অক্সিজেন মাস্ক খুলে নিলেন ঢামেক কর্মচারী, শিশুর মৃত্যু
অনলাইন ডেস্ক
প্রকাশ: ১৩ মে ২০২৬, ০৭:৫৭ পিএম
সাত মাস বয়সী অসুস্থ হাসিব আহমেদ মিনহাজকে রংপুর থেকে ঢাকায় নিয়ে আসে তার পরিবার। কয়েকটি হাসপাতাল ঘুরে যথোপযুক্ত চিকিৎসা না পেয়ে শেষে নিয়ে আসা হয় ঢাকা মেডিকেল কলেজ (ঢামেক) হাসপাতালে। এসেই বেসরকারি হাসপাতালে রোগী ভাগিয়ে নেওয়ার দালালের খপ্পরে পড়ে।
ঢামেকে সিট খালি নেই জানিয়ে সরকারি কর্মচারী ওই দালাল শিশুটিকে কাটাবনের একটি হাসপাতালে পাঠানোর উদ্যোগ নেন। শিশুটির অক্সিজেন মাস্ক খুলে ফেলে তিনি অ্যাম্বুলেন্সের খোঁজে অনেকটা সময় ঘোরাঘুরি করেন।
এরই মধ্যে মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ে মিনহাজ। মঙ্গলবার (১২ মে) বিকেলে এ ঘটনা ঘটেছে। এ ঘটনায় অভিযুক্ত সরকারি কর্মচারী মো. এনায়েত করিমকে (৪০) আটক করে পুলিশে দিয়েছে শিশুটির পরিবার।
মিনহাজের বাড়ি রংপুরের পীরগঞ্জের পার্বতীপুর গ্রামে। তার বাবার নাম হেলাল মিয়া, মায়ের নাম মেঘলা খাতুন। বাবা স্বর্ণের দোকানের কর্মচারী আর মা গার্মেন্টসকর্মী। তারা থাকেন গাজীপুরের বাসন এলাকায়।
হেলাল মিয়া জানান, মিনহাজ তাদের একমাত্র সন্তান। তারা স্বামী-স্ত্রী দুজনই চাকরি করার কারণে মিনহাজ রংপুরে তার নানি রেখা বেগমের কাছে থাকত। মিনহাজ বেশ কিছু দিন ধরে অসুস্থ থাকায় তাকে চিকিৎসার জন্য প্রথমে রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখান থেকে ঢাকায় নিয়ে আসা হয়। ঢাকায় শিশু হাসপাতালসহ বিভিন্ন হাসপাতাল ঘুরে পুরোপুরি চিকিৎসা না পাওয়ায় গতকাল মঙ্গলবার বিকেলে মিনহাজকে তারা ঢাকা মেডিকেলের জরুরি বিভাগে নিয়ে আসেন। এখানে আনার পর জরুরি বিভাগের মেডিকেল অফিসার পাশেই শিশু ডাক্তারের কাছে পাঠান।
তবে শিশু ওয়ার্ডে সরাসরি ভর্তি না করে তার পরিবারকে সেখানকার চিকিৎসকরা বলেন, ওয়ার্ডে গিয়ে খোঁজ নিয়ে আসতে, বেড খালি আছে কিনা। তখনই হাসপাতালের কর্মচারী এনায়েতের সঙ্গে দেখা হয় তাদের। এনায়েত তাদের সঙ্গে নিয়ে শিশু ওয়ার্ড ঘুরে আসেন এবং চিকিৎসককে জানান, বেড খালি নেই। এরপর এনায়েত পরিবারটিকে কাটাবন এলাকার হোম কেয়ার হাসপাতালে নিয়ে যাওয়ার কথা জানান। সেখানে প্রতিদিন ২৫ হাজার টাকা বিল হবে বলে জানিয়ে দেন। একপর্যায়ে নিরুপায় হয়ে পরিবার রাজি হয় এবং ওই হাসপাতালে যাওয়ার প্রস্তুতি নেয়।
হেলাল মিয়া অভিযোগ করেন, ‘ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে আসার আগে অন্য হাসপাতালের চিকিৎসকরা আমাদের সাবধান করে দিয়েছিলেন, দুই মিনিটের জন্যও শিশুর মুখের অক্সিজেন মাস্ক খোলা যাবে না। কর্মচারী এনায়েতকেও এটি জানানো হয়। তবে সে মিনহাজের মাস্ক খুলে ফেলে এবং একটি অ্যাম্বুলেন্সে উঠিয়ে দেবে বলে হাসপাতালের ভেতরে প্রায় আধাঘণ্টা ঘোরাঘুরি করে।’
তিনি জানান, এরপর হাসপাতালের ২ নম্বর ভবনের গেট দিয়ে বেরিয়ে একটি অ্যাম্বুলেন্সে তুলে দেওয়ার সময় তারা বুঝতে পারেন, মিনহাজ আর বেঁচে নেই। তখন পরিবার কান্নাকাটি শুরু করলে দৌড়ে পালানোর চেষ্টা করে ওই প্রতারক। সঙ্গে সঙ্গে তাকে ধরে ফেলেন স্বজনরা। এরপর হাসপাতাল পুলিশ ক্যাম্পে নিয়ে থানা পুলিশের হাতে তুলে দেন। শিশুটির মামা মো. রিপন বলেন, ‘আমার ভাগ্নের ডায়রিয়া হয়েছিল। রংপুর মেডিকেলে নিয়ে গেলে সেখানে কিডনির সমস্যা ধরা পড়ে। এরপর ঢাকার শিশু হাসপাতালে নিয়ে আসি। সিট না থাকায় আমাদের ভর্তি করেনি। সেখানে এক দালাল আমাদের ধানম-ির একটি বেসরকারি হাসপাতালে নিয়ে যায়। তবে কিডনির সমস্যার কথা শুনে আমাদের কিডনি হাসপাতালে পাঠিয়ে দেয়। আমরা গ্রাম থেকে ঢাকায় আসছি। যে যেভাবে বলছে, সেভাবেই কাজ করছি। তাও যদি আমাদের শিশুটি বেঁচে থাকত মনকে সান্ত¡না দিতে পারতাম।’
শাহবাগ থানার উপপরিদর্শক (এসআই) মনমথ হালদার বলেন, ঢাকা মেডিকেলে এক শিশু মৃত্যুর ঘটনায় এনায়েত করিম নামে এক সরকারি কর্মচারীকে পুলিশ ক্যাম্পে আটক রাখা হয়েছে, এমন খবর পেয়ে আমরা হাসপাতালে যাই। এরপর জানতে পেরেছি, এক শিশু রোগীকে ফুঁসলিয়ে বেসরকারি হাসপাতালে নেওয়ার পথে মারা যায় শিশুটি। শিশুটির পরিবারের পক্ষ থেকে লিখিত অভিযোগ পেলে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।



