, ০৮:১৫ পিএম
আফ্রিকার হর্ন অঞ্চল ও উত্তর আফ্রিকার পশুপালকেরা বছরের পর বছর ধরে উটের অসাধারণ সহনশীলতার কারণে অন্যান্য গবাদিপশুর পরিবর্তে উট পালনের দিকে ঝুঁকেছেন।
জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে আফ্রিকাজুড়ে বেড়েছে তাপমাত্রার তীব্রতা। আর এতে অসুবিধায় পড়েছে আফ্রিকার মরুভূমির ‘জাহাজ’ হিসেবে পরিচিত উটও। প্রচণ্ড গরম ও খরায় মরুভূমির সবচেয়ে সহনশীল এই প্রাণীটিও এখন হিমশিম খাচ্ছে টিকে থাকতে।
তাপমাত্রা, দীর্ঘস্থায়ী খরা, পানির সংকট ও চারণভূমি ধ্বংসের কারণে আফ্রিকার বিভিন্ন দেশে মৃত্যু বাড়ছে উটের। কমে যাচ্ছে দুধ উৎপাদন ও প্রজননক্ষমতা। বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে বলেছেন, ইতিহাসে সবচেয়ে সহনশীল প্রাণীগুলোর একটি এখন পরিণত হচ্ছে জলবায়ু সংকটের সরাসরি শিকারে।
উত্তর-পূর্ব ইথিওপিয়ার আফার অঞ্চল পৃথিবীর সবচেয়ে উষ্ণ ও শুষ্ক এলাকাগুলোর একটি। এখানকার যাযাবররা মরুভূমিতে লবণ পরিবহনের জন্য ব্যবহার করেন উটের কাফেলা।
আফারের সেমেরা এলাকার উটপালক আলি উমর বিবিসিকে বলেন, ‘আমি আমার উটগুলোর কষ্ট নিজের চোখে দেখছি। প্রচণ্ড গরমে তাদের পায়ে ফোস্কা পড়ে, চোখ দিয়ে পানি পড়ে। উত্তপ্ত বালুতে বসলে তাদের চামড়া পুড়ে যায়, এমনকি লোমও ঝরে পড়ে।’
৪০ বছর বয়সী আলি উমরের উট রয়েছে প্রায় ৫০০টি। তিনি জানান, গত এক মাসেই প্রচণ্ড গরমে আমার আটটি উটের বাচ্চা মারা গেছে। আগের তুলনায় গরম অনেক বেশি তীব্র হয়ে উঠেছে। আগে যে বাতাস কিছুটা শীতলতা এনে দিত, এখন সেই বাতাসও গরম।
দানাকিল নিম্নভূমির খনিজসমৃদ্ধ হ্রদ থেকে কেটে আনা লবণের খণ্ড উটের পিঠে করে বহন করা হয়। এ অঞ্চলে তাপমাত্রা অনেক সময় ৫০ ডিগ্রি সেলসিয়াসেরও বেশি পৌঁছে যায়শুধু আলি উমর নন, বিজ্ঞানী, প্রাণিসম্পদ বিশেষজ্ঞ এবং বিভিন্ন গবেষণাও বলছে—অতিরিক্ত তাপ উটের মধ্যে তাপজনিত চাপ (হিট স্ট্রেস), ক্লান্তি, পানিশূন্যতা এবং বিভিন্ন রোগের ঝুঁকি বাড়িয়ে দিচ্ছে। পাশাপাশি খরা ও অতিরিক্ত গরমের কারণে পানি, উদ্ভিদ এবং ছায়াযুক্ত স্থান কমে যাওয়ায় উটের জীবন আরও কঠিন হয়ে উঠছে।
বিশ্বের এক কুঁজবিশিষ্ট ড্রোমেডারি উটের প্রায় ৮০ শতাংশই রয়েছে উত্তর আফ্রিকা ও আফ্রিকার হর্ন অঞ্চলে। দীর্ঘদিন ধরে এসব অঞ্চলের কৃষক ও পশুপালকেরা খরা ও গরম সহ্য করার ক্ষমতার কারণে অন্যান্য গবাদিপশুর পরিবর্তে ঝুঁকেছেন উট পালনের দিকে।
তবে ২০২৫ সালে প্রকাশিত দক্ষিণ ইথিওপিয়ার উটপালকদের ওপর পরিচালিত একটি গবেষণায় দেখা গেছে, জলবায়ুর পরিবর্তন ও তাপমাত্রা বৃদ্ধির ফলে উল্লেখযোগ্যভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে উটের স্বাস্থ্য, উৎপাদনক্ষমতা এবং প্রজনন।
প্রতিবেশী সোমালিয়ার পরিস্থিতি আরও উদ্বেগজনক। জুন মাসে প্রকাশিত একটি গবেষণায় প্রায় ৬ হাজার যাযাবর পরিবারের তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, খরার কারণে উটের মৃত্যুর ঘটনা প্রভাবিত করেছে প্রায় ৪৬ শতাংশ উটপালক পরিবারকে। উত্তরাঞ্চলের সুল এলাকায় উটের মৃত্যুহার পৌঁছেছে প্রায় ৭৩ শতাংশে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এ অঞ্চলের খরার প্রধান কারণ অতিরিক্ত তাপমাত্রা। এর সঙ্গে পর্যাপ্ত পশুচিকিৎসা সেবার অভাব ও দুর্বল প্রাণিসম্পদ ব্যবস্থাপনা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলছে।

বায়ুমণ্ডলবিজ্ঞানীদের বিশ্লেষণে দেখা গেছে, ২০২১-২২ সালের ভয়াবহ খরার পেছনে প্রধান ভূমিকা ছিল অস্বাভাবিক উচ্চ তাপমাত্রার। অতিরিক্ত গরমে মাটি ও জলাশয়ের পানি দ্রুত বাষ্পে পরিণত হয় এবং উদ্ভিদও বেশি পরিমাণে পানি ছেড়ে দেয় বায়ুমণ্ডলে।
কেনিয়ার উত্তর-পূর্বাঞ্চলের মারসাবিত কাউন্টির পশুচিকিৎসা কর্মকর্তা হাসান নুয়া গুইয়ো বলেন, ‘আমরা আগের তুলনায় অনেক বেশি তাপজনিত অসুস্থতায় আক্রান্ত উট পাচ্ছি। এসব উট পরে বিভিন্ন সংক্রমণে আক্রান্ত হচ্ছে। গত দুই বছরে শুধু আমাদের এলাকায় অতিরিক্ত গরমের কারণে উটের মৃত্যু ১৫ শতাংশের বেশি বেড়েছে।’
হর্ন অব আফ্রিকায় পরিচালিত আরেকটি গবেষণায় দেখা গেছে, জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যাচ্ছে উটের মধ্যে রোগ বৃদ্ধি এবং দুধ উৎপাদন।
একই চিত্র দেখা যাচ্ছে উত্তর আফ্রিকার আলজেরিয়াতেও। চলতি বছরে প্রকাশিত একটি গবেষণায় গ্রীষ্মকালীন তাপপ্রবাহের সময় উটের মৃত্যুর হার উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে যাওয়ার তথ্য উঠে এসেছে। গবেষকেরা গ্রীষ্মকালে পর্যাপ্ত পানি সরবরাহ, অতিরিক্ত খাদ্য এবং উন্নত রোগ পর্যবেক্ষণের মতো সুপারিশ করেছেন বিশেষ ব্যবস্থা নেওয়ার।

বিশ্ব আবহাওয়া সংস্থা জানিয়েছে, উত্তর আফ্রিকায় ১৯৮১ সালের পর থেকে ধারাবাহিকভাবে বেড়েছে তাপপ্রবাহের সংখ্যা। ২০২৪ সালে উত্তর আফ্রিকা ও মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে তাপমাত্রা রেকর্ড করা হয়েছে ৫০ ডিগ্রি সেলসিয়াসেরও বেশি।
সংস্থাটির ‘স্টেট অব দ্য ক্লাইমেট ইন আফ্রিকা ২০২৫’ প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ১৯৯১ থেকে ২০২৫ সালের মধ্যে উত্তর আফ্রিকায় প্রতি দশকে গড়ে ০ দশমিক ৪৩ ডিগ্রি সেলসিয়াস হারে উষ্ণতা বেড়েছে, যা আফ্রিকার ছয়টি উপঅঞ্চলের মধ্যে সর্বোচ্চ।
বিশেষজ্ঞদের মতে, সাধারণত উট প্রায় ৪০ ডিগ্রি সেলসিয়াস পর্যন্ত তাপমাত্রা সহ্য করতে পারে সহজেই। তারা দিনের বিভিন্ন সময় শরীরের তাপমাত্রা ওঠানামা করতে দেয়, যাতে ঘাম কম হয় এবং শরীর থেকে পানির অপচয় কমে। তাদের অতিরিক্ত গরম সহ্য করতে সাহায্য করে ঘন প্রস্রাব, শুষ্ক মল এবং মোটা চামড়াও।
কিন্তু জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থার উটস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ড. মোহাম্মদ বেঙ্গুমি বলেন, ‘উটেরও একটি সহনীয় তাপমাত্রার সীমা রয়েছে। সাহারা মরুভূমির বহু এলাকায় এখন গ্রীষ্মে নিয়মিত ৫০ ডিগ্রি সেলসিয়াসের বেশি তাপমাত্রা দেখা যায়। পানি, উদ্ভিদ ও ছায়ার অভাব থাকলে এ অবস্থায় উটের তীব্র তাপজনিত চাপের ঝুঁকি বেড়ে যায়।’

আলজেরিয়ার ঘারদাইয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক আবদেলমাজিদ শেহমা বলেন, ‘আমাদের গবেষণায় দেখা গেছে, দিনের পর দিন ৪১ থেকে ৪৫ ডিগ্রি সেলসিয়াসের বেশি তাপমাত্রায় থাকলে উটের দেহকোষ সরাসরি ক্ষতিগ্রস্ত হয়। রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা দুর্বল হয়ে পড়ে এবং কোষগুলো নিজেদের মেরামত করতে না পেরে ধ্বংস হতে শুরু করে।’
এর ফলে উটের বিপাকক্রিয়া ধীর হয়ে যায়, খাবার গ্রহণ কমে যায়, তারা দুর্বল ও ক্লান্ত হয়ে পড়ে। পাশাপাশি দুধ উৎপাদন কমে যায় এবং সমস্যা দেখা দেয় প্রজননেও।
মরক্কোর কাসাব্লাঙ্কা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণী হাইড্রোবায়োলজি বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক মোহাম্মদ এল খাসমি জানান, তাদের গবেষণায় অতিরিক্ত গরমের কারণে উটের ওজন কমে যাওয়া, প্রদাহ, পেশি ও হাড়ের সমস্যা, কিডনির কার্যকারিতা ব্যাহত হওয়া এবং প্রমাণ মিলেছে পরজীবীজনিত সংক্রমণ বৃদ্ধির।
বিশেষজ্ঞদের মতে, শুধু তীব্র গরম নয়; পানি ও চারণভূমির সংকট, ছায়ার অভাব এবং পর্যাপ্ত পশুচিকিৎসা না থাকায় আরও ভয়াবহ হয়ে উঠছে পরিস্থিতি।
এ কারণে ইথিওপিয়ার অনেক উটপালক ঐতিহ্যগত উত্তরাঞ্চল ছেড়ে দক্ষিণাঞ্চলে স্থায়ীভাবে চলে যাচ্ছেন, যেখানে তুলনামূলকভাবে পানি ও উদ্ভিদের প্রাপ্যতা বেশি।

ইথিওপিয়ার ভিশন বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ও যাযাবর উন্নয়ন গবেষক ড্যানিয়েল গেলান বলেন, ‘এটি মৌসুমি স্থানান্তর নয়। প্রচণ্ড গরম ও খরার কারণে অনেক পরিবার উত্তরাঞ্চল চিরতরে ছেড়ে যাচ্ছে, কারণ সেখানে আর উট পালন সম্ভব হচ্ছে না।’
অক্সফামের তথ্য অনুযায়ী, ২০২০ থেকে ২০২৩ সালের দীর্ঘ ও ভয়াবহ খরা থেকে আফ্রিকার হর্ন অঞ্চল পুরোপুরি ঘুরে দাঁড়ানোর আগেই আবারও নতুন খরার মুখে পড়েছে। সোমালিয়ার কিছু এলাকায় পানির দাম ২ হাজার শতাংশেরও বেশি বেড়ে গেছে।
আফারের উটপালক আলি উমর আশঙ্কা প্রকাশ করে বলেন, যে কোনো সময় রোগের প্রাদুর্ভাবে তার প্রাপ্তবয়স্ক উটগুলিও মারা যেতে পারে।
অধ্যাপক শেহমার মতে, ‘মরুভূমিতে টিকে থাকার শেষ ভরসা হিসেবে পরিচিত উট এখন নজিরবিহীন তাপপ্রবাহের কারণে তার মৌলিক শারীরবৃত্তীয় সক্ষমতাই হারানোর ঝুঁকিতে। ইতিহাসের সবচেয়ে সহনশীল প্রাণীগুলোর একটি আজ জলবায়ু পরিবর্তনের নতুন শিকারে পরিণত হয়েছে।’
বিবিসি থেকে ভাষান্তর: মাকসুদা রিনা



